সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিপক্ষে মন্ত্রী-এমপিরা : দ্বিধান্বিত ইসি

এন রায় রাজা : আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যরা (এমপি)। বর্তমান সীমানা টিকিয়ে রাখার জন্য তারা ইসির শুনানিতে আইনজীবী নিয়ে হাজির হয়েছেন। নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন। এরপরও বর্তমান সীমানা বহাল না থাকলে তারা উচ্চ আদালতে রিট করারও ঘোষণা দিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এর অংশ হিসেবে গত ১৪ মার্চ ৪০টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানার খসড়া প্রকাশ করে ইসি। গত ২১ এপ্রিল থেকে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। এতে আপত্তি জানিয়ে ৪০৭টি এবং ইসির পক্ষ সমর্থন করে ২২৪টি আবেদন জমা পড়ে। গত শনিবার সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এই শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি রুহুল আমিন সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত খসড়া গেজেটে আপত্তি জানিয়েছি। খসড়া সীমানাটি ভৌগোলিক কারণে অযৌক্তিক।

দ্বিতীয় দিনে বিভক্ত সাতক্ষীরা-৪ ও ৩ আসনের জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে। তবে এ দুটি আসনের পূর্বের অবস্থায় বহাল রাখার দাবিতে ৩৮টি অভিযোগ পড়লেও কালীগঞ্জ উপজেলা অখণ্ড রাখার দাবিতে বিপক্ষে ৩টি আবেদন জমা হয়। পূর্বের সীমানা বহাল রাখার দাবি জানিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও দশম জাতীয় সংসদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, উপজেলাকে অখণ্ড রাখতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

নিজ এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসে অসন্তুষ্ট খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম (ঢাকা-২) ভোরের কাগজকে জানিয়েছেন, ইসি কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই হুট করে তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-২ আসনের যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে খসড়া প্রকাশ করেছে তা যথাযথ নয়। এ নিয়ে আইনজীবী মারফত তিনি ইসির শুনানিতে অংশ নিয়ে পুনর্বিন্যাসের আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিগত ১০ বছরে আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় যে উন্নয়ন করেছি, মানুষের সঙ্গে তাদের সুখ-দুঃখে সঙ্গে ছিলাম সে এলাকা হুট করে কোন হিসেবে কেটে-ছেঁটে একটা খসড়া প্রকাশ করা হলো তা বোধগম্য নয়। আমরা এর বিরোধিতা করে ইসির শুনানিতে আপত্তি জানিয়েছি। আশা করি ইসি এ আসনটি বর্তমান অবস্থায় বহাল রাখবে। যদি তা না হয় তাহলে বিষয়টি আইন-আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।

ইসির শুনানিতে অধিকাংশ আসনের সীমানা বর্তমান অবস্থার পক্ষে যুক্তি-তর্ক তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, অল্পসময়ে সীমানার ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে জনসংযোগে বিঘ্ন ঘটবে। এমনকি কোনো কোনো এমপির আসনও হাত ছাড়া হতে পারে। সে কারণে নিজেরা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনজীবী দিয়ে শুনানিতে অংশ নিয়ে এসব দাবি জানিয়েছেন সংক্ষুব্ধরা। ৪০টি আসনে ৬৩১টি আপত্তির মধ্যে সিংহভাগই সীমানা আগের অবস্থানে রাখার পক্ষে। গুটিকতক ছিল সীমানা পুনর্নির্ধারণের পক্ষে। আর সে কারণেই সীমানা পুনর্নির্ধারণ ঠিক হবে না আগের অবস্থানেরই সঙ্গে থাকবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত ইসি।

এদিকে সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মনি বরগুনা-২ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস চেয়েছেন। আর সাবেক এমপি আবদুল মজিদ মল্লিক বরগুনা-৩ আসনের বর্তমান সীমানা অটুট রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাজুল ইসলাম কুমিল্লা-১০ আসনে পরিবর্তন এনে কুমিল্লা-৯ আসন আগের সীমানায় চান। তিনি আবেদনে বলেছেন, নবগঠিত লালমাই উপজেলার বাকই উত্তর ইউনিয়নকে কুমিল্লা-১০-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৯ আসনের সীমানা আগের মতো নির্ধারণ করা হোক।

গত ৪ দিনে শুনানি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ বক্তা সীমানা পুনর্বিন্যাসের আপত্তি জানান। এমপি এবং সাবেক মন্ত্রীরা নিজে উপস্থিত থেকে বা আইনজীবী মারফত সীমানা পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা করেছেন। তবে দুয়েকটি ক্ষেত্রে ইসির পুনর্বিন্যাসকে স্বাগত জানিয়েছেন কেউ কেউ। সে কারণে এত আপত্তি উপেক্ষা করে ইসির পক্ষে সীমানা পুনর্বিন্যাস তালিকা বজায় রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন ইসির অনেক কর্মকর্তা। তারা মনে করেন, এত আপত্তি উপেক্ষা করে সীমানা পুনর্বিন্যাসে গেলে মামলা-মকদ্দমায় জড়াতে পারে ইসি। তা হলে জাতীয় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কেননা, সময় বড় অল্প।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারলে (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শুনানিতে যদি ইসির সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অধিকাংশ যুক্তি-তর্ক আসে তাহলে বুঝতে হবে সীমানা ডিলিমিটেশনের বিপক্ষে মত বেশি। তবে যদি কেউ মনে করে এর ফলে কোনো একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীকে সুযোগ দেয়ার জন্য এটা করা হয়েছে তাহলে তারা আদালতে এর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। তবে ইসিকে এর আগে পাবলিক নোটিস দিতে হবে। সেটি নিয়ে শুনানি করতে হবে। তবে এ বিষয়ে আদালত যদি মনে করে বিষয়টি সঙ্গত, ইসি ডিলিমিটেশনের মাধমে কোনো পক্ষকে ফেবার করছে তাহলে আদালত মামলা নেবে। সেটি হলে এত অল্প সময়ে তার মীমাংসা করা হলে জাতীয় নির্বাচনে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তবে একবার গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে আর মামলা করার কোনো সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আমরা ৪০টি আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের একটি খসড়া দিয়েছি। তার ওপর প্রায় ৬৩১টি আবেদন আসে। গত ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল ৪ দিন শুনানি হয়। যদিও এ শুনানিতে সীমানা বর্তমান অবস্থানে রাখার পক্ষে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেছেন। কেউ কেউ ইসির পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। সব শুনানির সারাংশ আমরা কমিটিতে পর্যালোচনা করছি। আশা করি খুব শিগরিই একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারবে ইসি।

ইসি সচিব মো. হেলালুদ্দিন আহমদ জানান, শুনানি শেষ হয়েছে মাত্র। এ বিষয়ে একটি কমিটি আছে। তারা একটি মতামত দেবে। এ নিয়ে সিইসির নেতৃত্বে ইসি কমিটিতে আলোচনা হবে। পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

No comments: