ফিলিপ গাইন -এর সাথে কিছুক্ষণ

                   ফিলিপ গাইন -এর সাথে কিছুক্ষণ
                   লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ
 
ফিলিপ গাইন। বন,বন বিনাশ ও বনবাসীর জীবন সংগ্রামসহ অনেকগুলো বইয়ের সম্পাদক। শিক্ষকতাও তার পেশা / নেশা। বিদ্বান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চমৎকার মানুষ। নামের মত চেহারায়ও রয়েছে অাভিজাত্যের ছাপ। এক কথায় বলা যায়, প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করার মত গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ। ভাবলে অাশ্চর্য লাগে, অামি কতটা মূর্খ। মধুপুর জাতীয় উদ্যানে চাকুরি করছি প্রায় ৫ বছর অথচ জানতেই পারিনি - তিনি অাছেন। 

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জনাব অাবু হানিফ পাটোয়ারী জানতে চাইলেন --ফিলিপ গাইনকে চিনেন! অামি যেন অাকাশ থেকে পড়লাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না। মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি ভীষণ রাগী মানুষ, যা জানতে চান তা জিজ্ঞেস করার সাথেসাথেই বলা চাই নইলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। অমৃত বর্ষণ শেষ করে তিনি বললেন -জহির তাকে চিনে। তার কাছ থেকে জেনে নিবেন। মধুপুরে চাকরি করছেন অথচ যার নাম সবার অাগে জানা দরকার তার নামই জানেন না। অাপনার মত মূর্খ লোক দিয়ে রেঞ্জ চালাবো কি করে? মধুপুরে চাকুরি করতে হলে তার সম্বন্ধে জানতে হবে, তার সাথে পরিচয় থাকতে হবে। সময়ে সময়ে তার কাছ থেকে উপযুক্ত পরামর্শ নিতে হবে। এ কথা যেন দ্বিতীয় বার বলতে না হয়! নিজের সীমাহীন অজ্ঞতার জন্য লজ্জায় তখন অামার ত্রাহি মধুসুধন অবস্থা। যার জন্য এত লাঞ্ছনা তার সাথে পরিচিত হবার উদগ্র বাসনা নিয়ে রেঞ্জে এলাম। 

সহকারী বন সংরক্ষক জনাব মোহাম্মদ জহিরুল হক তখন মধুপুরের ৪টি রেঞ্জের দায়িত্বে। চৌকষ অফিসার। তাকে নিজের অজ্ঞতা ও লজ্জার কথা খুলে বললাম এবং সেই প্রথম জানলাম, এই অলোকসামান্য ব্যক্তির উপাখ্যান। ভেবে অাশ্চর্য হলাম -কেমন বেক্কল মানুষ অামি। এমন একজন প্রথিতযশা মানুষ, যিনি কিনা অামার নাকের ডগা দিয়ে এই মধুপুরের বনে নিয়মিত বিরতিতে যাতায়াত করেন অথচ তাকে অামি চিনি না। একদিন সহকারী বন সংরক্ষকের তলব পেয়ে তার অফিস কক্ষে ঢুকেই দেখলাম চেহারাদূরস্ত এক লোকের সাথে তিনি কথা বলছেন। সম্মান দেখালাম।তিনি অাগ্রহ ভরে বললেন -কামরুল, অাপনি যার সাথে পরিচিত হতে ব্যাকুল হয়ে অাছেন ইনিই সেই ফিলিপ গাইন। অামি এবার ফিলিপ গাইনকে সম্মান দেখিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। তিনি চেয়ারে বসেই অামার সাথে করমর্দন করলেন। অামি বললাম -অাপনি তাহলে সেই শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি যিনি বন ও বনের মানুষদের নিয়ে ভাবেন। তাদের দীর্ঘদিনের জটিল অবস্থা, দু:খ,বেদনা ও অন্যায় সহ্য করে অাসার বিষয় নিয়ে কাজ করেন! অাপনিই সেড -এর নির্বাহী কর্মকর্তা! তিনি হাসলেন। মনে হল তার হাসিতে ঘর অালোকিত হয়ে উঠলো। তারপর মৃদু স্বরে বললেন, হ্যা অামি বিগত এক দশক ধরে এই সকল বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা করে অাসছি। পত্র পত্রিকায় মাঝে মধ্যে লিখি তাছাড়া কিছু বই -এর অামি সম্পাদক এবং লেখক। অাপনার বই থেকে তাহলে তো অনেক অজানা তথ্য জানতে পারবো? তিনি মৃদু হেসে বললেন -অামি চেষ্টা করে যাচ্ছি প্রকৃত চিত্রটা তুলে ধরতে। পড়ে দেখতে পারেন যদি কাজে লাগে। অামি বললাম - অাপনার প্রশংসা অামি বহু শুনেছি। অাপনাকে দেখার অাগ থেকেই অামি অাপনার একজন ভক্ত। কারণ জেনেছি অাপনি শুধু যে বনের মানুষদের নিয়েই ভাবেন তা নয় বরং বনও অাপনার গবেষণার বিষয় । বনের দূর্গতি নিরসনেও অাপনি নিবেদিত প্রাণ। মূল কথা প্রথম দর্শনেই তাকে অামার ভাল লেগে গেল। কথা হলো। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত বই -এর ব্যাপারে খোঁজখবর নিলাম। দ্রুত ফিলিপ গাইনের "বাংলাদেশের বিপন্ন বন "সংগ্রহ করে পড়ে ফেললাম। অসাধারণ লেখা। সূচিপত্রের প্রতিটি বিষয় কৌশলী উপস্থাপনায় ভরপুর। যা শুধু এই মধুপুর বনের সাথে অাত্মিকভাবে মিশলেই অনুভব করা যায়। অামি তার গবেষণাপত্রের চমৎকারিত্বে রীতিমতো মুগ্ধ । তখন ১/১১ -এর পরবর্তী সময়। সবেমাত্র জবরদখল সরকারি ভূমি উদ্ধারের প্রথম জোয়ার শেষ হয়েছে। যে উদ্দীপনায় শুরু হয়েছিল অদৃশ্য কারণে এখন তাতে পড়েছে ভাটার টান। 

মধুপুরের ৪ টি রেঞ্জে এই সময়েই উদ্ধার করা হয়েছে কমবেশি ছত্রিশ শত একর জবরদখলী বনভূমি। এই সুবাদে বন বিভাগ সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসনের নেতিবাচক ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তারা ধারণা করেছিল বন বিভাগকে হাজারো চাপ দিলেও জবরদখলী বনভূমি উদ্ধার করা তাদের কর্ম নয়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে এ বিষয়ে তাদের অাগ্রহ ছিল সীমাহীন। সহকারী বন সংরক্ষক সেই চাপে প্রায় চিরেচেপ্টা। ফলে তিনিও অামাদের প্রস্তুতি পর্বের বিলম্ব দেখে রীতিমত অস্থির।
সবে প্রায় হাজার খানেক শ্রমিক নিয়ে পাঁচ দিনের অভিযান শেষ করেছি। অামাদের উদ্ধারকৃত বনভূমির পরিমাণ দাঁড়ালো কমবেশি ৩৬০০ একর। চোখের নিমিষে ধ্বংস হলো একরের পর একর কলা বাগান।ইতোমধ্যে ধ্বংসের বিভিষিকায় অাতঙ্কিত কলাচাষীগণ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে প্রশাসনসহ সম্ভাব্য সকল জায়গায় ধর্ণা দিতে শুরু করেছে। কারণ
অারো কয়েক হাজার একর কলাবাগান তখন ধ্বংসের প্রতিক্ষায়। এই অভিযান নিয়ে মধুপুরে যতটা সোরগোল হলো তারচেয়ে ঢের বেশি শুরু হলো রাজধানী ঢাকায়। তাদের নেতৃবৃন্দ দু:খ বেদনায় ক্লিষ্ট বন্ধুদের নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো। কাল্পনিক কাহিনীর পসরা নিয়ে বন মন্ত্রণালয়ের ভিত কাঁপিয়ে তুললো। প্রশাসন বিব্রত। যৌথবাহিনীর প্রধান শক্তি সেনাবাহিনী বিমর্ষ বাকী রইলাম অামরা বন বিভাগ। অামরা চারিপাশের বিচিত্র সব প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে থাকলাম। ভাবটা এমন, সরকারি স্বার্থে নয় বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে অামাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে। তখন অামাদের প্রায় কোন ঠাসা অবস্থা। সকাল বেলা। অফিসে মৌজা ম্যাপ নিয়ে বসেছি। উদ্ধারকৃত ও উদ্ধারযোগ্য বনভূমির স্কেচম্যাপ তৈরি করা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। এমন সময় গেইটম্যান এসে বললো -স্যার, একজন বিদেশী কয়েকগাড়ী লোক নিয়ে এসেছেন। সহকারী বন সংরক্ষককে চান। তিনি নাই শুনে অাপনাকে চাচ্ছেন। অামি বললাম -অাসতে বলো।- বলেছিলাম। কিন্তু তিনি অাপনাকেই যেতে বলেছেন। -পরিচয় দিয়েছেন কি? -জ্বি না। শুধু বলেছেন কোন এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন। দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। অামার এত সুন্দর সাজানো গোছানো অফিস যার পছন্দ হয়নি তার সাথে সরকারি কাজ ফেলে দেখা করবো কি না। মুহুর্তেই সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বেড়িয়ে অাসলাম। দেখি বিশাল শাল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে অামার শ্রদ্ধাভাজন গবেষক ফিলিপ গাইন। অামি ভীষণ লজ্জা পেলাম। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম।করমর্দন শেষ করে বললাম -অাপনি অাসবেন অাগে থেকে জানাবেন না! ছি: ছি: কি লজ্জা। অাপনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অাসুন অামার অফিসে বসুন। তিনি বললেন - না না বসবো না। অনেকগুলো কাজ নিয়ে এসেছি। সাথে ছাত্রছাত্রী রয়েছে। বিকালের মধ্যেই ফিড়ে যাব। অন্য একদিন বসা যাবে। অাপনি এক কাজ করেন। ছাত্রছাত্রীদের একটু বসার ব্যবস্থা করেন। তাদেরকে অাপনি রেঞ্জের পক্ষ থেকে মধুপুর বন সম্পর্কে কিছু বলেন। যত সংক্ষেপে পারেন। অসুবিধে নেই। অামি বিষম খেলাম। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গামীদের সাথে তথ্যকথা বলবো ভাবতেই ঘেমে নেয়ে উঠছি। অাহত গলায় বললাম - অাপনি এটা কি বললেন! কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে এতগুলো চৌকষ ছেলেমেয়ের সামনে তথ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে বেজ্জতি হবো না কি! অামাকে রাত্রে বলে রাখতেন। ন্যুনতম প্রস্তুতি হলেও থাকতো। তিনি অামাকে অাশ্বস্থ করে বললেন -সমস্যা হবে না। অামিতো মধুপুর সম্পর্কে ভাল জানি। কোথাও অসুবিধে হলে অামি সংশোধন করে দেব। চিন্তা করবেন না। সাহস নিয়ে শুরু করেন। অামি মরিয়া হয়ে বললাম -অাপনিতো ক্লাশ নেন। একই বিষয়ে অাপনাকে প্রায় নিত্য ক্লাশ নিতে হয়। অাপনি কি পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া ক্লাশে ঢুকেন। তিনি স্বীকার করলেন -না তিনি প্রস্তুতি না নিয়ে ক্লাশে যান না। -তাহলে অামাকে বলছেন কেন? যা হোক, শেষ পর্যন্ত রাজী হলাম। অফিসের সামনেই বসার ব্যবস্থা করলাম। ছাত্রীরা সামনের সাঁড়িতে বসলেন। ছেলেরা পিছনে। অাসন না থাকায় অনেকেই দাঁড়িয়ে রইলেন। অামার পাশের চেয়ারে শ্রদ্ধাস্পদ ফিলিপ গাইন।  চলবে --

No comments: