হাজার সালাম শিল্পী আবদুল জব্বার

সাইফুল ইসলাম সুমন: আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়’-এর মতো দৃপ্ত শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে নিজের কণ্ঠের জাদুতে মোহিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল জোগাতেন যিনি, সেই শিল্পী আবদুল জব্বারের জীবনাবসান হলো। মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি শব্দসৈনিক তিনি। যাঁর শব্দের স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে দেশপ্রেম হৃদয়ে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলেন হাজার যুবক। হাজার সালাম মহান শিল্পী আবদুল জব্বার।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা ঘোষণার কালে মুক্তিকামী মানুষকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করতে গানকে হাতিয়ার করেছিলেন আবদুল জব্বার। তারপর গান তাঁকে দিয়েছে অমরত্বের মর্যাদা। বঙ্গবন্ধুকে তিনি ডাকতেন ‘বাবা’, আর জব্বারকে শেখ মুজিব সম্বোধন করতেন ‘পাগলা’ বলে। মানুষের অধিকার আদায়ের গান গাইতে গাইতেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আগরতলা মামালার আসামিও হতে হয়েছিল তাঁকে।  এমন একজন শিল্পীর কণ্ঠেই মানায়, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’, ‘মুজিব বাইয়া যাও রে, অকূল দরিয়ায়’, ‘সাত কোটি মানুষের একটাই নাম, মুজিবর’, অথবা ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’!

বঙ্গবন্ধুকে বুকে ধারণ করেই পাকিস্তানকে হটিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করা শিখেছিলেন আবদুল জব্বার। একাত্তরে যুদ্ধের সময় তিনি ভারতীয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেন। কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করেন। আর সেই সময় গান গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাপুরুষ আবদুল জব্বার।

মনটাকে বেঁধে নিয়ে বাংলাদেশের পিচঢালা পথকে ভালোবেসেছিলেন তিনি। দুঃখের দহনে করুণ রোদনে জীবনের পরাজয়টাকেও মানতে শিখিয়েছিলেন। দয়িতার জন্য কতটা আবেগ জমিয়ে রাখতে হয় তা দেখিয়েছিলেন, ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ গানটি গেয়ে। ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও’ গেয়ে বন্ধুর যন্ত্রণার ভাগিদার হতে চাওয়া আবদুল জব্বারের কণ্ঠেই মানায়।

গণমানুষের প্রিয় এমন একজন শিল্পী শেষ জীবনে রোগশোকে ভোগে কিছুটা বিপর্যস্ত জীবনযাপন করেছেন। তিনি তাঁর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সবার কাছে একটাকা চেয়েছেন এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় বেশ বিব্রতও হতে হয়েছে তাঁকে। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পদক ও  স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া একজন শিল্পীকে কেন অর্থকষ্টে ভোগে জীবনের শেষ বেলা পার করতে হবে তা ভেবে দেখতে পারে আমাদের নীতিনির্ধারকরা।

আবদুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তাঁর গান গাওয়া শুরু। তিনি ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এর গানে কণ্ঠ দেন।

গত বুধবার (৩০ আগস্ট) সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

শিল্পী আবদুল জব্বার জীবনে শ্রেষ্ঠ গানটি গেয়েছিলেন ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে’ শিরোনামে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আবদুল জব্বারকে ডেকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে একটি গান গাইতে বলেছিলেন। ফজল-এ-খোদা রচিত গানটি বঙ্গবন্ধুকে গেয়ে শোনালে তিনি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তুই কি চাস বল?’ মন্ত্রিত্ব বা বেতারের বড় চেয়ার সেধেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আবদুল জব্বার বৈষয়িক কিছুতে রাজি না হয়ে জানিয়েছিলেন, আমার এখনো অনেক গান গাইতে বাকি, আমি সারা জীবন গানই গাইতে চাই। বঙ্গবন্ধু শিল্পী আবদুল জব্বারের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘ওরে পাগলা, তুই গানই গা সারা জীবন।’

প্রিয় শিল্পী আবদুল জব্বার সত্যিকার অর্থেই ভরাট কণ্ঠে দরদিয়া সুরে আপনি গান গেয়ে চলেছেন। আমরা বাতাসে কান পাতলেই আপনাকে অমীয় সুর শুনতে পাই। মানুষের মুখে মুখে ফিরবে শত-সহস্র বছরজুড়ে। আপনার কণ্ঠের মাধুর্য আর শব্দের অবিনাশী আবেগ ছুঁয়ে থাকবে বাংলাদেশকে, দেশের মানুষকে। গভীর শ্রদ্ধা শিল্পী আবদুল জব্বার।

No comments: