রসগোল্লার আক্রমণে প্রাণ গেল বনবাসীর

বিশেষ প্রতিনিধি: পোষা পুরুষ হাতি ‘রসগোল্লা’। সঙ্গিনীর নেশায় কয়েক দিন ধরে সে উন্মত্ত (স্থানীয় ভাষায় ‘মোস্ত’) হয়ে ওঠে। বনবাদাড়ে খোঁজ পাচ্ছিল না সঙ্গিনীর। একপর্যায়ে লোকালয়ে নেমে সে আক্রমণ চালায় পথচারী এক বনবাসীর (ফরেস্ট ভিলেজার) ওপর। আর তাতে প্রাণ হারান ওই বনবাসী। ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার রাতে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের পুটিছড়া এলাকায়। নিহত বনবাসী হলেন মঙ্গল খাড়িয়া (৪৫)। পুটিছড়া বন এলাকায় তাঁর বাড়ি।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রসগোল্লার মালিক উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঈন উদ্দিন মইজন। রসগোল্লাসহ আরও কয়েকটি পোষা হাতি জুড়ী রেঞ্জের আওতাধীন পুটিছড়া ও আশপাশের বনে বিচরণ করে। হাতির মালিক গাছ টানার কাজে একে ব্যবহার করেন। জুড়ী বা মৌলভীবাজারে এ কাজে বেশ কয়েকটি হাতি ব্যবহার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মঙ্গল ও একই এলাকার কৃষ্ণ চাষা (৪০) স্থানীয় এলাপুর বাজার থেকে খরচপাতি কিনে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। পুটিছড়া এলাকায় পৌঁছালে পেছন দিক থেকে ছুটে আসা রসগোল্লা তাঁদের ধাওয়া করে। এ সময় মঙ্গল পা পিছলে কাঁচা রাস্তায় পড়ে গেলে রসগোল্লা তাঁকে পা দিয়ে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। কৃষ্ণ আত্মরক্ষার্থে দৌড়ে গিয়ে জমির নিচু স্থানে লুকিয়ে পড়েন। পরে রসগোল্লা পুটিছড়া বনের ভেতরে গুটিবাড়ী এলাকার দিকে চলে যায়। এদিকে মঙ্গলের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হাতির মালিকপক্ষ, পুলিশ ও বন বিভাগের লোকজন সোমবার সকালে ঘটনাস্থলে যান। পরে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় হাতির মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণ হিসেবে মঙ্গলের পরিবারকে এক লাখ টাকা দিতে সম্মত হয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য নূর উদ্দিন বলেন, রোববার রাতে দুর্ঘটনার পর এলাকার লোকজন রসগোল্লার আক্রমণের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটান। হাতিটি যেকোনো সময় লোকালয়ে নেমে আবারও কোনো দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

হাতিটির মালিক মঈন উদ্দিনের ছেলে কাঠ ব্যবসায়ী মামুনুর রশীদ বলেন, মোস্ত হয়ে গেলে পুরুষ হাতিরা অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। রসগোল্লাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে মাহুত (হাতি দেখাশোনায় নিয়োজিত ব্যক্তি) চেষ্টা চালাচ্ছেন।

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান মো. জাকারিয়া বলেন, ‘প্রবল জৈবিক তাড়না সৃষ্টি হলে হাতির চোখের কোণে পানি জমে। এটা যারা হাতি পোষে, তারা ভালো জানে। প্রায় এক মাস এ অবস্থা থাকতে পারে। এ সময় হাতির মালিকের উচিত হাতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবস্থা নেওয়ার।’ তিনি বলেন, হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার জন্য মালিকই দায়ী।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজারের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দো বলেন, জৈবিক তাড়নার এ সময়টায় হাতির হুঁশ থাকে না। হাতি যারা পোষে বা মাহুতদের বিষয়টি খেয়াল করা দরকার। এ সময় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিলে প্রাণ রক্ষা করা যেত।

তবে হাতির আক্রমণে একটি জীবন গেলেও এ ঘটনায় মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জুড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধীন চন্দ্র দাস বলেন, নিহত মঙ্গলের পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিনা ময়নাতদন্তে তাঁর লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

গোয়ালবাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন আহমদ লেমন বলেন, ‘মঙ্গলের দুই স্ত্রী ও সাতজন সন্তান। পরিবারটি খুবই গরিব। মামলা চালানোর মতো আর্থিক অবস্থা না থাকায় পরিবারের সদস্যদের সম্মতিতে আমরা আপসে বিষয়টির সমাধান করে ফেলেছি।’

No comments: