বড়লেখায় নব-দম্পতিকে দু’দিন আটক করে নির্যাতনের অভিযোগ

লিটন শরীফ:  মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বিচারের নামে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রহসনের অভিযোগ। নব-দম্পতিকে দু’দিন ইউপি কার্যালয়ে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার (২০ অক্টোবর) খবর পেয়ে পুলিশ এ দম্পতিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার এ ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে। ইউনিয়ন কার্যালয়ে দুইদিন নব-দম্পতিকে আটকে রাখার এ ঘটনায় উপজেলা জুড়ে চলছে নানা আলোচনা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (১৮ অক্টোবর) বিয়ানীবাজারের দিগলবাগ গ্রামের মৃত মোজাফ্ফর আলীর ছেলে হেলাল উদ্দিন তার নব বিবাহিত স্ত্রী খাদিজা বেগম, শ্বশুর, শ্বাশুড়িসহ মৌলভীবাজার থেকে ফিরছিলেন। মৌলভীবাজার থেকে বিয়ানীবাজারে যাওয়ার পথে দক্ষিণভাগ বাজারে হেলাল আহমদের আগের বিয়ের স্ত্রী শিমু বেগমের বাবা-ভাইসহ তাদেরকে আটক করে স্থানীয় দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যান। ১ম স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ না করে ২য় বিয়ে করার অভিযোগ এনে তাদের ইউপি কার্যালয়ে আটকে করা হয়। পরে হেলাল উদ্দিনের শ্বশুর-শ্বাশুড়িকে ছেড়ে দিয়ে নব-দম্পতিকে ইউপি কার্যালয়ের এক রুমে আটকে রাখা হয়। রাতে হেলাল আহমদকে ও খাদিজা বেগমকে ১ম স্ত্রীর আত্মীয় স্বজনরা শারীরিক নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ তাদের। এক পর্যায়ে খাদিজা বেগমকে আলাদা কক্ষে নিয়েও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে ইউপি চেয়ারম্যান আজির উদ্দিনের কার্যালয়ে সালিস বৈঠকে ১ম স্ত্রীর দেনমোহর ও খোরপুষের টাকা পরিশোধের পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এ রাতেও তাদের ছাড়া হয়নি। পরদিন শুক্রবার (২০ অক্টোবর) ২য় স্ত্রী খাদিজা বেগমের বাবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিকেলে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম নব-দম্পতিকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে।

নব-দম্পতি হেলাল আহমদ ও খাদিজা বেগমের সাথে শুক্রবার (২০ অক্টোবর) রাতে বড়লেখা থানায় কথা হয়। ইউনিয়ন কার্যালয়ে দু’দিন তাদের আটকে নির্যাতন করা হয়েছে এরকম অভিযোগ করেন তাঁরা। হেলাল আহমদ বলেন, ‘আমার শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি নতুন বউসহ আমাদের আত্মীয়ের বাড়ি মৌলভীবাজার থেকে আসছিলাম। আগের বউয়ের মোহরের কিছু টাকা বাকি ছিলো। তারা দক্ষিণভাগ বাজার থেকে আটক করে আমাদের সকলকে অত্যাচার করে ইউনিয়নে নিয়ে যায়। সেখানে চেয়ারম্যানসহ সবাই আমাদের বর্তমান বিয়ের কাগজপত্র দেখেন। কাগজপত্র দেখে আমাদের একরুমে রাখা হয়। পরে রাতে ইউনিয়নের লোকজন আমার স্ত্রীকে অন্যরুমে নিয়ে অত্যাচর করে। আমার স্ত্রীর সাথে (খাদিজা বেগমের) কথা বললে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্য বলেন, ‘বিচারের নামে এদের অন্যায়ভাবে আটক করা হয়। এদের কাগজপত্র দেখেছি সব ঠিক ছিলো। কিন্তু তারপরও তাদের চৌকিদার দিয়ে আটকে রাখেন চেয়ারম্যান। পরদিন দেখেছি চেয়ারম্যান এটা অযৌক্তিক কাজ করছেন। এখানে ন্যায় বিচার হবে না। এ জন্য আমি ইউনিয়নে যাই নি। আমার চেয়ারম্যানের নীতি ছাড়া কথাবার্তা। তিনি কাউকে আটক রাখতে পারেন না। তিনি এদের সাথে সাথে পুলিশে দিতে পারতেন।’

ইউপি চেয়ারম্যান আজির উদ্দিন  শনিবার (২১ অক্টোবর) বলেন, ‘১ম স্ত্রীকে তালাক ও দেনমোহর পরিশোধ না করে আরেকটি মেয়েকে অবৈধভাবে বিয়ে করায় হেলালের শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাদেরকে আটকের পর ইউনিয়ন অফিসে সোপর্দ করে। পরে বিয়ানীবাজারে তাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে আমি বিষয়টি জানাই। তাদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পুলিশে না দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। আমি তাদের অফিসে রাখতে পারি না। এটা আইনগত অবৈধ, বে-আইনি। তাই আমি পুলিশকেও বিষয়টি তাৎক্ষণিক জানাই। পরদিন উভয় পরিবার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিষয়টি সমাধান করেন। কিন্তু ছেলের পক্ষ আপোষের বিষয়টি অমান্য করে। পরে উভয় পক্ষ থানায় অভিযোগ দিয়েছে।’ 

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সহিদুর রহমান শনিবার (২১ অক্টোবর) বলেন, ‘খবর পেয়ে দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে পুলিশ পাঠিয়ে আমি তাদের উদ্ধার করাই। দেনমোহরের বিষয়টি উভয় পক্ষের আত্মীয়-স্বজনার বসে সামাজিকভাবে শেষ করছেন।’ 

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো: তোফায়েল ইসলাম  শনিবার (২১ অক্টোবর) বলেন, ‘বিনা বিচারে কাউকে ১ ঘন্টাও আটকে রাখার কোন সুযোগ নাই। সে যেই হউক। তাঁরা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন।’ 

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে বিয়ানীবাজারের দিগলবাগ গ্রামের মৃত মোজাফ্ফর আলীর ছেলে হেলাল উদ্দিন (৩০) পালিয়ে নিয়ে বড়লেখা উপজেলার দোহালিয়া গ্রামের আব্দুল কাদিরের মেয়ে শিমু বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের ২ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। পারিবারিক মনমালিন্যে ৫ মাস ধরে শিমু বেগম বাবার বাড়ীতে। এরপর হেলাল উদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার নোয়াগাও গ্রামের আজিজুর রহমানের মেয়ে খাদিজা বেগমকে বিয়ে করেন।

No comments: