মৌলভীবাজার-মনিপুরী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘মহা-রাসলীলা- আগামী ৪ নভেম্বর: প্রস্তুতি সম্পন্ন

বিশেষ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী অধ্যুষিত মাধবপুর ও আদমপুর এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে মনিপুরী সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় ‘মহা-রাসলীলা মহোৎসব। এ উৎসব দেখতে আসবেন দেশ-বিদেশের জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে লাখো দর্শনার্থী। তাইতো ধর্মীয় শুদ্ধতায় রাসোৎসবের আয়োজনকে সফল করতে উৎসবের আমেজে মনিপুরী পাড়ায় চলছে চূড়ান্ত রিহার্সেল ও আনুসাঙ্গিক প্রস্তুতি।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের আয়োজনে জোড়া মন্ডপ ও মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীর প্রাঙ্গনে ৪নভেম্বর শনিবার সকাল ১১টা থেকে গোধূলী লগ্ন পর্যন্ত গোপরাস (স্থানীয় ভাষায় রাখুয়াল) অনুষ্ঠিত হবে। এই রাস পুরুষদের। শ্রীকৃষ্ণ,সখা বলরাম ও অন্যান্য গোপবালকদের গোষ্ঠে গরু চরাতে গিয়ে সম্মুখীন নানা ঘটনার চিত্র এই রাসে রূপাযড়ত হয়। মণিপুরী শাস্ত্রীয় নৃত্যের বৈষ্ণব ভক্তিভাবাপন্ন নরম কোমল ভাবের বিপরীতে এখানে তান্ডব ধারার নৃত্যই প্রধান। অজা বা গুরু বসেন মৃদঙ্গ নিয়ে।

আর মানকসাপি বা যশোদা ও রোহিনী-রূপী নারীদ্বয় মন্ডলীর এককোনে বসে গান ও অভিনয় কর্ম সম্পন্ন করেন। ১২টি কলাগাছ দিয়ে বেষ্টিত তিনটি পৃথক মঞ্চে শতাধিক তরুন ঐতিহ্যবাহী পোষাকে সজ্জিত হয়ে গোপরাস বা গোষ্ঠলীলায় অংশ নেয়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত লোক ঐতিহ্যমুলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই সময় দর্শকরা ঘুরে দেখতে পারেন রাস মেলা।

রাস উৎসব প্রাঙ্গনেই বসে বিরাট এই গ্রাম্য মেলা।মেলায় অন্যান্য স্টলের পাশাপাশি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার বইপত্রও পত্রপত্রিকার অনেকগুলো স্টল থাকবে। মণিপুরী ভাষার অডিও ভিডিও গানের ক্যাসেট বা সিডির দোকানও থাকবে। তাছাড়া রাসমেলায় মণিপুরী হস্তচালিত তাঁতের কাপড়ের প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হবে।(২) এরপর রাত সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০পর্যন্ত মণিপুরী নটপালা কীর্তন।

রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত চলবে শ্রীশ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলানুসরণ। বাঁশ ও কাগজ কেটে বিশেষ কারুকাজে রাসের মন্ডলী তৈরী করা হয়। মন্ডলীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বসে রাসধারী বা রাসের গুরু,সূত্রধারীগণ এবং বাদকগণ।
 
পাশাপাশি তিনটি মন্ডপে আনুমানিক প্রায় ৩/৪শতাধিক কিংবা ততোধিক সংখ্যক তরুণী এ রাসলীলায় অংশ নিয়ে থাকে। রাসের সাধারণ ক্রম হচ্ছে- সূত্রধারী কর্তৃক রাগালাপ ও বন্দনা,বৃন্দার কৃষ্ণ আবাহন,কৃষ্ণ অভিসার,রাধা ও সখীদের অভিসার,রাধা ও কৃষ্ণের সাক্ষাৎ ও মান-অভিমান, ভঙ্গীপারেং, রাধার কৃষ্ণ-সমর্পন,যুগলরূপ প্রার্থনা,আরতি ইত্যাদি।

আগামী ৪নভেম্বর কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর জোড়ামন্ডপ ও আদমপুর সানাঠাকুর মন্ডব হয়ে উঠবে লাখো মানুষের মিলনমেলা। বছর ঘুরে আসছে বাংলাদেশের মণিপুরী সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উৎসব মণিপুরী মহা রাসলীলা। রাসোৎসব সিলেট বিভাগের অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম লোক-নৃতাত্ত্বিক উৎসব। বিশেষ করে মাধবপুর জোড়া মন্ডপ সংলগ্ন তিনটি মন্দিরে বড়ো পরিসরে অয়োজন হয়। 
 
বিভিন্ন বয়সের প্রায় জ্জ শতাধিক শিল্পী কৃষœ,রাধা,রাখাল,গোপী ভূমিকায় নৃত্যে অংশ গ্রহণ করেন। সাদা কাগজ দিয়ে কারুকার্যময় নকশায় সাজানো মন্ডপগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে জড়ো হওয়া মণিপুরী নৃত্যশিল্পীদের সুনিপুণ নৃত্যগীতি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে দর্শনার্থীদের। মণিপুরী ঐতিহ্যবাহী স্বতন্ত্র মুদ্রার তালে তালে দুলছে অঙ্গ ও কিশোরীদের হাত। এযেনো রাঁধাকৃষ্ণের যুগলবন্দি।

বিপুল আনন্দ উদ্দীপনার এই দিনটির জন্য শুধু মণিপুরীরাই নয়, স্থানীয় বাঙালীসহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের লোকজন বছরব্যাপী প্রতীক্ষায় থাকে। শিল্পী নারী/পুরুষ কয়েকজন/প্রশিক্ষকরা জানান, শুধু সনাতন মনিপুরী সম্প্রদায় নয়; প্রতিবছর বর্নিল এ উৎসবে শামিল হন দেশ বিদেশের লাখো দর্শক-অনুরাগী।

রাসনৃত্যেও পাশাপাশি থাকে গুনীজন সংবর্ধনা,অলোচনা অনুষ্ঠানসহ অরোও অনেক অয়োজন। অনুসাঙ্গিক প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। উৎসবপাড়া দেখা গেলো সেরকম চিত্র। আয়োজক কমিঠি জানান,রাস শব্দটি রস শব্দের বিবর্তিত রূপ বলে অনুমান করা হয়। মণিপুরীদের প্রথম রাসলীলা বা রাসলীলানুসরণ অনুষ্ঠান হয় মণিপুরীদের আদিভূমি মণিপুরে ১৭৬৯খৃস্টাব্দে রাজা ভাগ্যচন্দ্র সিংহের আয়োজনে।

ভারত ও যে রাসলীলা কেন্দ্রিক রাস উৎসব হয়ে আসছে তার প্রচারক হচ্ছেন প্রখ্যাত এই মণিপুরী রাজা। মৈথিলী ও ব্রজবুলি ভাষার বিভিন্ন পদের মণিপুরী সঙ্গীতের নিজস্ব গায়কী ও মুদ্রা-পদবিক্ষেপে জটিল এবং ধ্রুপদী ধারার এই গীতিনৃত্যধারা মণিপুরীদেরকে ভারতীয় উপ-মহাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্যকলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান করে দিয়েছে।

জাতী- ধর্ম-সংস্কৃতি আর অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠেছে মনিপুরী সম্প্রদায়ের এই মহা- রাসোৎসব। আয়োজক-কলাকুশলী,প্রশাসন,দর্শক-সকলের সহযোগিতায় একটি সফল সার্বজনীন মহোৎসব উৎযাপনের অপেক্ষায় মনিপুরী জনপদের সর্বস্থরের মানুষ।

No comments: