অফিস না করেই নিয়মিত বেতন পান তিনি

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা সমবায় অফিসের সহকারী পরিদর্শক রাজীব মন্ডল দীর্ঘ ৬ মাস যাবত অফিসে না এসেই নিয়মিত সকল সরকারী সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু সহ: পরিদর্শকই নয় খোদ কর্মকর্তাই জেলা অফিসে কাজের কথা বলে প্রায়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন।

জানাগেছে, সহকারী পরিদর্শক রাজীব মন্ডল ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর বালিয়াকান্দিতে যোগদান করেন। এর আগে তিনি রাজবাড়ী সদর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। রাজবাড়ী সদরে বাড়ী ভাড়া বকেয়া থাকার কারণে বালিয়াকান্দিতে যোগদান করার পর বেতন ভাতা উত্তোলন করতে হিমশিম খেতে হয়। আর সেই সুবাদে এখানে যোগদানের পর প্রথমে মানবতার সুযোগে কয়েকদিন এবং পরে কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে একাধারে অফিস না করেই বেতন ভাতা ২০১৮ সালের ২২ মে তারিখে ৫ মাসের বেতন একবারে উত্তোলন করেন। তারপরেও তিনি অফিসে নিয়মিত নন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। প্রতি মাসে বিভিন্ন সমবায় সমিতি ও প্রতি সপ্তাহে বারুগ্রাম আবাসন প্রকল্প সমবায় সমিতি রাজীব মন্ডল নিয়মিত পরিদর্শন ও ঋণের কিস্তি আদায় করার কথা থাকলেও তিনি সেটি করেন নি। একাধারে ৪ মাস বারুগ্রাম আবাসন প্রকল্প সমবায় সমিতিটিতে যাননি বলে সমিতির কর্ণধারসহ একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। এসব জায়গা পরিদর্শন করার পর প্রতি মাসে ভ্রমন বিল অফিসে দাখিল করার নিয়ম থাকলেও তিনি তা করেননি। তবে সমবায় কর্মকর্তার দাবী রাজীব মন্ডল নিয়মিতই অফিস করেন। চলতি জুন মাস থেকে তিনি অফিসে উপস্থিত হন না বলে তিনি উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তবে উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের দীর্ঘদিন অনুসন্ধান বের হয়ে এসেছে শুধু রাজীব মন্ডলই নন কর্মকর্তা আব্দুল আলীম জেলা অফিসে কাজ আছে বলে সপ্তাহের বেশী দিনগুলোই সাড়ে ১২টার পর অফিসে আসেন। আগের দিন অফিসে না আসলেও পরের দিন উপস্থিত হয়ে পূর্বের সকল দিনের স্বাক্ষর করেন। জুন মাসের ১০ এবং ১১ তারিখে তিনি অফিসে উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় তিনি নিয়মিতই উপস্থিত। ২৪ ও ২৫ তারিখ বেলা ১২টার পর তাকে উপজেলা আসতে দেখা যায়, জানতে তিনি জানান জেলা অফিসে কাজ ছিল। চলতি মাসের শুরু থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত অফিস খোলার দিনসমূহে অফিসে গিয়ে রাজীব মন্ডলকে দেখা যায় নি। তবে সহকারী পরিদর্শক রাজীব মন্ডল বেতন নিতে বালিয়াকান্দিতে এসেছিলেন জুন মাসের ৭ তারিখে। বারুগ্রাম আবাসন প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঋণ গ্রহণ করলেও কিস্তি আদায়ে কোন পদক্ষেপ না থাকায় ঋণগ্রহিতাদের বকেয়া কিস্তি হওয়ায় এখন তারা মামলার সম্মুখিন হতে পারে। শুধু তাই নয় সরকারী টাকা অলস ভাবে পড়ে থাকলেও সমবায় কর্মকর্তা কোন প্রকার গুরুত্বই দিচ্ছেন না কিস্তি আদায় ও বিতরণের ক্ষেত্রে। প্রতি বছর অফিস পরিদর্শনের নামে ৫ শত টাকা থেকে ১ হাজার টাকা নেন এই কর্মকর্তা। নিজের স্বার্থে অচল সমিতি সচল রাখার অভিযোগও রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, সমিতি পরিদর্শন ও অডিটের সকল কাজ এক হাতে করার জন্য রাজীব মন্ডলকে অফিসে না আসায় উৎসাহিত করেন। তাছাড়াও প্রতি মাসের বেতনের একটি অংশ মাসোয়ারা হিসেবে রাজীবের কাছ থেকে গ্রহণ করেন সমবায় কর্মকর্তা। কৃষি অফিসের ৭০টি ও উপজেলা মৎস্য অফিসের ১৪টি, মোট ৮৪টি সিআইজি সমিতিকে নিবন্ধন পেতে সমিতি প্রতি ৮ শত টাকা থেকে হাজার টাকা দিতে হয়েছে কর্মকর্তা আব্দুল আলীমকে।

বারুগ্রাম আবাসন প্রকল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আব্দুল আজিজ মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কি বলব বলার কিছু নেই ৪ মাস কেউ কিস্তি আদায়ে আসেন না। মাসে ৩-৪ বার সমবায় অফিসে যাওয়া পরে কিন্তু রাজীব মন্ডলকে কখনো দেখিনি। তিনি জানান, অনেক ঋণ গ্রহিতাই এখান থেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কিস্তি আদায় না করায় ঋণের বোঝা চাপছে আমাদের। 

উপজেলার বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাজীব মন্ডল ৬ মাসে  ১০-১৫ দিন অফিস করেছে। তবে অধিকাংশ ব্যক্তিই রাজীব মন্ডলকে চিনেন না বলেও জানিয়েছেন। কিভাবে একজন সরকারী কর্মচারী অফিস না করেই বেতন পান সে প্রশ্নও রাখেন তারা।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল আলীম জানান, রাজীব মন্ডল যোগদানের পর থেকেই নিয়মিত অফিসে আসেন। তবে চলতি মাসের ৮ তারিখ থেকে তিনি অফিসে আসেন না। আমি তাকে অফিসে না আসার জন্য তার ঠিকানায় পত্র দিয়েছি। এর আগে আপনি বলেছিলেন রাজীব মন্ডল ৬ মাস যাবত এলপিসি জটিলতার কারণে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন ? জবাবে কর্মকর্তা জানান মানবিক কারণে মাঝে মাঝে ছাড় দিতাম এখন আর না। তাহলে হাজিরা খাতায় কি সে অনুপস্থিত ? না তিনি নিয়মিত উপস্থিত এটি মানবিক। রাজীব মন্ডল উপস্থিত থাকলে কেন সে কিস্তি আদায়ে বারুগ্রাম আবাসনে যাননি বা ভ্রমন বিল দাখিল করেননি ? তিনি জানান, অফিসে কাজের চাপে বারুগ্রামে যেতে আমি নিষেধ করেছিলাম। ভ্রমন বিল দাখিল করা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সমিতি রেজিষ্ট্রেশনে অতিরিক্ত টাকার ব্যাপারটি তিনি অস্বীকার করেন। রাজীব মন্ডলের মাসিক রিটার্ন ও হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তিনি জানান উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে দেখানো যাবে না।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাসুম রেজা জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানতে পেরেছি সহকারী পরিদর্শক রাজীব মন্ডল যোগদানের পর থেকেই অফিস না করেই প্রতি মাসে বেতন উত্তোলন করে আসছে। তবে যোগদানের পরে ১০-১৫ দিন কর্মস্থলে এসেছে বলে অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এ সুযোগ সৃষ্টির জন্য উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাই দায়ী। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
সহ: পরিদর্শক রাজীব মন্ডলের মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

No comments: