হাকালুকি ও কাওয়াদীঘিতে দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় ‘কচুরিপানার’ রাজত্ব

মু. ইমাদ উদ দীন: দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় হাওর জুড়ে এখন কচুরিপানার রাজত্ব। আউশ, আমন, বোরো আর সবজি ক্ষেতের মাঠ এখন কচুরিপানার দখলে। হঠাৎ কচুরিপানার এমন অযাচিত রাজত্ব দূর্ভোগের নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখছেন হাওর তীরের বাসিন্দারা। এখন কচুরিপানার কারনে নৌকা চলাচলে তাদের অনেকটা ব্যঘাত ঘটছে। কারন বানের পানিতে সড়ক পথ তলিয়ে যাওয়ায় এখন চলাচলের একমাত্র সম্বল ছোট বড় নৌকা। জানাগেল এবছর কয়েক দফা বন্যায় দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। এখনো জেলার হাওর এলাকার সর্বত্রই থৈ থৈ পানি। ঘর বাড়ি আর ক্ষেত কৃষি সবই বানের পানিতে একাকার। দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি আর কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দূর্ভোগের অন্তনেই। প্রায় ৭মাস থেকে পানিবন্ধী অবস্থায় কাটছে তাদের রাত দিন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন আগে অনেক বন্যা হয়েছে কিন্তু বন্যা এরকম স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রুপ নেয়নি। এবছর চৈত্র মাস থেকে অতিবৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ী ঢলে কয়েক দফা বন্যায় ক্ষেত কৃষি হারিয়ে তারা সর্বস্বান্ত। এবছর কিছুতেই যেন বন্যার পানি কমতেই চায় না। আর একারনেই দিন দিন বেড়েই চলেছে তাদের দূর্ভোগ আর অসহায়ত্ব। কাউয়াদিঘি হাওর পাড়ের কৃষি ও মৎস্যজীবী লোকজন জানালেন এসময় আমন (কাতারি) ধানের ক্ষেত দেখে মন জুড়াত। ধান ক্ষেতের খালি অংশে মাছ শিকার করা যেত। কিন্তু এবছর ভিন্ন দৃশ্য। আমনসহ অনান্য ক্ষেতের জমিতে এখন শুধু কচুরিপানা আর কচুরিপানা। 

সরজমিনে হাকালুকি ও কাউয়াদিঘি হাওরের তীরবর্তী এলাকা গুলোতে দেখা গেল দীর্ঘ দিন থেকে পানিতে তলিয়ে থাকা কৃষিজমিতে কচুরিপানার একক রাজত্ব। আর হাওরের বিল তীরবর্তী এলাকায় অধিকাংশ জমিতে শাপলা,শালুকসহ নানা জাতের জলজ ঘাস। তবে হাকালুকি হাওরে কম হলেও কাউয়াদিঘি হাওরে কচুরিপানা আর ঘাসের এমন একক আধিপত্য। এমন কচুরিপানা আর জল ঘাস গো খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারন এবছর বন্যায় গরু মহিষের খাদ্য ও বাসস্থান চরম সংকটে পড়েছে। এমন দূর্দিনে কচুরিপানা ও জল ঘাস গো-মহিষের খাদ্য সহায়ক হয়েছে। দীর্ঘ জলবদ্ধতায় কচুরিপানার এমন দখলদারিত্বের কারন হিসেবে স্থানীয় দূর্ভোগগ্রস্তরা জানালেন সংস্কার হীনতায় নাব্যতা হ্রাসে হাওর গুলোর এমন দূরাবস্থা। বর্ষায় বন্যায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা আর শুস্ক মৌসুমে হাওর জুড়ে ধূ ধূ মরুভূমি। দীর্ঘদিন থেকে এমন দৃশ্য চলমান থাকায় অস্থিত্ব সংকটে পড়ে স্থানীয় হাওর গুলো এখন একেবারেই ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। ক্ষতিগ্রস্থ হাওর পাড়ের বাসিন্দাদের দাবী মৃত্যু পথ যাত্রী হাওর গুলো বাচাঁতে দ্রুত উদ্যোগী হওয়ার।

কাউয়াদিঘি হাওর তীরবর্তী একাটুনা,আখাইলকুড়া,ফতেহপুর,পাঁচগাঁও ইউনিয়নে পানিবন্ধী কয়েকটি গ্রামে নৌকাযোগে গেলে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। কথা হয়,বানেশ্রী, পড়াশিমুল,জগৎপুর,অন্তহরী,উলুয়াইল, ভোড়িকোনা, বিরাইমাবাদ, জুম্মাপুর, খৈশাউড়া, রসুলপুর, আব্দুল্লাহপুর, করমউল্লাহপুর, চাঁদনীঘাট বাঁধ এলাকা, মমরেজপুর, মিরপুর ও পাগুলিয়াসহ কয়েকটি গ্রামের বানভাসি মানুষের সাথে তারা জানালেন এবারের বন্যায় তাদের সব কেড়ে নিয়ে চরম দূর্দশায় ফেলেছে। তবে তাদের এমন দূর্ভোগের জন্য স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তার দূনীর্তির কারনে মনু প্রকল্পের আওতাধীন কাশিমপুর পাম্প হাউজের অর্কাযকারিতার বিষয়টিকে দায়ী করছেন। তারা ক্ষোভের সাথে জানালেন সময়মত কাশিমপুরের পাম্প হাউজটি সচল হলে আমরা এভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হতাম না। তবে হাওর এলাকার বাসিন্দারা জানান এবছর দীর্ঘ জলাবদ্ধতা আর বানের পানি আমাদের প্রচুর পরিমানে কচুরিপানা আর জল ঘাস উপহার দিয়েছে।

 এটা মন্দ নয়। হাওর জুড়ে কচুরিপানার রাজত্ব থাকায় নৌকা চলাচলে কষ্ঠের অন্ত নেই। এছাড়া বানের পানি নামলে তা ক্ষেতের জমি থেকে অপসারণ বা একত্রিত করতে আমাদের জন্য কষ্টকর হবে। তারপরও জমির উর্বরতা বাড়াতে এই কচুরিপানা গুলো আমাদের জন্য অনেক উপকারে আসবে। যা অনেকটা জৈব সারের ভূমিকা রাখবে। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ সুত্রে জানায় জলাবদ্বতা দূর হলে তারা কচুরিপানাকে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করতে কৃষকদের উদ্ভুদ্ধ করবেন। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তরা বলেন কচুরিপানা মূল্যবান সম্পদ। কচুরিপানা সংগ্রহ করে জৈব সার তৈরি, মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার, ফলগাছের গোড়ায় মাল্্চ হিসেবে ব্যবহার করে মাটির ক্ষয়রোধ করে মাটিতে জৈব সার সংযুক্ত করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। জানা গেল কচুরিপানা মুক্তভাবে ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। এটা মাদুরের মতো পানির ওপরে বিছিয়ে থাকে। ধারণা করা হয় ১৮ শতকের শেষ ভাগে ব্রাজিলের এক পর্যটক কচুরিপানা ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এটিকে বাংলায় নিয়ে আসেন। কচুরিপানার উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল (আমাজন),এর ৭টি প্রজাতি রয়েছে। গ্রীষ্মলীয় এলাকায় এটি খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে, এমনকি ৬ দিনেরও কম সময়ে সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য কচুরিপানার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শাখা ও লতানো কান্ড এবং বীজের মাধ্যমে এর বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা পাখির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। অক্টোবরের প্রথমেই গাছে ফুল আসা শুরু হয় এবং সম্পূর্ণ গ্রীষ্মকাল চলতে থাকে। ফুল ফোটার ১-২ দিন পর শুকিয়ে যায়। সব ফুল শুকিয়ে যাওয়ার ১৮ দিন পর বীজগুলো বিমুক্ত হয়। গ্রীষ্মকাল অঙ্গজ বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে। ৫০ দিনের মধ্যে প্রতিটি ফুল থেকে প্রায় ১ হাজার নতুন কচুরিপানার জন্ম হয়। একটি গাছ থেকে ৫ হাজারের অধিক বীজ উৎপন্ন হয়,এ বীজ ৩০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কচুরিপানা যে কোনো পরিবেশেই জন্মাতে পারে, এমনকি বিষাক্ত পানিতেও এরা জন্মায়। কচুরিপানা অতিমাত্রার দূষণ ও বিষাক্ততা সহ্য করতে পারে। মার্কারি ও লেডের মতো বিষাক্ত পদার্থ এরা শিকড়ের মাধ্যমে পানি থেকে শুষে নেয়। তাই পানির বিষাক্ততা ও দূষণ কমাতে কচুরিপানার অত্যন্ত উপকারী। পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে কচুরিপানা মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্য ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য এটি চমৎকার একটি উৎস। ক্ষেত্রবিশেষে কচুরিপানা থেকে গোবরের চেয়েও বেশি বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যায়। পূর্ব এশিয়ায় শুকনো কচুরিপানা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর ছাই কৃষকরা সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করে। সবুজ কচুরিপানা জৈব সার হিসেবেও জমিতে ব্যবহার করা যায় (সরাসরি অথবা মালচ্ হিসেবে)। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কচুরিপানা থেকে কাগজ ও আসবাবপত্রও তৈরি করা যায়। কচুরিপানা কেঁচো উৎপাদন বৃদ্ধিতেও সহায়ক। কচুরিপানার বৃদ্ধি এতটাই তাৎক্ষণিক যে, কোনো জলাশয়ের ওপর কার্পেটের মতো স্তর তৈরি করা মাত্র এক দিনের ব্যাপার। হেক্টর প্রতি প্রতিদিন এদের বৃদ্ধি প্রায় ১৭ টনের ওপরে এবং ১ সপ্তাহের মধ্যেই এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কচুরিপানায় খুব দ্রুত ও প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটে। তাই কচুরিপানা এখন কৃষির এক মহাসম্পদ। সম্প্রতি ভার্মিকম্পোস্ট (কেচোঁ সার) তৈরিতে কচুরিপানা একটি উত্তম উপকরণ হিসেবে নানা দেশে প্রমাণিত হয়েছে। কচুরিপানা থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করে জমির উর্বরতা এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য পাওয়া গেছে। ১৮০ টন কাঁচা কচুরিপানা থেকে প্রায় ৬০ টন জৈব সার উপাদন হতে পারে। আমাদের দেশে দিন দিন গোবরের প্রাপ্যতা কমে আসছে, কারণ এখন আর কৃষকের গোয়ালে গরু নেই, আছে পাওয়ার টিলার। কচুরিপানা প্রাকৃতিকভাবে পানি থেকে বেশ ভালোভাবেই নাইট্রোজেন ফসফরাস ও পটাসিয়াম পুষ্টি উপাদান পরিশোষণ করতে পারে। ফলে কচুরিপানা পচিয়ে জৈব সার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করলে এসব উপাদান মাটিকে সমৃদ্ধ করে তোলে।

No comments: