সংঘর্ষ, গুলি, আহত অর্ধশতাধিক; রণক্ষেত্র সিলেট

জুড়ী টাইমস সংবাদঃ রায় ঘোষণার পরপরই গতকাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয় সিলেট। নগরীর কোর্ট পয়েন্ট, সিটি পয়েন্ট, জেলা পরিষদের সামনে, সুরমা মার্কেট ও জিন্দাবাজারে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। ত্রিপক্ষীয় এ সংঘর্ষে অংশ নেয় বিএনপি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতেও মহড়া দিয়েছে কর্মীরা। এতে অন্তত ৫ জন গুলিবিদ্ধ সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জিন্দাবাজারে গুলির লড়াই চলছিল। বিএনপির জামান গ্রুপের কর্মীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষকালে তাদের গ্রুপের ৩ কর্মী গুলিবিদ্ধ ছাড়াও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। রায় ঘোষণার আগেই সকাল থেকে সিলেট নগরীতে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। আর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা অবস্থান নেন জেলা পরিষদ চত্বরে। জেলা পরিষদের ঠিক সামনেই হচ্ছে আদালত এলাকা। সেখানে অবস্থান নেন বিএনপির কর্মীরা। তাদের সঙ্গে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা অবস্থান নেন। রায় ঘোষণার একটু আগে সিলেটের রংমহল টাওয়ার ও আশপাশ এলাকায় অবস্থান নেন বিএনপির সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জামান ও তার অনুসারীরা। নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান নেয় জেলা ছাত্রদলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মকসুদ আহমেদ ও তার  অনুসারী। রায় ঘোষণার আগেই অ্যাডভোকেট জামানের অনুসারীরা নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় শোডাউন দিয়েছে। পুলিশের কয়েকটি ব্যারিকেড ভেঙে তারা এই মিছিলে অংশ নেয়। জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থান নেয় ছাত্রদলের মকসুদ গ্রুপের কর্মীরা। সুরমা মার্কেট এলাকায় অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের পীযূষ গ্রুপের কর্মীরা। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথমে আদালত ফটক এলাকায় মিছিল শুরু করেন বিএনপির কর্মীরা। এ সময় জেলা পরিষদে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মীরাও মিছিল শুরু করে। দুটি মিছিল মুখোমুখি হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় সংঘর্ষ। মাঝখানে থাকা পুলিশ লাঠিচার্জ চালিয়ে প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিএনপির কর্মীরা আদালত এলাকা থেকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ইটপাটকেলের আঘাতে এ সময় দুইজন পুলিশ সহ ছাত্রলীগের ৩ কর্মী আহত হন। তারা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। প্রায় আধাঘণ্টা ওই এলাকায় বিএনপি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ সুরমা মার্কেট, সিটি পয়েন্ট এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় রংমহল পয়েন্ট এলাকা থেকে অ্যাডভোকেট জামান গ্রুপের কর্মীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষকালে জামান ও তার অনুসারীরা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার শেল ছুড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষের মধ্যে শুরু হয় গুলি-পাল্টা গুলিবিনিময়। গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে কোর্ট পয়েন্ট, সিটি পয়েন্ট ও আশপাশ এলাকা। এ সময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কর্মীকে হেলমেট পরা অবস্থায় গুলি ছুড়তে দেখা যায়। উভয়পক্ষের হাতে লাঠিসোটা, রড ছাড়া ধারালো অস্ত্র দা, চাপাতি ছিল। ওই সংঘর্ষের সময় কয়েকজনকে  কোপানো হয়। তাদেরকে পুলিশ গুরুতর অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। আর বিএনপির কর্মীদের  গোপনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়। বিএনপির কর্মীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের সময় তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। বেলা ৪টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষের কারণে সিলেট নগরীতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুরো নগরী ফাঁকা হয়ে পড়ে। যানবাহন দেখা যায়নি রাস্তায়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষের সময় পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে নিজেদের ছোড়া রাবার বুলেটে এক কনস্টেবল আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কামরুল নামের এক ছাত্রদল কর্মীর মাথায় রাবার বুলেট লেগেছে। তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা সংঘর্ষ চলার পর বিএনপি কর্মীরা পিছু হটে। এ সময় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীদের দখলে যায় কোর্ট পয়েন্ট, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, সিটি পয়েন্ট সহ কয়েকটি এলাকা। প্রকাশ্যে হাতে দা, রড নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা মহড়া দিয়েছেন। এদিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহউদ্দিন সিরাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের হয়। মিছিলে কয়েকশ’ নেতাকর্মী অংশ নেন। মিছিল শেষে সমাবেশে অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ দাবি করেন বিএনপির কর্মীরা আদালত এলাকায় হামলা চালিয়েছে। তারা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, তাদের নেত্রী দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন। আর সন্ত্রাসীদের দিয়ে দেশের পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ শান্তিতে বিশ্বাস করে বলেই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালায়। কিন্তু বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা সিলেটে তাদের মিছিলে হামলা চালিয়েছে। তারা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। সিলেটের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য সিলেট আওয়ামী লীগের কর্মীরা মাঠে রয়েছে বলে দাবি করেন কামরান। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জামান গ্রুপের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিতে তাদের অন্তত ৫ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে নান্টু, এমসি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রানা সহ কয়েকজন রয়েছেন। তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানান তারা। কোর্ট পয়েন্ট ও আশপাশ এলাকার ঘটনার পর বিকাল পৌনে ৫টার দিকে নগরীর জিন্দাবাজার এলাকা দখলে নেয় জেলা ছাত্রদলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মকসুদ আহমেদের নেতৃত্বে আলতাফ হোসেন সুমন ও ফকরুল ইসলাম রুমেলসহ তার গ্রুপের কর্মীরা। পুরান লেন গলির ভেতর থেকে এসে তারা জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় পুলিশ এগিয়ে এলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ছাত্রদল কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ছাত্রদল কর্মীরা কাজী ইলিয়াস গলির মুখে অবস্থান নেয়। সেখানেও পুলিশ টিয়ার শেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাদের সরিয়ে দেয়। এ সময় কাজী ইলিয়াস এলাকা থেকে পুলিশ ৩ পথচারীকে আটক করে নিয়ে যায়। সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশের শেল্টারে ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা ও গুলি চালিয়েছে। এতে সিলেটে বেশ কয়েকজন ছাত্রদল ও যুবদল কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রচুর। পুলিশও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছে বলে দাবি করেন তিনি। সিলেট মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। যারাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। 

No comments: