ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ -৩

                    ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ -৩
                    লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

সংস্কৃতি হচ্ছে - যে কোন জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ জীবনাচরণ। অার সেই সংস্কৃতিগত ভিন্নতাই হচ্ছে এক জনগোষ্ঠীকে অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথকভাবে পরিচিত করার সহজ মানদণ্ড।এই সংস্কৃতিগত ঐক্যের কারণেই একটি জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকটি মানুষ তার সাথে রক্ত বা অাত্মীয়তার সম্পর্ক থাক বা না থাক তারা একে অপরের প্রতি গভীর মমত্ববোধ অনুভব করে, ঐক্যবদ্ধ হয় । অর্থাৎ কোন জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকটি সদস্যের অাচার -ব্যবহার, পোশাকপরিচ্ছদ, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গীত, নৃত্য, সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, জীবিকার উপায়, চাষাবাদ, অানন্দ উৎসব, বৈবাহিক অনুষ্ঠানাদিসহ যাবতীয় কাজকর্মের পদ্ধতিগত ঐক্যই হচ্ছে তাদের সংস্কৃতি।

কোন কোন জনগোষ্ঠী অাছে যারা তাদের পূর্বপুরুষদের অাচরিত সেই সকল সনাতন পদ্ধতি থেকে অাদৌ বেড়িয়ে অাসতে চায় না। গারো ও কোচ হচ্ছে সেই রকম জনগোষ্ঠী। তারা তাদের পূর্বপুরুষগণের সেই সনাতন জীবনাচরণের মধ্যেই অাজো বেঁচে থাকতে চায় অর্থাৎ গারো ও কোচ জনগোষ্ঠী যে অাদিম সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় তা হচ্ছে, সেই পদ্ধতি যে পদ্ধতিতে তাদের পূর্বপুরুষগণ জীবিকা নির্বাহ করে গেছে , যে সামাজিক বিধিনিষেধ, ধর্মীয় রীতিনীতি তারা মেনে গেছে , যে পদ্ধতিতে ঐতিহ্যগতভাবে অর্জিত জমিতে তারা চাষাবাদ করে গেছে , যেপদ্ধতি অবলম্বন করে তাদের বিবাহ, নৃত্যগীত, অানন্দ উৎসব পালন করে গেছে , পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করে গেছে। তার চমৎকার বন্দনায় অামরা সবাই মুগ্ধ। এত সুন্দর করে গোছানো উপস্থাপনা যা শুধু শুনতেই ইচ্ছে হয়। প্রতিবাদ করা বা যুক্তি দাঁড় করানোর কোন উপায় নেই। কারণ মধুপুরের গারোদের সংস্কৃতি বা অাদিম সংস্কৃতি হচ্ছে বাতাসে ভেসে বেড়ানো দৃষ্টিনন্দন পেঁজা তুলোর মত। পেঁজা তুলো যখন বাতাসে উড়ে বেড়ায় তখন দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। অালতো করে হাতের তালুতে নিলে অাঁজলা ভরে যায় কিন্তু যদি মুঠোবন্দী করা হয় তাহলে বুঝাই যায় না যে তার অস্তিত্ব অাছে। তাই অামি তার বক্তব্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগী শ্রোতা হয়ে রইলাম। তিনি তার সম্মোহনী বক্তৃতা শেষ করে অামাকে জিজ্ঞেস করলেন - এবার নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন অাদিম সংস্কৃতির ধারক এই গারো অার কোচদের কেন অামি অাদিবাসী বলে পরিচিতি দিতে চাইছি ? অামি কোন উত্তর না দিয়ে অামার সহকারীকে বললাম টেবিলের উপর বিছিয়ে রাখা অরণখোলা মৌজার গায়রা, টেলকি ও সাধুপাড়া অংশের সিট ম্যাপটি নিয়ে অাসতে। ম্যাজিশিয়ান যে যত্নে খেলা দেখাবার অাগে যাদুর রুমাল দর্শকদের চোখের সামনে মেলে ধরে অামি ঠিক তেমনি করে মৌজা সিট ম্যাপটি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরে বললাম -অনুগ্রহ করে দেখুন, এটা হচ্ছে অরণখোলা মৌজা ম্যাপের একটা অংশ। অামরা সাধারণত মৌজা সিট ম্যাপ বলি। ম্যাপ হচ্ছে বাস্তবের বিশাল একটা জায়গাকে সহজে জানার জন্য ছোট করে উপস্থাপিত কাগজচিত্র। যার উপর সেই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা বিভিন্ন অনুমোদিত চিহ্ন দ্বারা সুনির্দিষ্ট অানুপাতিক দূরত্বে পরিমাপগত অস্তিত্ব প্রকাশ করে। 

অাপনারা নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করতে পারেন, অাপনাদের অাজ দেখাবো বলে এই ম্যাপ অামি প্রস্তুত করিনি। এই ম্যাপ প্রস্তুতের কাজ যে সময় শুরু হয়েছিল সে সময় অামার মরহুম দাদা তার বাবার সাথে সংসারের কাজে কেবল হাতে খড়ি দিচ্ছেন। অামার মরহুম বাবা তখন অস্তিত্বহীন। অামি অাপনাদের অারো অাশ্বস্থ করতে চাই - তখন এই বন পাহাড়া দেবার জন্য অামাদের মত কোন সরকারী লোক ছিল না। কারণ এই বনের মূল মালিক ছিলেন দিল্লীর সম্রাট। এই বন তাদের ইজারাদার পরে দখলদার ইষ্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর ইংরেজ বেনীয়াদের কাছ থেকে অাগ্রহী জমিদারেরা নিলাম ক্রয়ের মাধ্যমে সাময়িক সময়ের জন্য মালিক হতেন মাত্র । নিয়মিত নিলামমূল্য পরিশোধ করতে না পারায় এই বন একাধিক বার নিলাম /পুন: নিলাম হয়েছে। ফলে খুবই অল্প সময়ে এই বনের মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে । যাক্, অাজ এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে মূল প্রসঙ্গে অাসি।
সঙ্গতকারণেই তখন এই বন পাহাড়া দিতেন জমিদারের লেঠেল বাহিনী। অাপনাদের অারো বিশ্বাস করা উচিৎ হবে যে -সেই লেঠেল বাহিনীর একজনও অামার পূর্বপুরুষ ছিলেন না। এমন কি এই বন যারা জরিপ করেছেন সেই জরিপকারকদের মধ্যেও অামার পূর্ব পুরুষ বা তার কোন স্বজন ছিলেন না। তাই অাপনারা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারেন -অাজকে অাপনাদের বিভ্রান্ত করতে হবে এটা ভেবে এই মৌজা ম্যাপ অামার পূর্বপুরুষদের কেউ অাগাম প্রস্তুত করে রেখে যান নি।
এই ম্যাপে প্রদর্শিত কোন কিছুতেই অামার বা অামার পূর্ব পুরুষের মর্জি প্রতিফলিত হয় নি। এবার অাপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে এই ম্যাপ নিয়ে অামি অাপনাদের স্যারের সাথে দু ' একটা কথা বলতে চাই। অামি একটু দম নিলাম। দেখে মনে হলো, অামি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ অাকর্ষণ করতে পেরেছি। এবার অামি ক্যাভাসারদের মত গলার সুর উচ্চগ্রামে তুলে জিজ্ঞেস করলাম - অাপনারা কি অামাকে অনুমতি দিচ্ছেন! শিক্ষার্থীরা প্রায় একযোগে বললেন -জ্বি, অাপনি কথা বলতে পারেন। তাদের বলার ঢং ও মুখভঙ্গি দেখে অামার মনে হলো তারা অসম দ্বৈরথের মজা উপভোগ করতে উন্মুখ হয়ে অাছে।
এবার অামি ফিলিপ গাইনের মুখের দিকে তাকালাম। মনে হলো তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারায় ইতোপূর্বের খেলা করা চিকচিকে ভাব কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। তার রক্তিম চেহারায় অস্বস্তিকর অনুভূতির ছাপ সুস্পষ্ট । অামি বিনয়ের সাথে ফিলিপ গাইনের সামনে ম্যাপটি তুলে ধরে বললাম -অনুগ্রহপূর্বক দেখুন তো, এই মৌজা সিট ম্যাপটি প্রকৃত পক্ষেই অরণখোলা মৌজার কি না! তিনি ম্যাপ ভাল করে দেখে বললেন -জ্বি, এটা অরণখোলা মৌজার ম্যাপ। -দেখুনতো ম্যাপটি কত সনে প্রস্তুত করা হয়েছে মুহুর্তেই তিনি তার চাঁদপানা মুখ গম্ভীর করে ফেললেন। তার টকটকে ফর্সা মুখে এক ঝলক রক্ত যেন বিদ্যুৎ-এর মত চমকে গেল। তিনি মিনমিন করে বললেন - ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ। অামি ছাত্রছাত্রীদের সামনে সিট ম্যাপটি মেলে ধরে বললাম - অাপনারা শুনেছেন তো, অাপনার স্যার বলেছেন এই সিট ম্যাপটির প্রস্তুত কাল ১৯২০ খ্রি:। অর্থাৎ ম্যাপটির বয়স ১০০ বছর পূর্ণ হতে এখনো প্রায় ১৪ বৎসর বাকি। অাপনাদের স্যার এইমাত্র যে টেলকি, গায়রা,ও সাধুপাড়ার নাম বলেছেন এই ম্যাপটি হচ্ছে সেই এলাকার। অাপনারা ম্যাপটি ভাল করে দেখে বলুন তো। এই ম্যাপের কোথাও জনবসতি বা চাষাবাদের জমির কোন চিহ্ন অাছে কি না? এই যে এখানকার এই চিহ্নটা দেখছেন , এটা হচ্ছে বাঈদ ভূমি এবং তার পাশের এই চিহ্ন, এটা হচ্ছে ছড়া। অাপনারা সরেজমিনে দেখতে চাইলে চলুন, এই ম্যাপে যে সকল চিহ্ন দেয়া অাছে তার প্রত্যেকটা অামি সরেজমিনে অাপনাদের দেখাবো। দীর্ঘদিন চাষাবাদের কারণে হয়তো তাদের কারো কারো অবয়বগত অাকৃতি ও অায়তনে পরিবর্তন এসে থাকতে পারে। কিন্তু প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পরিবর্তন ব্যাতিত অাপনি এমন একটা বাঈদ, ছড়া বা খাল বের করতে পারবেন না, যা এই সিট ম্যাপে নাই। 

এবার তাদের মতামত জানার জন্য উচ্চগ্রামে স্বর তুলে জিজ্ঞেস করি --যদি ম্যাপে প্রদর্শিত চিহ্নের প্রত্যেকটির অবস্থান সঠিক হয় তাহলে কি অামরা বিশ্বাস করতে পারি এই "সিটম্যাপটি সঠিক।" শিক্ষার্থীদের সবাই সমস্বরে উত্তর দেন -জ্বি সঠিক।-যদি ম্যাপ সত্য হয় তাহলে অামি অাপনাদের স্যারের কাছে কি জানতে চাইতে পারি, অাপনার স্যারের দাবিকৃত সেই শত শত বছর অর্থাৎ স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে অাসা অাদিবাসী গারো অার কোচদের জনবসতি গুলোর অবস্থান কোথায় ? তারা সমস্বরে জবাব দেন -জ্বি, জানতে চাইতে পারেন। এবার অামি অামার শ্রদ্ধেয় ফিলিপ গাইনের মুখের দিকে চাইলাম। তিনি যে উচ্ছ্বাস নিয়ে এত সময় অামাকে নাজেহাল করে অানন্দ পাচ্ছিলেন সেখানে যেন অমাবস্যা নেমেছে।
দেখে বড্ড মায়া হলো। তারপরও জিজ্ঞেস করলাম -অাপনি এই ম্যাপে অাপনার সেই অাদিবাসী গারোদের বাসস্থান, চাষাবাদের জমি বা উল্লেখযোগ্য স্থাপনা যা কিছু রয়েছে তা দয়া করে অাপনার ছাত্রছাত্রীদের দেখিয়ে দেবেন ? অারো বলবেন, যেখানে শত বছরের কম সময়ের এই ম্যাপে জন বসতির কোন অস্তিত্ব নেই সেখানে শতশত বছরের ( স্মরণাতীত কালের) মুখস্থ তথ্য অাপনি কিভাবে, কোত্থেকে অাবিষ্কার করলেন ? অাপনি দয়া করে অাপনার অাবিষ্কারের সমর্থনে অাজ উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ অামাদেরকে দেখাবেন। কিছু মনে করবেন না, অামি অাবারও অাপনার কাছে বিনীত অনুরোধ করছি -অাজকে অাপনি যা কিছু বলবেন তার প্রত্যেকটা বিষয়ের সমর্থনে উপযুক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করবেন। অামি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে জানতে চাইলাম - অামি অাপনাদের স্যারের কাছে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করছি বলে অাপনারা কিছু মনে করছেন না তো! অামি ফিলিপ গাইনের দিকে তাকিয়ে বললাম -দয়া করে অাপনি প্রমাণ করে দিন -অামি যে সিট ম্যাপ দেখাচ্ছি, তা ভূয়া। যদি প্রমাণ করতে না পারেন তাহলে অাপনাকে বলতে হবে শতশত বছর(স্মরণাতীত কাল) ধরে বসবাসকারী সেই গারোদের বসতি কোথায় ছিল? যার কোন চিহ্ন ম্যাপে নাই। কেন নাই সে ব্যাখ্যাও অাপনাকে দিতে হবে? এখানে অামার উপস্থাপিত এই প্রমাণ মিথ্যা হলে অামি মেনে নেব অাপনার দাবি সঠিক অার অাপনি যদি অাপনার বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারেন তাহলে অাপনাকে স্বীকার করে যেতে হবে এতদিন অাপনি যা কিছু দাবি করে এসেছেন তা ভূয়া! অাপনি ধরে নিন অাজ অাপনার গবেষণা লব্ধ প্রমাণ উপস্থাপন করার দিন। অাপনি মনগড়া, বানোয়াট ও কাল্পনিক গারো বসতির কথা বলে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্ত করবেন সে তো হতে পারে না। অাপনাকে অবশ্যই প্রমাণ দিতে হবে কে সঠিক? অাপনার কাল্পনিক দাবি না কি এই মৌজা ম্যাপ? তিনি স্থানুর মত ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। বোধহয় ভাবছিলেন -কি ভাবে শুরু করবেন! এই ফাঁকে অামি জানতে চাইলাম -অাপনি গারোদের অাদিম সংস্কৃতি নিয়ে যে মনোলোভা শ্রুতিমধুর বর্ণনা দিয়েছেন এবার সেই প্রসঙ্গে দু 'একটা কথা অাপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। অন্য প্রসঙ্গ উঠবার অাগেই অামি শিক্ষার্থীদের কাছে জিজ্ঞেস করলাম -অাপনারা কি বলেন ?
তারা দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। অামি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলাম - অাদিম সংস্কৃতির মূল প্রসঙ্গে যাবার অাগে বলুনতো, গারো জনগোষ্ঠী কোন ধর্মাবলম্বী? চলবে -----

No comments: