দ্বিজেন শর্মা আর নেই

জুড়ী টাইমস সংবাদ:  প্রাণ ও প্রকৃতির মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন ‘নিসর্গসখা’ লেখক দ্বিজেন শর্মা। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোর পৌনে ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

দ্বিজেন শর্মার পরিবারের বরাত দিয়ে লেখক মোকাররম হোসেন বলেন, “হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস চলছিল তার। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ছাড়াও ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন তিনি।” গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্বিজেন শর্মাকে গত বৃহস্পতিবার বারডেম হাসপাতাল থেকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় শুরু হয় ডায়ালাইসিস।

এর আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে গত অগাস্টেও দ্বিজেন শর্মাকে বারডেমে ভর্তি হতে হয়েছিল। ফুসফুসের সংক্রমণের ধাক্কা সামলে উঠতে পারলেও কিডনির জটিলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। মোকাররম হোসেন জানান, দ্বিজেন শর্মার মেয়ে শ্রেয়সী শর্মা লন্ডনে আছেন। তিনি দেশে ফিরলেই শেষকৃত্য হবে।

১৯২৯ সালের ২৯ মে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় দ্বিজেন শর্মার জন্ম। বাবা কবিরাজ ছিলেন বলে ছোটবেলা থেকেই লতা-পাতা, বৃক্ষ আর অরণ্য-প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। জীবিকার তাড়না জীবনকে যেখানেই নিয়ে যাক, দ্বিজেন শর্মা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন প্রাণ ও প্রকৃতির রূপের সন্ধানে। উদ্ভিদ জগৎ, প্রকৃতি বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান ভাবনা নিয়ে লিখে গেছেন প্রায় দেড় ডজন বই। দ্বিজেন শর্মা রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন, তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ার জন্য আজীবন প্রচার চালিয়ে গেছেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “আমি একদিন থাকব না, কিন্তু গাছগুলো থাকবে। মানুষকে অক্সিজেন বিলাবে। জীবনে এর চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই।”

উদ্ভিদ ও প্রকৃতি নিয়ে তার লেখা ‘শ্যামলী নিসর্গ’কে বিবেচনা করা হয় আকরগ্রন্থ হিসেবে। তার বইয়ে গাছ, ফুল বা ফলের বর্ণনায় ফিরে ফিরে এসেছে ময়মনসিংহ গীতিকা, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, সিলেটের লোকগীতি কিংবা মধ্যযুগের কাব্যগাথা। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে করিমগঞ্জ কলেজ, বি এম কলেজ ও নটর ডেম কলেজে চাকরি করেন। পরে প্রগতি প্রকাশনে চাকরি নিয়ে মস্কো চলে যান, সেখানে কাটে প্রায় কুড়ি বছর। দেশে ফিরে কাজ করেন বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে। তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ‘সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস’, ‘ফুলগুলি যেন কথা’, ‘গাছের কথা ফুলের কথা’, ‘এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি’, ‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’, ‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’, ‘জীবনের শেষ নেই’, ‘বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ’, ‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’, ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা’, ‘গহন কোন বনের ধারে’, ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার’, ‘বাংলার বৃক্ষ’।

বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে পরোক্ষ সংযোগের কারণে কিছুকাল আত্মগোপন, এমনকি কারাবাসও করতে হয়েছে দ্বিজেন শর্মাকে। লেখালেখির জন্য ভূষিত হয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননায়। তার স্ত্রী দেবী শর্মা ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের সাবেক শিক্ষক। সুমিত্র শর্মা ও শ্রেয়সী শর্মা তাদের দুই ছেলেমেয়ে।

No comments: