দলের নাম ভাঙ্গীয়ে নিজের আখের গোছিয়েছেন নানা অপকর্মের হোতা কয়ছর এম আহমদ

যুক্তরাজ্য ও জগন্নাথপুর উপজেলা প্রতিনিধি: ১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের পুরো সময়টা নানা ফায়দা লুটে দল ক্ষমতা হারানোর পর দলের দুঃসময়ে আত্মরক্ষার্থে লন্ডন পালিয়ে গিয়ে দলের ও তারেক রহমানের নাম ভাঙ্গীয়ে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নানা অপকর্মের হোতা কয়ছর এম আহমদ নিজের আখের গোছিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক পৌর মেয়র ও জগন্নাথপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি  আক্তারুজ্জামান আক্তার । গত ২৪ সেপ্টেম্বর জগন্নাথপুর উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত বিএনপির সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এই অভিযোগ করেন। 

আক্তারুজ্জামান আক্তার বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পূর্বে সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলায় যে মানুষটি রাজনীতির ধারে কাছেও ছিলো না, যাকে তেমন কেউ চিনতোও না, বিএনপির সরকার গঠনের পর তিনি হয়ে যান জগন্নাথপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯১-১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারের পুরো সময়টা উপভোগ করে নানা ফায়দা লুটে। ১৯৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল জগন্নাথপুরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ কর্তৃক বিএনপি কর্মী হাফিজুর নিহত হবার পর এই মামলায় সাক্ষী থাকা স্বত্ত্বেও দলকে বিপদে ফেলে আত্বরক্ষার্থে লন্ডনে পালিয়ে যায় এবং  হাফিজুর হত্যা মামলার রেফারেন্সে সে রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনে স্থায়ী হয়। সময়ের পরিক্রমায় তিনি এখন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন। 

আক্তারুজ্জামান জানান, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কয়ছর ও সানি  মিলে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিয়ে বেশীরভাগ অযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করেছে। ফলে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। সাবেক এই পৌর মেয়র বলেন, কয়ছর নাকি এই এলাকায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী । এলাকায় পোষ্টার ও বিল বোর্ড দিয়ে তিনি তার প্রার্থীতা ঘোষণা করছেন। তিনি একটি নাটকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পাখি যখন কচুরিপেনার উপর বসে, তখন কচুরিপেনার নড়াচড়ায় সে নিজেকে রাজা রাজা ভাবে । কয়ছরও ঠিক তেমনি নিজেকে রাজা রাজা ভাবছে। কিন্তু সত্য হলো তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে নানা অপকর্মের নায়ক কয়ছর লন্ডনে বসে ইলেকশন করার স্বপ্ন দেখলে সেটা জগন্নাথপুরবাসী মেনে নেবে না। এটা তার দিবাস্বপ্ন। 

কয়ছরের বিরুদ্ধে রয়েছে দলের ও তারেক রহমানের দৈনন্দিন গোপনীয় সংববেদনশীল তথ্য পাচারের গুরুতর অভিযোগ। তারেক রহমানকে ঘিরে লন্ডনের পর্দার পেছনের নানামূখী রাজনৈতিক কৌশল সরকারের বিভিন্ন মহলে পাচার করে এই চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। নেতাকর্মীরা জানান, তারেক রহমানের বাসা সংলগ্ন  কিংসষ্টন হোটেল লজে  অনেক সময় কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন তারেক রহমান। এসব বৈঠকের বিষয়বস্তু মুহুর্তের মধ্যেই হাত বদল হয়ে চলে যায় সরকারের বিশেষ মহলে। এমনই সিনিয়র এক নেতার সাথে তারেক রহমানের বৈঠকের অডিও ফাঁস হয় এই কয়ছরের মাধ্যমে। ওই বৈঠকে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একমাত্র তিনিই উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রয়াত ড. পিয়াস করিমের সাথে ইষ্ট লন্ডনের কমার্শিয়াল রোডের একটি হোটেল কক্ষে তারেক রহমানের সাক্ষাত ও আলোচনার বিষয়বস্তুও প্রকাশ্যে চলে আসে। আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে ফাঁস করে দেয়া এসব ঘটনা দলকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। 

যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক রাজন আলী সাঈদ জানান, প্রথম মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার কারিশমা। তারেক রহমানের সহকারি সানিকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলে নিজস্ব সিন্ডিকেট। নিজেকে তারেক রহমানের কাছের মানুষ ও প্রভাবশালী পরিচয় দিয়ে নিজের পকেট ভারি করতে থাকে। যুক্তরাজ্য বিএনপির কমিটি গঠনসহ সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি গঠনের নামে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক বিভিন্ন অনিয়ম, অপর এক বিএনপি নেতার ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে অনুষ্ঠান ভেন্যুর ভাড়া প্রদানসহ নানা অভিযাগে কয়সরের নাম জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ও তার নিজ এলাকা সুনামগঞ্জের বিভিন্ন কমিটি গঠনে ভূমিকা এমনকি প্রভাব খাটিয়ে আপন ছোট ভাইকে জগন্নাথপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ পাইয়ে দেয়াসহ নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করার নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

বিভিন্ন তদ্বির বাণিজ্যের পাশাপাশি কয়ছর সিন্ডিকেট বিভিন্ন পদ পদবি ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের নাম করে হাতিয়ে নেন মোটা অংকের টাকা। এসব এখন একেবারে অপেন সিক্রেট। সব কিছু জানা থাকলেও শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস দেখান না। কেউ এসব ব্যাপারে প্রতিবাদের সাহস দেখালে তার বিরুদ্ধে নেমে আসে বহিস্কারের খড়গ। এই সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় একদিকে যেমন তারেক রহমানের ইমেজ সঙ্কটে পড়ছে তেমনি দলেরও মারাত্বক ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। 

তারেক রহমান নেতাকর্মীদের খুব ভালবাসেন, বিশ্বাস করেন। তার সরলতা ও ভালবাসার সুযোগ নিয়ে নানা অনৈতিক কাজ করে পার পেয়ে যাচ্ছে তার কাছের মানুষ দাবীদাররা। সাধারণ সম্পাদক কয়ছর ও ড্রাইভার কাম সহকারি সানি বিভিন্ন কৌশলে নেতাকর্মীদের কাছে থেকে আদায় করছে মোটা অংকের অর্থ। শুধু কমিটি বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার পাউন্ড। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা দেশে বিদেশে দলের পদ ও মনোনয়ন প্রত্যাশী বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে সারাদেশে তাদের অনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনৈতিক ভাবে আদায় করছে আর্থিক সুবিধা। 

কয়ছর ও সানির রয়েছে নেতাকর্মীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ। কয়ছরের কাছে নেতাকর্মীরা কোনো কাজে গেলে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে, পাত্তা দেয় না । কোন সভা সমাবেশে নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের কাছাকাছি গেলে কয়ছর ও সানি তাদের চরম অপমান করে, ঠেলে দুরে সরিয়ে দেয়। এসব কারণে প্রায়ই নেতাকর্মীরা বিব্রত হয় ও তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।  

রাজনীতির মাঠে বিরোধিতা থাকলে আওয়ালীগ নেতার সাথে ব্যবসাায়িক সম্পর্ক রয়েছে কয়ছর এম আহমেদের। যুক্তরাজ্য থেকে বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে সবচেয়ে বেশী প্রচারণা ও কুতসা রটনা করেন লন্ডন আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য সুশান্ত দাস গুপ্ত। প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ট ও কাছের মানুষ সেই সুশান্ত দাস হচ্ছে যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদের ব্যবসায়িক পার্টনার। দিনের আলোতে তারা যোজন মাইল দুরত্বে থাকলেও রাতের বেলা ঠিকই তারা একই টেবিলে আড্ডায় মিলিত হন।  

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য বিএনপির বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত হয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন কয়ছর এম আহমেদ। শীঘ্রই নতুন  কমিটি গঠন করা হবে। আবারও তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন তিনি। তার এ দৌঁড়ঝাপে নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন। তারা আর এই সুবিধাবাদীকে দলের  সাধারণ সম্পাদক পদে দেখতে চান না। কিন্ত প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। তারা অভিযোগ করেন, সুবিধাবাদী কিছু নেতার কারণে ত্যাগী ও যোগ্য অনেক নেতাই বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বারবার। কিন্তু এবার এর ব্যত্যয় ঘটবে বলে নেতাকর্মীরা আশা করেন। অযোগ্য ও সুবিধাবাদীদের কমিটিতে পদ না দিয়ে ত্যাগী ও পরিক্ষীত নেতাকর্মীাদেরকে কমিটিতে নিয়ে আসার জন্য তারা দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি আহ্বান জানান। যোগ্য, ত্যাগী, উচ্চশিক্ষিত ও দূরদর্শী নেতাদের সমন্বয়ে যুক্তরাজ্য বিএনপির নতুন কমিটি হবে বলে নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করেন। নেতাকর্মীরা বলেন এমন নেতা কমিটিতে আসবেন যারা হবেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সকল মহলে গ্রহণযোগ্য, কমিউনিটিতে প্রভাবশালী ও স্বচ্ছ ইমেজসম্পন্ন। তারা বলেন,  বিশেষ করে গত দুই মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক আহমদের বিরুদ্ধে দলের দুঃসময়ে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। এসব সুবিধাভোগীদের কারণে দিন দিন দলের সাংগঠিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব দলের জন্য অশনিসংকেত।

No comments: