নারীর তিন শাসন আমল----------কেয়া তালুকদার

কেয়া তালুকদারঃ প্রথম শুরু হয় পিতার শাসন আমল ৷ একটা মেয়ে জন্মের পর পরিবারে পিতার নিষেধ পালন করে চলে ৷ ছোটবেলা থেকেই খেলতে বারণ, জোরে কথা বলা যাবেনা, অট্টহাসি দেয়া যাবেনা, খেলনা নিয়ে বায়না করা যাবেনা, কাপড় বেশী চাওয়া যাবেনা, ছেলেদের সাথে কথা বলা যাবেনা, বড়দের সাথে গল্প করা যাবেনা, দোকানে যাওয়া যাবেনা, খাওয়া নিয়ে ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করা যাবেনা, সন্ধ্যার আগেই বাড়ীতে ফিরতে হবে, বাইরে গেলে বেশী কথা বলা যাবেনা, ভাই যে স্কুলে পড়ে সেই স্কুলে পড়তে পারবেনা, মায়ের কাজে সাহায্য করতে হবে, ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়া যাবেনা, ছেলে বন্ধু থাকা যাবেনা ইত্যাদি আরো অনেক কিছু ৷ একটা মেয়ের জন্মকে বংশ রক্ষার পথ মনে করেনা যে সমাজ ব্যবস্থা সেই সমাজে মেয়েকে তো অবহেলা আর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার স্বীকার হতেই হবে এটাই স্বাভাবিক ৷ চরম বৈষম্য নিয়ে বড় হয় ভাইয়ের সাথে ৷ তারপর পৈত্তিক সম্পত্তিও সঠিকভাবে দেয়না ৷ পিতামাতার অর্জিত অর্থেরও বন্টন হয়না সুষ্ঠুভাবে ৷ বিয়ে দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে পরিবারের সবাই ৷ যেন বিদায় করে দিতে পারলেই রক্ষা ৷ সব দায়দায়িত্ব শেষ ৷

এরপর আসে স্বামীর শাসন আমল ৷ বিয়ের রাতেই বলে দেয়া হয়, আমার পরিবারের সব কিছু দেখার দায়িত্ব এখন থেকে তোমার ৷ মনে হয় বউ না একজন দাসীকে নিয়ে এসেছে ঘরে ৷ শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি, দেবর-ননদ সবার ফরমায়েস খাটতেই দিন পার হয় ৷ সে কখন খায়, কখন ঘুমায় তার কোনো খোঁজ রাখেনা কেউ ৷ নিজেদের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেটা নিয়েই ব্যস্ত সবাই ৷ অবসরে যদি টিভি দেখতে বসে তখন শুরু হয় রিমোট নিয়ে টানাটানি ৷ স্বামী দেখবে খেলা, সন্তান দেখবে কার্টুন ৷ বউ আর কি দেখার সুযোগ পায় ৷ সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, পড়াশুনা দেখা, খাওয়ানো সহ সব আবদার পূরণ করার দায়িত্ব মায়ের ৷ ঘরের বাইরে যেতে বারণ ৷ বাইরের জগতটাকে চোখ মেলে তাকনোর উপায় নেই ৷ যদি চাকুরীজীবি হয় নারীটি তাহলে দুই স্থানের দায়িত্ব পালন করতে হয় ৷ এর জন্য আলাদা কোন ছাড় নেই ৷ স্বামী হলো শাসন কর্তা ৷ তার কথার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই ৷ তার ইচ্ছে অনিচ্ছা অনুযায়ী চলতে হয় ৷ সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারেও কোনো অধিকার নেই ৷ সব যেন চাপিয়ে দেয়া ৷ টাকা খরচ করার ব্যাপারেও নিজের স্বাধীনতা থাকেনা ৷ কাজের চাপের জন্য বাপের বাড়িও যেতে পারেনা ৷ বন্ধুদের বাড়িতে আড্ডা দেয়া যাবেনা ৷ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এখানে হারায় ৷ রাত করে বাড়িতে ফেরা যাবেনা ৷ মার্কেটে গেলে হিসাব করে খরচ করতে হবে ৷ ফেসবুক থাকলে স্বামীকে তার পাসওয়ার্ড জানাতে হবে ৷ শারীরিক সম্পর্কের সময় নারীকেই বেছে নিতে হয় জন্মনিয়ন্ত্রন পিল ৷ একরকম চাপিয়ে দেয়া ৷ অথচ পুরুষদেরও জন্য এসব আছে ৷ রান্না ভালো না হলে রাগারাগি ৷ অসুস্থ হলে সেবা করার কেউ নেই ৷ এখনকার সন্তানরাও একটু বড় হলেই মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায় ৷ ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকে ৷ মাকে ঘরে ঢুকলে নক করে ঢুকতে হবে ইত্যাদি আরো অনেক কিছুই ৷

এরপর আসে ছেলের শাসনআমল ৷ স্বামী জীবিত থাক বা মৃত থাক ছেলে বড় হলে মাকে শাসন করতে শুরু করে ৷ প্রথম শাসনটাই হলো টাকা খরচ ৷ ছেলে যেহেতু চাকুরী করে টাকা উপার্জন করা শিখে গেছে, তাই তার ক্ষমতাও বেড়ে গেছে ৷ পর্যাপ্ত টাকা না পেয়ে সংসারও চলে তেমনি ভাবেই ৷ স্বামীর আয় যেহেতু বন্ধ, তাই ছেলের উপার্জনের দিকেই হাত পেতে থাকতে হয় ৷ অনেক সময় পান খাওয়ার মত টাকাও মায়ের হাতে না ৷ অসুস্থ হলে তো খোঁজ খবর নেয়ার পাত্তাই থাকেনা ৷ ওষুধ লাগবে কিনা সেটাও জিঞ্জাসা করেনা ৷ নিজের বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে দাওয়াত খাওয়ানোর সময় ঠিকই টাকা বের হয় ৷ বউ আসলে তো আরো বিপদ ৷ বউ যা বলবে তাই হবে ৷ সংসারে কোথায় কত টাকা খরচ হবে সব দেখবে ছেলে আর ছেলের বউ ৷ বলে তোমার এখন বয়স হয়ে গেছে তুমি সব বিষয়ে কথা না বললেও চলবে ৷ বউ শ্বাশুড়ির ঝগড়া হলে সব মায়ের দোষ ৷ ছেলে বলে মা বউকে সহ্য করতে পারেনা ৷ ছেলে পিতামাতার জীবনের যত সঞ্চয় সব হাতিয়ে নেয় ৷ তারপর একজন চাকরের মত জীবন কাটাতে হয় ৷ মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়া ছেলে এখন সংসারের বাদশা ৷ আবার অনেক ছেলে বিয়ে করার পর বউ নিয়ে আলাদা বাড়ীতে থাকে ৷ মা হয়ে যায় পর ৷ নিজের সুখ শান্তির কথা হিসেব করে মাকে যায় ভুলে ৷ অনেক ছেলেই ঈদের দিনও খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না মায়ের ৷ মা ছেলের বাড়িতে বেড়াতে আসলে ঘরের কোণে জড়সড় হয়ে থাকতে হয় ৷ মনের সাধগুলো মনেই ঘুরপাক খায় ৷

অনেক পুরুষদের ধারণা নারী কাদামাটি, তাকে যেভাবেই গড়ে তোলা যাবে, সেভাবেই সে গড়ে উঠবে৷ পরিবার নারীর জন্য ছোট্ট একটা জেলখানা ৷ শাসন, নিষেধকারী সংখ্যা এখানে বেশী ৷ বাধ্য হয়েই নারীরা এসব মেনে নিচ্ছে৷ নারী যদি স্বাবলম্বী হয় তাহলে হয়তো ঘর ছাড়ছে৷ একা বাস করাও এদেশের নারীর জন্য নিরাপদ নয় ৷ পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার জালে আটকে যাচ্ছে নারীর স্বাধীনতা ও সাফল্য ৷

No comments: