বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির জাতীয় সম্পদ

সাইফুল ইসলাম সুমন, ঢাকা থেকে: জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির জাতীয় সম্পদ। ওই ভাষণে রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা সবকিছুই আছে। ওই ভাষনের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই ভাষন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সব কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি ও দিক-নির্দেশনা। গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে জাতীয় প্রেসক্লাব আয়োজিত ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ভোরের কাগজ সম্পাদক ও সেমিনার উপকমিটির আহ্বায়ক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন। বিশেষ আলোচক ছিলেন- সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামরুল হাসান খান। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন- জাতীয় প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি ও যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, সহসভাপতি আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, দৈনিক অর্থনীতির সম্পাদক জাহিদুজ্জামান ফারুক, ৭ মার্চ ভাষণের স্থিরচিত্র সাংবাদিক রফিকুর রহমান, ডিইউজের সাবেক সভাপতি আকরাম হোসেন খান, নারী সাংবাদিক নাসিমুন আরা হক মিনু, সাংবাদিক স্বপন কুমার সাহা, শফিউল করিম সাবু প্রমুখ।

ওবায়দুল কাদের জানান, সাংবাদিকদের নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের পদক্ষেপ আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তথ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার সংবাদপত্র মালিকদের সঙ্গে তথ্যমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে ৯ম ওয়েজবোর্ড আদায়ে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না থাকলে দাবি আদায়ে সমস্যার সৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। এটি বাঙালির জাতীয় সম্পদ। এ ভাষণই স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল মুক্তিকামী জনতাকে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা নামক একটি পত্রিকায় জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, ৭ মার্চের ভাষণে আমরা স্বাধীনতার গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছিলাম। অথচ তার দল বিএনপি সেই ভাষণটিকে সম্মান করে না। এমনকি ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়া নিজেও এই ভাষণটিকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। রেডিও-টিভিতে সেটির প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। এই ভাষণ বাজানোর অপরাধে অনেক নেতাকর্মীকে জেলে যেতে হয়েছে। অসংখ্য কর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে। মাইক ব্যবসায়ীর হাত-পা ভেঙে দেয়া হয়েছে। অথচ সেই ভাষণটিই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। আজকে সেই ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেয়ার পরেও বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তাই তাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা শুনলে হাসি পায়।

তিনি বলেন, বিএনপি জানে, নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে। একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করাই হচ্ছে সরকারের কাজ। অন্য গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে আমাদের দেশেও সেভাবেই শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইসির অধীনে থাকবে। সংস্থাগুলো তখন সরকারের কথা শুনবে না। তারা কথা শুনবে নির্বাচন কমিশনের। বিএনপি সেনাবাহিনীর কথা বলছে। সেনাবাহিনী তো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়। আরপিওতে না থাকলে সেনাবাহিনী কিভাবে রাখবে ইসি।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকের অভাব নেই। মাঝেমধ্যে দলে কিছু সমস্যা হয়। ঘরে শত্রু রাখলে বাইরে আক্রমণ তো হবেই। আমরা দুর্বল হলে দুর্বলতার ওপর বেশি আঘাত আসবে। আমরা আশাবাদী, আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এ জন্য আমরা জেলাগুলোতে দিনরাত পরিশ্রম করছি। উপজেলা পর্যায়ে যাচ্ছি।

৭ মার্চের ভাষণ একটি অলিখিত মহাকাব্য উল্লেখ করে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, এ ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, এটি ছিল একটি ধারাবাহিকতা। ষাটের দশক থেকে তিনি সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেরিয়েছেন। বক্তব্য দিয়েছেন। বার বার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণই মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জীবন সংকটাপন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র চলছে। শেখ হাসিনার জীবন এখন সংকটাপন্ন। আমরা মনে করি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য শেখ হাসিনাকে বেঁচে থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু এ জাতিকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা তাকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

কামরুল হাসান খান বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধীনতার ঘোষণা সবকিছুই আছে। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ ছিল সব কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি ও দিক-নির্দেশনা। এ ভাষণ গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। বর্তমানে দেশে একটি সংকট সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। তা কাটিয়ে উঠতে ৭ মার্চের ভাষণের মতো আরেকটি ভাষণ দিয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। আর এই চেতনা বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকেই তাকে রাজনীতির কবি বলা হয়ে থাকে। তার এ ভাষণে বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সবই আছে। ইউনেস্কো এ ভাষণকে যে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটি শুধু বাঙালির নয়, সারাবিশে^র।

শফিকুর রহমান বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের পর বাঙালি জেগে উঠেছিল। এ ভাষণ ছিল দিক-নির্দেশনামূলক। কোথায়, কিভাবে ও কোন স্থানে যুদ্ধ করতে হবে- এ বিষয়ে কাউকেই কিছু বলে দিতে হয়নি।

শ্যামল দত্ত বলেন, এ ভাষণকে পাকিস্তানিরা কিভাবে দেখছেন? খাদিম হোসেন রাজা নামের একজন লেখক তার বইয়ে লিখেছেন ‘যে আমরা বিস্মিত হয়ে দেখলাম, শেখ মুজিব যা যা করার, তা তা করে গেলেন, কিন্তু আমরা কেউই বুঝতে পারলাম না। স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত ঘোষণাটি এরই মধ্যে তিনি দিয়েই ফেলেছেন।’ সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ, নানামুখী চিন্তা, বাংলাদেশের চিন্তা এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চিন্তাগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গ্রন্থে আছে। এ সংক্রান্ত তথ্য আরো জানতে সিদ্দিক সালেকীন ও খাদিম হোসেন রাজার লেখা দুটি গ্রন্থ পড়ার পরামর্শ দেন তিনি।

No comments: