ইয়াবার ছোবলে বেসামাল তারুণ্য

জুড়ী টাইমস সংবাদ: রাজধানীসহ দেশের অলিগলি-গ্রামগঞ্জ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা ট্যাবলেট। হাত বাড়লেই মুড়ি-মুড়কির মতো মিলছে নানা রঙের এই নেশা জাতীয় দ্রব্য। চলার পথে হরহামেশা মিলছে ‘বিস্কিটের গন্ধ’। আগে শহরের মানুষ ইয়াবার গন্ধের সঙ্গে অধিক পরিচিত হলেও এখন গ্রামগঞ্জের মানুষও এই গন্ধের সঙ্গে পরিচিত! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে প্রায় দিনই ইয়াবার চালান আটক হলেও থেমে নেই এ ব্যবসা। নানা কৌশলে সহজে বহনযোগ্য এই বস্তু ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলা, তরুণ ও কিশোররা পর্যন্ত এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। পার্সেল সার্ভিস এবং আকাশপথেও পাচার হচ্ছে এই মরণনেশা। মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানান, নব্বই দশক থেকে দেশে ফেনসিডিল সিরাপের কদর ছিল। দিন দিন এর কদর বাড়তে থাকে। সীমান্তের ওপাড় থেকে অবৈধভাবে আসা এই মাদক শহর ছাপিয়ে গ্রামগঞ্জে ঢুকে পড়ে। উঠতি তরুণ ও যুবকদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। দেশে ইয়াবা ট্যাবলেট প্রথম প্রবেশ করে ১৯৯৭ সালে। ইয়াবা হলো মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। মাদকটি একাধারে মস্তিষ্ক ও হৃৎযন্ত্র আক্রমণ করে। ২০০২ সালে উত্তরা এলাকা থেকে জুয়েল নামে এক যুবককে ইয়াবার চালানসহ প্রথম গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মূলত তখন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নতুন করে এই নেশার বস্তুর পরিচিতি ঘটে। এরপর ধীরে ধীরে এর বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। ২০০৩ সাল থেকে ফেনসিডিল আসক্তরা ইয়াবা জগতে হাত বাড়াতে থাকে। তরুণ যুবক থেকে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী এমনকী সব বয়সী মানুষ এখন ইয়াবা নেশায় ঝুঁকে পড়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার অনেকেই এই নেশায় আসক্ত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জার্মান প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলার তার মেডিকেল চিফকে আদেশ দিলেন দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাদের যাতে ক্লান্তি না আসে এবং উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে বা বিমানের পাইলটের নিদ্রাহীনতা, মনকে উৎফুল্ল ও চাঙ্গা রাখার জন্য একটা কিছু আবিষ্কার করতে। টানা ৫ মাস রসায়নবিদরা চেষ্টা চালিয়ে মিথাইল অ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি করেন ইয়াবা।
এদিকে বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা নিয়ে ২০১২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা করে। তখন এতে ৫৫৪ ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে এ তালিকা এক দফায় হালনাগাদ করে। সে সময় ব্যবসায়ীর সংখ্যা ছিল ৭৬৪ জন। সম্প্রতি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের তৈরি তালিকা সমন্বয় করা হয়েছে। সমন্বিত ওই তালিকা অনুযায়ী সারাদেশে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১ হাজার ২২৫ জন। এদের নাম-ঠিকানা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়ার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ ১০ সদস্য অন্যতম। তালিকায় স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ১৫ জনের নাম রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১১ সদস্যসহ ওই এলাকার মোট ৪৯ জনের নামও আছে তালিকায়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্ব^ারসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নামও স্থান পেয়েছে এতে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ মে কক্সবাজারে এক সমাবেশে বলেন, ইয়াবা সাপ্লাই বন্ধ করতে হবে। কোনোভাবে ইয়াবা সরবরাহের সুযোগ করে দেয়া যাবে না। যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে ইয়াবাসহ সব মাদক বন্ধ করতে হবে। ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তারা অপরাধী। তারা সমাজের শত্রু, দেশের শত্রু। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। শাস্তির হাত থেকে তারা কোনোভাবে রেহাই পাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ইয়াবার অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারকারীর সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযোজন করে নতুন আইন প্রণয়ন হচ্ছে। ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির মাদকদ্রব্যে অন্তর্ভুক্ত করে এ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সংযোজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়াবার আকার এতটাই ছোট যে, কেউ পকেটে করে অনেকগুলো ইয়াবা পরিবহন করতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের কছে যে তথ্য আছে তাতে করে ইয়াবায় প্রচুর লাভ হয়। তাই দ্রুত গ্রামেগঞ্জে ইয়াবার বিস্তার লাভ করেছে। নাফ নদী দিয়েই প্রায় ৭০ শতাংশ ইয়াবা আমাদের দেশে আসে। মাছ ধরার নাম করেই বেশিরভাগ আসে। এজন্য নাফ নদীতে কিছু দিনের জন্য মাছ ধরতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুতের পর তাদের ঠিকানা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। অভিযানের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। জনবল বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। মাদকের রুট চিহ্নিত ও বিশেষ জোন করে অভিযান জোরদারের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৫ সালে দেশে ১ কোটি ৩৪ লাখ ২৬ হাজার ২৮৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এর পরের বছর ১ কোটি ৬৯ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭ পিস এবং চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সারাদেশে ১ কোটি ৪ লাখ ৫ হাজার ৬২৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিজিবি ও অন্যান্য সংস্থা মিলে উল্লিখিত পরিমাণ ইয়াবা আটক করেছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে।

এদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে সারাদেশে দুই কোটি ৯৪ লাখ হাজার ৫০ হাজার ১৭৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল দুই কোটি এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ পিস।
সূত্র মতে, সব সংস্থা মিলে ২০০৮ সালে ইয়াবা জব্দ করা হয় ৩৬ হাজার ৫৪৩ পিস। ২০০৯ সালে এক লাখ ২৯ হাজার ৬৪৪ পিস, ২০১০ সালে আট লাখ ১২ হাজার ৭১৬ পিস, ২০১১ সালে ১৩ লাখ ৬০ হাজার ১৮৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০১২ সালে ১৯ লাখ ৫১ হাজার ৩৯২ পিস, ২০১৩ সালে ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫২৮ পিস, ২০১৪ সালে ৬৫ লাখ ১২ হাজার ৬৫৯ পিস, ২০১৫ সালে দুই কোটি এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৮১ পিস এবং ২০১৬ সালে দুই কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ১৭৮ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা নেয়া মাদকাসক্তদের হিসাবে ২০১৫ সালের তুলনায় গত বছর ইয়াবা আসক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে মাদকাসক্ত হিসেবে যারা চিকিৎসা নিয়েছে তাদের ৩১.৬১ শতাংশ ইয়াবা আসক্ত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২ সালে মাদকাসক্ত হয়ে যারা চিকিৎসা নিয়েছে, তাদের ৫.৭৭ শতাংশ ইয়াবা আসক্ত। ২০১৩ সালে এ হার ছিল ১০.৩৩ শতাংশ, ২০১৪ সালে ১৭.৯৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২০.৬৪ শতাংশ এবং গত বছর তা ছিল ৩১.৬১ শতাংশ।
২০০৪ সালে র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২৫ জুলাই মঙ্গলবার পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ৬৪ হাজার ৬৯৫জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ ৬১ হাজার ৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। এ ছাড়া গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই মঙ্গলবার পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ৪৯ জনকে। উদ্ধার হয়েছে ৫৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর তথ্য মতে, ২০০৯ সাল থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত ১ কোটি ৩ লাখ ৩০ হাজার ১৩৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্টগার্ড গত ৫ বছরে ১ কোটি ৮ লাখ ১৪ হাজার ৪২৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর গুলশান-১ নম্বরের ১২৩ নম্ব^র বাড়ি থেকে আমিন হুদা ও তার সহযোগী আহসানুল হক ওরফে হাসানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৩০ বোতল ফেনসিডিল, ৪৬ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার জব্দ করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গুলশানের আরেকটি বাসা থেকে ১৩৮ বোতল মদ, এক লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা এবং ইয়াবা ট্যাবলেট তৈরির উপাদান জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা দুটি মামলায় ২০১২ সালের ১৫ জুলাই আমিন হুদা ও আহসানুল হককে মোট ৭৯ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার আদেশ দেয় বিচারিক আদালত। তারা এখনো কারাবন্দি।
এ ছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান দম্পতিকে খুন করেছে তাদেরই মেয়ে ঐশী। যিনি ইয়াবাসহ চার ধরনের মাদকাসক্ত ছিল। ঐশী সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এখন কারাবন্দি।

No comments: