নাট বল্টুতে ত্যানা ও সুতলি পেচিয়ে চলে সিলেট-আখাউড়া ট্রেন : সব কিছু আল্লাহ ভরসা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ শুধু ঠিকঠাক আছে রেল সড়ক। আর সবই শুধু নেই নেই। রেল লাইন, ফিসপ্লেট, ক্লিপ, হুক, স্লিপার, নাট, বল্টু, সিগন্যাল সহযোগি যন্ত্রাংশ সবই আছে কেবল নামমাত্রই। মেয়াদ উত্তীর্ণ ইঞ্জিন, জরাজীর্ণ বগি, সিডিউল বির্পযয় এটা হল এঅঞ্চলের রেল বিভাগের চলমান ও দৃশ্যমান দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এ থেকে উত্তোরণ কেবল আশ্বাসের ফুলঝুরি। দূর্ঘটনায় প্রাণহানী অঙ্গহানী কিছু দিন হৈই চৈই। তারপর সবই আগের মত যেই সেই। কুলাউড়ার বরমচাল বড়ছড়া ব্রিজ এলাকার উপবন ট্রেন দূর্ঘটনাস্থলের আশপাশে এখনো চোখে পড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ জরাজীর্ণ রেল লাইন। ত্যানা (পুরাতন কাপড়), সুতলি, প্লাষ্টিকের ব্যাগ দিয়ে আটকানো হয়েছে ফিসপ্লেট ও নাট বল্টু। অধিকাংশ স্থানে স্লিপারের সাথে রেল লাইন আটকানোর হুক ও ক্লিপ নেই। জয়েন্ট পয়েন্ট ও ক্রসিং পয়েন্টের ফিসপ্লেট ও নাট বল্টু থ্রেটহীন অকার্যকর। কোনো যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া হাত দিয়েই সহজেই খোলা যাচ্ছে নাট। ট্রেন চলাচলের সময় জয়েন্ট পয়েন্ট গুলো ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের বগিগুলোও অনেকটা কাত হয়েই ওই স্থান দিয়ে চলে। এমন নাজুক অবস্থার রেল লাইন কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে।

বুধবার দুইজন মন্ত্রী আসলেন সরজমিনে দূর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করলেন। তাদের পরিদর্শনের খবরেও কিছুটাও পরিবর্তন হলনা ওই এলাকার রেল লাইনের ছোট ছোট দৃশ্যমান সমস্যার। বরমচাল বড়ছড়া ব্রিজের আশপাশের অনেক জায়গায় রেল লাইনের নানা ত্রুটি দেখিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের ক্ষোভের সাথে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এটাতো রেল লাইন নয় যেন একটি মরণ ফাঁদ। তা না হলে এতোদিন থেকে এই লাইনটি এতো ত্রুটি নিয়ে চলছে কি রকম। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো মাথা ব্যথা নেই কেন। অভিযোগ দিলেও তারা তা আমলে নেন না কেন। খোদ রেল মন্ত্রী আসলেন। তার সাথে বন ও জলবায়ূ পরিবর্তন মন্ত্রী এখানে আসলেন। এতো কিছুর পরও দূর্ঘটনার আশপাশে এখনো ত্যানা, সুতলি আর পলিথিন ব্যাগ দিয়েই আটকানো হয়েছে নাট বল্টু আর ফিসপ্লেট। সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজন আন্তরিক থাকলে অত্যন্ত এই ছোট ছোট দৃশ্যমান ত্রুটি গুলো সমাধান করতে পারতেন। তাদের কি পরিমান অবহেলা ও উদাসীনতা আমাদের বলা অভিযোগ গুলোর বাস্তবতাই এটা। গণমাধ্যম কর্মীদের ওই ঝুকিপূর্ণ রেল লাইনে দাঁড়িয়ে একথাগুলো ক্ষোভের সাথে বলছিলেন বরমাচাল ইসলামাবাদের মনসুর আহমদ, শিপু আহমদ, ফয়সল আহমদ, জহির আলী, ইউপি সদস্য শাহানুর আহমদ সাধন, উত্তরভাগের  মো: নজরুল ইসলাম প্রমুখ।
 
তারা জানালেন, আগে ট্রলি দিয়ে প্রতিদিনই রেল বিভাগের লোকজন  লাইন  চেক করতেন। এখন আর এই দৃশ্য নেই। এখন রেল তল্লাশিদের রেল লাইনের কোথাও কোনো ত্রুটির কথা জানালেও তারা তা আমলে নেন না। ওদের অবস্থা দৃষ্ঠে মনে হয় রেল বিভাগের কোনা অভিভাবকই নেই। তারা ইচ্ছে করেই মানুষকে দূর্ঘটনায় ফেলতে চাইছে। ইসলামাবাদ নন্দনগর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আব্দুল মন্নান মিয়া, টিটু মিয়া, দক্ষিণ নন্দনগরের কামাল হোসেন, জাকারিয়া আলম, কালামিয়া (ফুলেরতল) বাজারের ব্যবসায়ী মফিজ আলী, মাধবপুরের আব্দুল জলিল রেল লাইনের দূরাবস্থা দেখিয়ে বলেন সব নেই নেইর মধ্যে এভাবে কি করে ট্রেন চলাচল করে তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। এই জরাজীর্ণ ট্রেন, ইঞ্জিন আর লাইন সবই মিলিয়ে আল্লাহ ভরসা করে এই অঞ্চলের ট্রেনগুলো চলে। তারা ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন রেখে বলেন এভাবে আর কত। যখন প্রতিদিনই বড় ধরনের দূর্ঘটনায় প্রাণহানী ও অঙ্গহানী ঘটবে তখনই হয়ত কর্তৃপক্ষের ঠনক নড়বে। 

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট-আখাউড়ায় রেল লাইন এখন দিন দিন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রেল লাইনের সাথে সংযুক্ত ক্লিপ-হুক, ফিসপ্লেট, নাট বল্টু, স্লিপার ক্রমেই দুর্বল হয়ে কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। রেল লাইনের ভেতর নেই পর্যাপ্ত পাথর। আর ওই রেল পথের নানা স্থানে বৃটিশ আমলের নির্মিত রেলসেতু ও কালভার্টসমূহের উপর জীনশীর্ণ কাঠের স্লিপারের সাথে পেরেক দিয়ে বাঁশের ফালি স্থাপন করে কোনো রকম আটকানো হয়েছে রেল লাইন। ফলে ট্রেন চলাচলের সময় ওই সকল স্থান চরম দূর্ঘটনার আশঙ্কা ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিবছরই ম্যান্টেনেন্স কাজ করা কথা থাকলেও তা শুধু কাগজে কলমে। এই সেকশন দিয়ে ঘণ্টায় ৬০ কি.মি. বেগে প্রতিদিন যাত্রীবাহী আন্ত:নগর, লোকাল ও মালবাহী মিলিয়ে প্রায় ১০-১২ টি ট্রেন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে। রেল বিভাগের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে দেশের অন্যতম পুরনো রেলপথ সিলেট-আখাউড়া। এখন অনেকটাই নড়বড়ে রেল সেতু ও লাইন। দ্রুত মেরামত কিংবা নির্মাণ না হলে ঘটতে পারে বড় ধরনে দূর্ঘটনা। জানা যায় সিলেট আখাউড়া রেলপথের ১৭৯ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ২৫-৩০ টি সেতু ও কালভার্ট চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আর বাকীগুলো আছে ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায়। এছাড়া অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে কিংবা জরাজীর্ণ অবস্থায় কোন রকম ঠিকে আছে। এগুলো দ্রুত মেরামত না  করলে যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়ে দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। সম্প্রতি সিলেট আখাউড়া রেল লাইনে বেড়ে চলা দূর্ঘটনায় চরম উদ্বেগ উৎকন্ঠায় এঅঞ্চলের যাত্রীরা। সিলেটবাসীর জোর দাবি যেন দ্রুত এই জরাজীর্ণ রেল লাইনটির (সার্বিক) মেরামত ও নির্মাণ করার। 

এবিষয়ে রেল মন্ত্রী মোঃ নুরুল ইসলাম সুজন গত বুধবার ২৬ জুন দুপুরে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল বড়ছড়া ব্রিজের ট্রেনের দূর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সংক্ষিপ্ত পথ সভায় বলেন বিএনপি জামাত জোটের সময় রেল বিভাগের উন্নয়ন কোনো হয়নি। মন্ত্রী বলেন এই সরকারের আমলে আলাদা মন্ত্রণালয় হয়েছে। দৃশ্যমান নানা উন্নয় হয়েছে ও হচ্ছে। এসময় স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে বরমচাল স্টেশনে ২টি আন্তনগর ট্রেন স্টপিজের আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে আরো স্টপিজ বাড়ানোর কথাও বলেন। ঢাকা সিলেট রেল লাইন ডুয়েল গেজ হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৬টি আধুনিক রেলস্টেশন স্থাপন করা হবে। এজন্য ১৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডুয়েল গেজে রুপান্তরিত করতে ইতোমধ্যেই ১৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটি অনুমোদন করেছে। দ্রুত তা বাস্তবায়নের কাজও চলছে।

No comments: