শোকের আগস্ট : সীমার মাঝে অসীম তুমি

ঝর্ণা মনি : ‘সীমার মাঝে অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর কাব্যের ছন্দের মতোই অনন্য হয়েও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। দেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার পরও আধুনিক সাজ-সজ্জার সরকারি বাসভবন ‘গণভবনে’র রাজকীয় জৌলুসপূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নং সাদামাটা নিজের বাসভবনে। এখানেই থেকেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি যে অবস্থায় ছিল তার সবকিছু অবিকল ও অবিকৃত রেখেই এটিকে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সূতিকাগার এ বাড়িটিতে প্রবেশ করলে একজন সাধারণ দর্শনার্থীও বুঝতে পারবেন কী সাদাসিদে জীবনযাপনই করেছিলেন তিনি। ঘরের ভেতর সাধারণ মানে আসবাবপত্র ও একটি ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশনই বলে দেয়, কেমন ধরনের জীবনযাপন করতেন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তার এ সাধারণ জীবনযাপন আরো বলে দেয়, তিনি নিজের জন্য কখনো ভাবতেন না। তার সব ভাবনাই ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে। তিনি মানুষকে যেমন বিশ্বাস করতেন, তেমনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি যখন প্রেসিডেন্ট, তখন তার ৩২ নম্বরের বাড়িটি দেখার জন্য অনেকের মধ্যেই কৌত‚হল ছিল। আর ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়িটির দরজাও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল সবসময় খোলা। কিন্তু কেউ সাহস করে বাড়িতে না ঢুকে উঁকিঝুঁকি মারলেই বঙ্গবন্ধু ডেকে নিতেন সেই আগন্তুককে। পাশে বসিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইতেন তাদের অভাব অভিযোগের কথা। এমনকী আগন্তুককে নিজ হাতেই আপ্যায়ন করতেন তিনি।

মানুষের মুক্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র চিন্তা। একাত্তরের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিনে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনায় একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাতুর কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যেকোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’

বঙ্গবন্ধু যেমন বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা, তেমনি ছিলেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চেতনার মূর্তপ্রতীক। নিরন্ন-হতদরিদ্র-মেহনতী মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুকুটহীন সম্রাট বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে।’
আজীবন মানুষের জন্য কাজ করা বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতেন, ‘আমার পরিষ্কার কথা- আফ্রিকা হোক, ল্যাটিন আমেরিকা হোক, আরব দেশ হোক, যেখানেই মানুষ শোষিত, যেখানে মানুষ অত্যাচারিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত আমি ও আমার বাংলার মানুষ সবসময় সেই দুঃখী মানুষের সঙ্গে আছি ও থাকব।’

No comments: