ব্রীজ নয় লাইন ও জয়েন্ট পয়েন্টেই ছিল ট্রেন দূর্ঘটনার কারণ : স্থানীয়দের ময়নাতদন্ত

বিশেষ প্রতিনিধিঃ ট্রেন দূর্ঘটনা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন কি কারনে এমন ভয়াবহ দূর্ঘটনা। নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে ও জানাতে ওই দূর্ঘটনার নেপথ্যের বিষয় নিয়ে চলছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ময়না তদন্ত। ব্রিজ নয় ব্রিজের উপর ও আগে পরের রেল লাইন ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন থেকে থেনা (পুরানো কাপড়) আর সুতলী পেছিয়ে কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে আটকানো হয়েছিল ফিসপ্লেট ও জয়েন্ট নাট। আর রেল লাইন সংযোগ স্থাপনের ওই স্থানে নাট বল্টুও ছিল কম। যে গুলো ছিল সেগুলোরও ছিলনা কার্য ক্ষমতা। থ্রেটহীন ওই নাট বল্টুর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল পুরানো কাপড় ও সুতলী পেছিয়ে। রেল লাইনের সাথে সংযুক্ত ক্লিপ-হুক ছিল কম। কাটের স্লিপারের অবস্থাও ছিল দুর্বল। 

কুলাউড়ার বরমচালের ইসলামাবাদ বড়ছড়ার ওই ব্রিজটি দূর্ঘটনা কবলিত হওয়া পূর্বে ব্রিজটির উপর ও আশপাশের চরম ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন নিয়ে এমন দূর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের। পুরানো ওই ব্রিজটি ঝুকিপূর্ণ না হলেও এর আশপাশের চরম ঝুকিপূর্ণ রেল লাইন মেরামত ও নতুন সরঞ্জামাদির দাবি ছিল ওই এলাকাবাসির। জানা যায় দূর্ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী ইসলামাবাদ, নন্দনগর, ফুলেরতল (কালামিয়া বাজার), মহলাল গ্রামের বাসিন্দারা প্রায়ই ট্রেন আসা যাওয়ার পরপরই খুলে যাওয়া নাট বল্টু নিজেরাই ট্রাইট দিতেন। অনেক সময়ই এই র্দূবস্থার কথা স্থানীয় স্টেশন মাষ্টার ও সংশ্লিষ্টদের জানাতেন। কিন্তু তাদের জানানোর পরও কোন পরিবর্তন হতনা ওই পুরাতন ফিসপ্লেট, স্লিপার,নাট বল্টুর। মাঝে মধ্যে রেল বিভাগের লোকজন পুরাতন কাপড় বা সুতলী পেছিয়ে জোড়াতালি দিতেন। রেল বিভাগের এমন উদাসীনতায় স্থানীয় বাসিন্দারা দূর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতেন চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠায়। ব্রিজের আগে ও পরের প্রায় ২শ গজ চরম ঝুকিপূর্ণ রেল লাইন নিয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের অবগত করেছেন। তা মেরামত কিংবা পরিবর্তনের দাবিও করেছেন। কিন্তু ঠনক নড়েনি কারো। 

মঙ্গলবার ২৫ জুন বিকেলে কথা হয় দূর্ঘটনাস্থলের আশপাশ গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে। তারা ক্ষোভের সাথে জানালেন আগে থেকেই আমাদের যেমনটি ধারনা ছিল এমনটিই হল। যদি আমাদের অভিযোগ গুলো রেল বিভাগের লোকজন সাথে সাথে আমলে নিতেন তাহলে এমন ভয়াবহ দূর্ঘটনা হতনা। নন্দনগর গ্রামের ফারুক মিয়া, ফয়ছল আহমদ, মো: জহির আলী, কনা মিয়া, মোতাহের মিয়া, আব্দুল মন্নান, সুমেন আহমদ ও রুহিত পাচী ক্ষোভের সাথে জানান এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটির রেল লাইন ও যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য একাধীকবার বলা হলেও কোনো গুরুত্বই দেননি রেল বিভাগের লোকজন। তারা বলেন সে দিন গ্রামবাসী আর প্রশাসনসহ অন্যান্যদের সহযোগীতায় হতাহতের পরিসংখ্যান বড় হয়নি। এত বড় ভয়াবহ দূর্ঘটনার পর এতো কম হতাহতের সংখ্যা। এটা নিচক সৃষ্টি কর্তার অশেষ কৃপা। তারা জানান ওই ব্রিজটি পুরানো হলেও তেমন ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়না। চরম ঝুকিপূর্ণের তালিকায় যেমনটি ছিল ওই ব্রিজের আশপাশের রেল লাইন ও তার ছোট বড় যন্ত্রাংশ। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা শ্যামল শীল, নূর আলী, সালাম ও রিপনসহ কয়েকজন জানান সেদিন তখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা। দ্রুতগতিতে  কালামিয়া (ফুলেরতল) বাজারের পাশের রেলক্রসিংটির পাশে দাঁড়িয়ে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলেন তারা। অন্যদিনের চাইতে ওই দিন ট্রেনটি ছিল খুবই দ্রুত গতি সম্পন্ন। চোখের নিমিশেই ট্রেনটি ব্রিজের উপর পৌঁছায়। এর আগ থেকেই জয়েন্ট রেলক্রসিং লাইনের পাশ থেকেই ট্রেনটির পেছনের বগিগুলো অনেকটা টেনে হিছড়ে সামন দিকে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। ট্রেনটি ব্রিজের উপর উঠার সাথে সাথেই ট্রেনের সামনের অংশ ব্রিজ পের হলেও হঠাৎ বিকট শব্দ আর ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠে পুরো এলাকা। সাথে আগুনের ফুলকি আর ধোয়া। এরপর যা হল তা তো মর্মান্তিক ইতিহাস। আমরা সকলেই দৌঁড়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করি। 

তারা বলেন আমাদের ধারনা ট্রেনের সামনের অংশ ব্রিজের আগে যে জয়েন্ট পয়েন্ট আছে তার জোড়ার নাট বল্টু ট্রেনের সামনের অংশ যাওয়ার পর হয়ত খুলে গিয়েছিল। আর একারনে পিছনের বগিটি রেল লাইন থেকে সটকে পড়ে সামনে আগাতে পারেনি। তারপর কোন রকম  ব্রিজে উঠার সাথে ব্রিজ থেকে পড়ে যায়। এতে ট্রেনের ১৭ টি বগির মধ্যে ৬টি বগিই ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লাইনচুত্য ও ব্রিজের নীচে ও রাস্তার পাশে পড়ে যায়। তাদের এই কথার সাথে মিল রেখেই এমন তথ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাদের সকলেরই ধারনা জয়েন্ট পয়েন্টের নাট বল্টু ডিলেডালা ও খুলে যাওয়াতেই পেছনের বগি লাইনচুত্য হয়েই এই দূর্ঘটনার কবলে পড়ে। বরমচাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ওইদিন স্থানীয় মানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় হতাহতের সংখ্যা বাড়েনি। তিনি বলেন ব্রিজের উপর থেকে তার উত্তর ও দক্ষিণের প্রায় দেড়-দু’শ ফুট এলাকার রেল লাইন, ফিশপ্লেট, স্লিপার, নাট, বল্টু চরম ঝুকিপূর্ণ ছিল দীর্ঘদিন থেকে। স্থানীয়বাসিন্দা এমন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে সংশ্লিষ্টদের অবগতও করিয়েছিল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ইমরান বলেন, সেদিন ট্রেনটি ছিল দ্রুত গতির। আর ব্রিজের আগে পয়েন্টের নাট বল্টু ছিল দূর্বল ও সংখ্যায় কম। এতে ট্রেনটির সামনের অংশ ওই স্থান পাড়ি দেওয়ার পরপরই পেছনের বগিটি লাইনচুত্য হয়। ইঞ্জিনের শক্তিতে ট্রেনটির পেছনের ওই বগি ব্রিজ উঠতে পারলেও আর সামনে আগাতে পারেনি। তাই নিয়ন্ত্রণ হারানো ওই বগিটি ব্রিজের নীচে পড়ে যায়। তখনই ওই ৬টি বগি ইঞ্জিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্থ  ও দূর্ঘটনা কবলিত হয়। তিনি বলেন ব্রিজ নয় দূর্ঘটনার কারন হল চরম ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন ও তার খুচরা সহযোগি যন্ত্রাংশ। কারন এর আগে ব্রিজের গার্ডার বা স্পেন ক্ষতিগ্রস্থ ছিল এমনটি কারো নজরে পড়েনি। তবে ব্রিজটি পুরানো তা নির্মাণ কিংবা সংস্কারের প্রয়োজন। 

গতকাল সরজমিনে দেখাগেল এখন দূর্ঘটনার ওই ব্রিজ দিয়ে ধীর গতিতে চলছে ট্রেন। পাশে ওই দূর্ঘটনার স্বাক্ষী হিসেবে পড়ে আছে চরম ক্ষতিগ্রস্থ ৩টি বগি। সোমবার ওই বগি গুলো রেখেই ট্রেন লাইন সচল করা হযেছিল। এখনো নানা জায়গা থেকে উৎসুক নারী পুরুষ দূর্ঘটনাস্থল দেখতে আসছেন। ওই স্থানটির আশপাশে রয়েছে  আনছার ও রেল পুলিশের সর্তক পাহারা। জেলা ও উপজেলার হোটেল, রেস্তোরা কিংবা লোকসমাগমস্থল গুলোতে এখন ভয়াবহ ওই ট্রেন দূর্ঘটনার নানা আলোচনা-সমালোচনা। আর এরই সাথে নানা গুঞ্জন আর কৌতুহল ওই দূর্ঘটনার হতাহতের সংখ্যা নিয়ে। তবে সকলের দাবি একটাই এরকম ভয়াবহ দূর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত এ অঞ্চলের চরম ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন ও ব্রিজ নির্মাণ ও মেরামতের।

No comments: