স্বপ্নের সেতু ও শেখ হাসিনা

মাহমুদুল বাসার: শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যয়ের সঙ্গে পদ্মাসেতু নির্মাণের সাফল্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বারবার তিনি মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসছেন বলেই পদ্ধাসেতু নির্মাণের সুযোগ পেলেন। এজন্য স্রষ্টার কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিরোধ্যতা কাজ করে, সে দৃষ্টান্ত লক্ষ্যযোগ্য। তাকে দেশে আসতে বাধা দিয়েছিল জিয়াউর রহমান সরকার, দ্বিতীয়বার তাকে দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কোনোটাই তিনি মানেননি। তাকে রোধ করা সম্ভব হয়নি। তার মনেই নিহিত আছে তার রাজনৈতিক প্রত্যয়শীলতা। অন্তত দুটো হত্যার উদ্যোগ তাকে ভীতির চাপে ফেলে রাজনীতির মাঠ থেকে সংকুচিত করে ফেলতে পারত : এর একটি ২০০০ সালে কোটালিপাড়ায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা আর অন্যটি ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড নিক্ষেপ। সে ভয়কেও তিনি অতিক্রম করেছেন। তিনি ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’ করেছেন। মৃত্যুভয় তাকে রোধ করতে পারেনি, অপ্রতিরোধ্যতা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অপ্রতিরোধ্য ছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু।

এই সাহসেরই দৃষ্টান্ত পদ্ধাসেতু। তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও কর্মকর্তারা আমাদের দেশীয় এলিটদের খপ্পরে পড়ে পদ্ধাসেতুতে প্রদানকৃত ১৯০ কোটি ডলার ঋণ খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে ফেরত নিয়েছিলেন। আমাদের বিশ্বাস, কানাডার আন্তর্জাতিক আদালত যখন ঘোষণা দিল যে, দুর্নীতি হয়নি তখন বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষের ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশের কাছে। তখনকার পত্রিকাগুলো খুলে পড়ে দেখুন, ‘পদ্ধাসেতুর দুর্নীতি হয়েছে’ এই ঘোষণার পর বিএনপি নেতাদের বক্তব্য আর বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য এক ধারায় চলছিল। বক্তব্যগুলো শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি মাটির নিচে চাপা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। পদ্ধাসেতুর ঋণ প্রত্যাহার কোনো ছোটখাটো ঘটনা ছিল না, ২১ আগস্টের মতো বড় ঘটনাই ছিল। উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যয়ের শেকড় উৎপাটন করা। অন্য যে কোনো প্রমাণ সাইজ মাপের নেত্রী হলে ভয় পেতেন। নিজেকে গুটিয়ে ফেলতেন। অথচ তিনি সুদৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্ধাসেতু হবে। যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে একটি দেশ স্বাধীন করতে পারে, তারা কেন একটি সেতু করতে পারবে না?’

এই ঘোষণার পর শেখ হাসিনার ওপর শিলাবৃষ্টির মতো বিদ্রূপবাণ বর্ষিত হতে লাগল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বিএনপি যেভাবে লাফিয়ে উঠেছে, তেমনি পদ্ধাসেতুর দুর্নীতি নিয়ে লাফিয়ে উঠেছিল। বলেছিল, ‘বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা ব্যতিরেকে পদ্মাসেতু নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখা গরিবের ঘোড়ার রোগ।’ শ্রী মোরারজী দেশাইরা প্রথমে কল্পনা করতে পারেননি যে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী কী চিজ আর এ দেশের ডক্টরেট, এলিট-মধ্যবিত্ত, সুশীলরা কল্পনা করতে পারেননি শেখ হাসিনা কেমন নেতা। আজ স্বপ্নের পদ্মাসেতু যেমন দৃশ্যমান, তেমনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রত্যয় বিকাশমান।

১৯৭১ সালের রুশ বিপ্লবের পরে লেনিন-স্ট্যালিন যেমন ক্রমবর্ধমান শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, তেমনি শেখ হাসিনাও বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে রূপ দিতে দেশি-বিদেশি শত্রুতা মোকাবেলা করে যাচ্ছেন। পাকিস্তান তো শেখ হাসিনার পিছু ছাড়ল না। এখন পাকিস্তানে অবস্থান করছে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের কেউ কেউ, যুদ্ধাপরাধীদের কেউ কেউ। যেমন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার। তারা আইএসআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মিয়ানমারে আইএসআইয়ের উসকানিতে গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন আরসা এবং এআরএসএ মিয়ানমার সেনা ছাউনি ও পুলিশ ফাঁড়ির ৩০ জায়গায় হামলা চালিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে আক্রমণ চালাবার ইস্যু তৈরি করে দিয়েছে যাতে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে।

১০ লাখ রোহিঙ্গা এখন শেখ হাসিনার কাঁধের ওপর। বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও মানবিক বিবেচনায় শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের বুকে টেনে নিয়েছেন। এর মধ্যেই আমরা খবর পেলাম পত্রিকায়, ‘অবশেষে কাজ শুরুর মাত্র দুই বছরের মধ্যেই প্রথম অবয়ব পেয়ে দৃশ্যমান হলো বহুল কাক্সিক্ষত পদ্ধাসেতু। এদিকে স্বপ্নের পদ্ধাসেতু দৃশ্যমান হওয়ার বিশেষ দৃশ্য আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ দূর থেকে অবলোকন করে। নদীর বুকে প্রথম জেগে ওঠা মূল সেতুর প্রথম স্প্যানটি বসানোর পর পরই আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে পদ্মাপাড়ের সব শ্রেণির মানুষ। এ সময় সবার মধ্যে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।’

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রমাণ হয়েছে, আমরাও পারি।’ বাংলাদেশের উন্নতির দিগন্ত খুলে দেবে পদ্মাসেতু। বঙ্গবন্ধু সেতু যেমন উত্তর বঙ্গকে রাজধানীর সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছে, তেমনি পদ্মাসেতু দক্ষিণবঙ্গকে ঢাকা-রাজধানীর সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে। এতে অর্থনৈতিক উন্নতির চাকা দ্রæতগতি সম্পন্ন হবে। দক্ষিণবঙ্গের নিভৃত পল্লীর মানুষও পদ্মাসেতুর সুফল ভোগ করবে। ট্রেন সার্ভিস চালু হবে, গ্যাস সংযোগ ঘটাবে দক্ষিণবঙ্গে। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা যাতায়াত করা যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মোচন হবে। মানুষের আয় বাড়বে, জীবনযাত্রার মান বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে পদ্মাসেতুর কারণে। ঢাকায় জনবসতির চাপ কমবে। ঢাকার মানুষ ক্রমান্বয়ে দক্ষিণের দিকে ঝুঁকে পড়বে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ যদি দিনে দিনে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে যেতে পারে তাহলে ঢাকায় অবস্থান করার প্রয়োজন হবে না।

আমার বাড়ি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায়। মনে পড়ে, কত কষ্টে ঢাকায় আসতে হতো। পায়ে হেঁটে, কয়েকবার বাস বদল করে, ফেরিতে ২/৩ ঘণ্টা নদীতে কাটাতে হতো। সেই কষ্ট দূর হবে। দূর করে দিলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। কত বড় হিম্মত তার, কত বড় বুকের পাটা, বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব অর্থায়নে পৃথিবীর অন্যতম সেরা সেতু পদ্মাসেতু নির্মাণ করে দিলেন। এটি তার দেশপ্রেম এবং সাহসের সমন্বিত দৃষ্টান্তের সৌধ। জয় বাংলা।

মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক।

No comments: