ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ--২

                  ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ--২
                  লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

ফিলিপ গাইন -এর পাশে নিজেকে খুব বেমানান মনে হচ্ছিল। তার পাণ্ডিত্য, ব্যক্তিত্ব, বন ও বনবাসী সম্পর্কে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের বিশালতার কাছে অামি তো পিপিলিকা মাত্র। তৎসত্বেও সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে প্রথমে অামি অামার নিজের পরিচয় দিলাম। তারপর শুরু করলাম মধুপুর বনের ইতিহাস। ফিলিপ গাইন অামাকে অাচমকা থামিয়ে দিয়ে বললেন -ইতিহাস বলতে হবে না। অাপনি শুধু অাদিবাসীদের সম্পর্কে বলেন। অপ্রত্যাশিত বাধা পেয়ে অামি একটু অপ্রস্তুত হলাম। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম -বন ও বনভূমি বাদ দিয়ে শুধু ' বনের অাদিবাসীদের নিয়ে কেন? তিনি একরাশ বিরক্তি নিয়ে অামার মুখের দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল অামার প্রশ্ন তার ভাল লাগে নি। তিনি বিরক্তি মাখা কণ্ঠে বললেন - মধুপুর বনের ইতিহাস ওরা জানে, অাপনি শুধু অাদি কাল থেকে যে সকল জনগোষ্ঠী তাদের অাদিম সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করে অাসছে তাদের সম্পর্কে বলুন। অামি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় অনেকগুলো তথ্য হয়তো এড়িয়ে যেতে পারতাম। যা মধুপুর বন সম্পর্কে জানা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া চৌকশ ছেলেমেয়েদের কাছে প্রকাশ পেলে লজ্জায় পড়ে যেতাম। তিনি সেই লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন বলে কৃতজ্ঞতায় অাপনা থেকেই মাথা নুইয়ে এলো। অামি বিনয়ে বিগলিত হয়ে বলতে শুরু করলাম -এই মধুপুর বনে বাঙালি, গারো ও কোচ জনগোষ্ঠী প্রায় একশত বছর পূর্ব থেকে মিলেমিশে একত্রে বসবাস করে অাসছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক থেকে প্রথম হচ্ছে বাঙালি তারপর গারো সবশেষে কোচ জনগোষ্ঠী। তিনি এবারো অামায় থামিয়ে দিলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়তায় ভদ্রভাবে কণ্ঠে যতটা উষ্মা ধারণ করা যায় ততটুকু ঢেলে দিয়ে বললেন - অাহ্, অামি অাপনাকে সেই অাদিকাল থেকে অর্থাৎ সেই প্রথম থেকে যারা এই বনে বসবাস করে অাসছে তাদের সম্পর্কে বলতে বলেছি । অাপনি এ ভাবে সব জট পাকিয়ে ফেলছেন কেন? অামি বিব্রত কণ্ঠে বললাম -অামি তো তাই বলছি। অাপনি বাধা দিচ্ছেন কেন? তিনি ক্ষুব্দ কণ্ঠে বললেন -অারে ভাই, অাপনি তো মনগড়াভাবে ভুল তথ্য উপস্থাপন করছেন ? অাপনার যদি জানা না থাকে তাহলে তো অামার সাহায্য চাইতে পারেন! তার কণ্ঠের এই অাকস্মিক অাক্রমনাত্মক পরিবর্তন অামাকে অাহত করে। উপস্থিত সবাই অামার সেই দূর্ভোগ উপভোগ করছে দেখে ভিতরে ভিতরে ভীষণ কষ্ট পেতে থাকি । এ রকম প্রতিকুলতায় খাবি খেতে কার অার ভাল লাগে? কিন্তু অামি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, ঠিক কিভাবে উপস্থাপন করলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন। এবার অামার ধৈর্যের বাধে চির ধরতে থাকে। তারপরও বিনয়ের সাথে বললাম - অামি জানি অাপনার গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সাথে অামার অভিজ্ঞতার বিস্তর ফাঁরাক। অাপনি প্রায় এক দশক ধরে এই মধুপুরের বন ও বনের মানুষদের নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে অাসছেন। অাপনার সেই গবেষণা লব্ধ জ্ঞানের সাথে অামার জানা বিষয়বস্তুর মিল না থাকারই কথা। সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানের উপর শ্রদ্ধা রেখেই জানতে চাইছি -অাপনার দৃষ্টিতে সেই অাদি কাল মূলত কোন কাল? তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বললেন - স্মরণাতীত কাল। অামি বিনয়ে বিগলিত হয়ে বললাম - অর্থাৎ যে কাল কেউ স্মরণ করতে পারে না অাপনি কি সেই কালকে বুঝাতে চাইছেন যাকে বিজ্ঞজনেরা প্রাগৈতিহাসিক কাল বলে থাকেন? তিনি বললেন - না না প্রাগৈতিহাসিক কাল নয়। -তাহলে শতক হিশেবে বলুন যেমন একশ বছর, দুইশ বছর, তিনশ বছর, না কি তারচেয়ে বেশী সময় ? অনির্দিষ্ট ভাবে বললে তো বুঝতে পারবো না। অামার অজ্ঞতার ভদ্র প্রকাশ দেখে তিনি বোধহয় স্বস্তি পেলেন। তার অনিন্দ সুন্দর মুখে ছড়িয়ে পড়লো ক্ষমাসুন্দর হাসি। অামি লক্ষ্য করলাম, তার সেই হাসির প্রভাব পড়েছে তার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে! হাসির সমর্থনে হাসি! যার অর্থ হতে পারে -দেখেছ তোমরা ! অাগেই বলেছিলাম , বন বিভাগের লোকজন মূলত: লুটপাট ছাড়া অার কিছু বুঝে না। তারা বসে বসে শুধু দিন অার অর্থ গুণে। লেখাপড়ার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। এবার হাতেনাতে প্রমাণ পেলেতো! শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই চতুর দৃষ্টি বিনিময় ভিতরে ভিতরে অামাকে অসহিষ্ণু করে তুলতে থাকে। তিনি অদৃশ্য সাফল্যের গর্বে গর্বিত ভঙ্গীতে বললেন - অাদি কাল বলতে ধরেন দুই তিন শ বছর। অামি এবার ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বললাম -অাপনাদের কি মনে হয় এই দু-তিন'শ বছর স্মরণাতীত কাল? শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্তর এলো -এটা কথার কথা। কথা না বাড়িয়ে ফিলিপ গাইনকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম - -তাহলে সেই অাদিকালে মধুপুর বনে কোন জনগোষ্ঠী প্রথম বসতি গড়ে তুলেছিল বলে অাপনি প্রমাণ পেয়েছেন? যাদের অাপনি অাদিবাসী বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন! উত্তরের অাশায় অামি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বললেন -কেন গারো অার কোচ সম্প্রদায়। টেলকি, গায়রা, সাধুপাড়া, এলাকায় এই যে হাজার হাজার গারো সেই অাদিকাল থেকে তাদের অাদিম সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করে অাসছে তারা। অামি নির্দিষ্টভাবে সেই গারোদের কথা বলতে বলেছি। এবার অামি থতমত খেয়ে গেলাম। বন নয়, বন্যপ্রাণি নয়, বনের গাছ গাছালির ফাঁকেফাঁকে জন্মানো ভেষজ উদ্ভিদের কথা নয়, বনে জন্মানো ঐতিহ্যগত প্রাকৃতিক খাবার, যে খাবার দিন দিন নি:শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি সভা সেমিনার উত্তপ্ত করে তোলেন তার কথা নয়, তিনি বলতে বলছেন শুধু সেই গারোদের কথা। যারা কি না তার দৃষ্টিতে অাদিম সংস্কৃতির ধারক এই মধুপুর বনের অাদিম বসতি ? এবার তার শিক্ষাসফরের উদ্দেশ্য অামার কাছে পরিষ্কার হতে থাকে। অামি বুঝতে পারি , তিনি তার শিক্ষার্থীদের এবার কিছু শিখাতে অানেন নি বরং দেখাতে এনেছেন। এবং সেই দেখানোর মাধ্যমে তিনি এই সকল কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কে বন বিভাগ সম্পর্কে এমন কিছু বৈরি মিথ্যা ধারণা ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন যা তারা অামৃত্যু বয়ে বেড়াবে চরম সত্য বলে। এবার তিনি প্রশ্ন করেন - অাপনার মধুপুর জাতীয় উদ্যানে চাকুরীর বয়স কত? অামি অস্ফুট স্বরে বললাম-প্রায় পাঁচ বছর। উত্তরটা শুনেই তার চোখ চকমকিয়ে ওঠে। তিনি অনেকটা শ্লেষপূর্ণ কণ্ঠে বলতে থাকেন - কি অাশ্চর্য এতদিন যাবৎ মধুপুর বনে চাকরি করছেন অার এই সত্যটা অাজ অবধি অাপনি জানতেই পারেন নি! না কি জানেন তারপরও না জানার ভান করছেন? না কি অাপনি অাপনার পূর্বসূরিদের মত বলতে চান গারো জনগোষ্ঠী মধুপুর বনের অাদিবাসী নন! ফিলিপ গাইনের অাক্রমনাত্মক কথা অামাকে প্রচণ্ড অাঘাত করে। স্বভাব অনুযায়ী এসব ক্ষেত্রে অামার ফুঁসে উঠবার কথা কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে অজ্ঞতার লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে বললাম - ছি: ছি: এ সব অাপনি কি বলছেন? তাছাড়া অামার মনে করায় কি অাসে যায়। ইতিহাস যা বলে তাইতো হবে। এখানে অামার বা অাপনার বলায় তো কিছু যায় অাসে না। অামি ভিতরে ভিতরে শক্ত হতে থাকি। এবার ফিলিপ গাইনের চোখের উপর চোখ রেখে জিজ্ঞেস করি -অনুগ্রহ করে একটু বুঝিয়ে বলবেন কি - গারো জনগোষ্ঠী যে অাদিকাল থেকে মধুপুর বনে বসবাস করে অাসছে বলে অাপনার গবেষণালব্ধ জ্ঞান দাবি করছে তার যৌক্তিক ব্যাখা কি? অামি বুঝতে পারছি, প্রশ্ন যাই করি না কেন, তিনি অামাকে মুহুর্তেই অজ্ঞ প্রমাণ করে দেবেন। শিক্ষার্থীরাও অামার বেহাল দশা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। ফিলিপ গাইন নিজেও বন বিভাগের সবচেয়ে অশিক্ষিত একজন রেঞ্জ কর্মকর্তাকে ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করে প্রশ্নবাণে নাজেহাল করতে পারার অানন্দে উচ্ছল হয়ে উঠছেন। অসম বাকযুদ্ধে জয়ের অানন্দে তার চোখ ঝিকমিক করে ওঠেছে। তিনি বিজয়ীর ভঙ্গীতে সবার দৃষ্টি অাকর্ষণের জন্য কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। প্রসঙ্গ ঘুড়ে যাবার অাগেই অামি জানতে চাইলাম -কিছু মনে করবেন না।অাপনি বলেছেন, গারোরা তাদের সেই "অাদিম সংস্কৃতি" নিয়ে বর্তমানেও বসবাস করে চলেছে । এবার একটু বুঝিয়ে বলবেন কি সেই "অাদিম সংস্কৃতি " টা কি? তিনি রুষ্ট কণ্ঠে বললেন -কেন , অাপনি কি সংস্কৃতি শব্দের অর্থও বুঝেন না ? অামি বললাম - শব্দটা বলতে এবং শুনতে অামার খুব ভাল লাগে। সুযোগ পেলেই যে কোন জায়গায় বসিয়ে দেই কিন্তু মূল অর্থ তেমনভাবে বুঝি না। অার অাপনার গবেষণার সিংহভাগ জুড়েই তো রয়েছে "অাদিম সংস্কৃতি "। এ শব্দের অর্থতো অাপনার অনেক অনুসন্ধান অার গবেষণার ফল। সুতরাং একটু বুঝিয়ে বললে অামার বিশ্বাস, অামার মত অাপনার শিক্ষার্থীদেরও উপকার হবে। অার অামি ব্যক্তিগতভাবে অাপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। তিনি ছাত্র পড়ানোর ভঙ্গীতে বলতে থাকেন, সংস্কৃতি হচ্ছে ---- চলবে

No comments: