কোটা সংস্কারের সুপারিশ

সরকারি চাকরিতে কোটাসংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি, কমিশন, সংস্থা বা বিদেশের রিপোর্ট সংগ্রহ করার কাজ শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সোমবার তারা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন সংগ্রহ শেষে পর্যালোচনা শুরু করেছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) বা সরকারি কর্ম কমিশনের বিভিন্ন সময়ের সুপারিশও তাদের কাছে রয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আকবর আলি খানের বিভিন্ন প্রতিবেদনও সংগ্রহ করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
তাঁরা বলেছেন, সব কমিশন, কমিটি বা সংস্থার প্রতিবেদনেই বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। ধীরে ধীরে কোটা বিলুপ্তির প্রস্তাবও রয়েছে কোনো কোনো প্রতিবেদনে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার গত রাতে বলেন, ‘কোটাসংক্রান্ত সচিব কমিটি প্রথম বৈঠকে এসংক্রান্ত দেশি-বিদেশি তথ্য পর্যালোচনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা যৌক্তিক। এসব প্রতিবেদন অবশ্যই আমলে নিতে হবে। এর সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। তাহলেই তারা একটি ভালো সুপারিশ উপস্থাপন করতে পারবে।’
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্কার বা বাতিল করার জন্য গঠিত সচিব কমিটি গত রবিবার প্রথম সভায় এসংক্রান্ত দেশি-বিদেশি তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে ১৯৭২ সালের প্রশাসনিক ও সার্ভিস কাঠামো পুনর্গঠন কমিটির প্রতিবেদন, ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটির প্রতিবেদন, ১৯৯৬ সালের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কমিটির প্রতিবেদন। উন্নয়ন অংশীদার বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় যেসব সংস্কার কমিটি করা হয়েছিল সেগুলোর প্রতিবেদনও সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যে পদ্ধতি চালু আছে তাও সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হবে।
জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি শাখা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট। ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই কমিশন গঠন করেছিলেন। সাবেক সচিব এ টি এম শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশন ২০০০ সালের ২৫ জুন সরকারের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে কমিশনের প্রতিবেদন আমলে নিতে পারেনি সরকার। ওই কমিশনের সদস্য ছিলেন অ্যাডভোকেট রহমত আলী, ড. এস এ সামাদ, ড. আকবর আলি খান, সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, খন্দকার আসাদুজ্জামানসহ ১৩ জন। রাজনীতিবিদ ও আমলাদের নিয়ে গঠিত ওই কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন সুপারিশে মেধা কোটা আরো উদার করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিশনের অন্তর্বর্তীকালীন ৩০টি সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল মেধা কোটা শতকরা ১০ ভাগ বাড়িয়ে ৫৫ ভাগ করা। তবে সিভিল সার্ভিস সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন করতে গিয়ে নিয়োগ নীতি প্রসঙ্গে কমিশন কোটা পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে বিলোপ করার সুপারিশ করেছিল। ওই কমিশনের মতে, বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস অদক্ষ ও অকার্যকর। সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণে সিভিল সার্ভিসকে যে বিশাল ও জটিল উন্নয়নমূলক কাজ করতে হয় তা করার জন্য যে দক্ষতা দরকার তা তাদের নেই। জেলা ও জন্মস্থানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত কোটা সংবিধানের বিধানসমূহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তা সত্ত্বেও জন্মস্থানভিত্তিক জেলা কোটার বৈষম্যমূলক নীতি চালু রয়েছে। ওই কমিশন মনে করে, জেলা কোটার সুবাদে উত্কৃষ্টদের ডিঙিয়ে নিম্ন মেধার লোকেরা নিয়োগ পাচ্ছে। অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক পদে একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য মহিলা ও ‘উপজাতীয়’ শ্রেণির লোকদের কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ করা যেতে পারে। কমিশনের মতে, কোটা পদ্ধতি বহাল রাখা হবে একটি অত্যন্ত দুর্বল বিকল্প।
সংস্কার ও সহজীকরণ চায় পিএসসি : প্রচলিত কোটাব্যবস্থার সংস্কার চায় সরকারি কর্ম কমিশনও। যোগ্য জনবল বাছাইয়ের সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছরই কোটা সংস্কারের সুপারিশ করে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় কোটার সংস্কার করে না সরকার।
পিএসসি কোটা সংস্কারের প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল ২০০৯ সালে। পরে প্রতিবছরের সুপারিশে ২০০৯ সালের প্রস্তাবটিই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পিএসসি মনে করে, বর্তমান কোটাসংক্রান্ত নীতিমালার প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল, দুরূহ এবং বহুমাত্রিক। প্রচলিত কোটা পদ্ধতির কারণে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ নিখুঁতভাবে সম্পাদন করা কখনো কখনো প্রায় অসম্ভব। প্রার্থীদের বিভিন্ন ক্যাডারের চাকরির পছন্দক্রম, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর অর্জিত মেধাক্রম এবং কোটার সঙ্গে বিভিন্ন জেলা বা বিভাগের জন্য আরোপিত সংখ্যাগত সীমারেখা সংযুক্ত হয়ে এমন একটি বহুমাত্রিক সমীকরণ কাঠামোর সৃষ্টি করেছে, যার নির্ভুল সমাধান করা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানবীয়ভাবে প্রায় অসম্ভব। এ অবস্থায় কমিশন মনে করে, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থী মনোনয়নের জন্য বর্তমান প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সহজীকরণ অপরিহার্য। সে জন্য বিসিএস পরীক্ষাসহ নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রয়োগ পদ্ধতি সহজীকরণ করা আবশ্যক। বিস্তারিত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শেষে কোটা প্রয়োগ পদ্ধতি সহজীকরণের বিষয়ে পিএসসি ২০০৯ সালের ১৯ মার্চ সরকারের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছিল তাতে বলা হয়, ‘মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রাধিকার কোটাসমূহ জাতীয় পর্যায়ে বণ্টন করা যেতে পারে; অর্থাৎ উক্ত প্রাধিকার কোটাসমূহকে পুনরায় জেলা/বিভাগভিত্তিক ভাগ করা যাবে না বা জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রাপ্য পদের সর্বোচ্চ সংখ্যা দ্বারা সীমিত করা যাবে না। এ ধরনের কোটাসমূহ জাতীয়ভিত্তিক নিজস্ব মেধাক্রম অনুযায়ী উক্ত কোটায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে।’
পিএসসির উদ্যোগে ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘উন্নয়ন ভাবনা : জনপ্রশাসনে দ্রুত নিয়োগ’ শীর্ষক সেমিনারে কোটা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয় ‘কোটা পদ্ধতি ও কোটা বিন্যাস পদ্ধতির পুনর্বিবেচনা ও পুনঃপর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ কোটাসমূহে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে পদসমূহ সংরক্ষিত না রেখে মেধার ভিত্তিতে পূরণ করার জন্য নির্বাহী নির্দেশনা প্রয়োজন।’
কোটার জটিলতা তুলে ধরতে গিয়ে পিএসসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাধিকার কোটার শতকরা ৫৫ ভাগ পদ ১০৪টি হলে ৬৪ জেলার প্রতিটিকে ন্যূনতম একটি করে পদ দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ কোনো জেলা কোটায় পদ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে না। নিয়োগযোগ্য পদসংখ্যা ১৮-এর কম অর্থাৎ প্রাধিকার কোটায় প্রাপ্য পদসংখ্যা ১০-এর কম হলে সব বিভাগে পদ বিতরণ করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে কোটা বণ্টন সাধারণভাবে শুধু বৃহৎ বিভাগগুলোতে সীমিত থাকবে।
আকবর আলি খানের অভিমত : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আকবর আলি খান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কমিটি বা কমিশনের সদস্য হিসেবে কোটা সংস্কারের কথা বলেছেন। তাঁর ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করলেই চাকরি পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বেশির ভাগ পদে কোটার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে একটি অত্যন্ত জটিল কোটা পদ্ধতি চালু রয়েছে। প্রথম শ্রেণির চাকরিতে মোট কোটা হলো ২৫৮টি। এত কোটার মধ্যে পদ বিতরণ একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। কোটাব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশের নিয়োগ পদ্ধতি অস্বচ্ছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ জেলা কোটা সব অঞ্চলের নিয়োগে বৈষম্য দূর করতে পারেনি। বর্তমানে যে পদ্ধতি চালু আছে তাতে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা কোনো দিনই সম্ভব হবে না। মুক্তিযোদ্ধা কোটা রয়েছে অথচ বর্তমানে যথেষ্ট মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী নেই। তাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সুবিধা সবাইকে দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। শুধু দুস্থ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের ক্ষেত্রে কোটা দেওয়া যেতে পারে। সুতরাং আস্তে আস্তে এ কোটা হ্রাস করে বিলুপ্ত করতে হবে।
ভারতের কোটা পদ্ধতি : বাংলাদেশের মতো ভারতেও কোটা পদ্ধতি রয়েছে। ভারতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকে কোটা অনুসরণ করা হয়। ভারতে কোনো একটি পরিবার থেকে একবার কোটায় চাকরি পেলে সেই পরিবারের কোনো সদস্য আর কখনোই কোটায় চাকরি পাবেন না। যে ব্যক্তি চাকরি পেয়েছেন সেই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পরিবারকে টেনে তুলবেন বলে মনে করে ভারত সরকার।
সূত্র: কালেরকণ্ঠ

No comments: