জুড়ীতে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবীতে সম্মিলিত মৎস্যজীবি জনসাধারনের ব্যনারে "মানববন্ধন"

আফজাল হোসেন: ভয়াবহ এই বন্যায় হাকালুকি হাওরের জলমহালের ইজারাদারেরা মৌসুমী মৎস্যজীবি ( ফসল হারা কৃষক ) দেরকে ভাসান পানিতে মাছ ধরতে বাঁধা প্রদান করায়, জেলদের বাবা-মা, ভাই-বোন আর স্ত্রী-সন্তানদের বেচেঁ থাকার আশাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। বিলের সিমানার বাহিরে ব্যাক্তি মালিকানা জমিতেও প্রভাবশালী ইজারাদারেরা বাঁশ সহ বিভিন্ন উপকরন বসিয়ে জেলেদের মাছ ধরাকে বাঁধাগ্রস্থ করছে। ফলে ভয়াবহ এই বন্যার সময়টা জেলেদের হাফছেড়ে বাঁচার সম্ভাবনা কমে আসছে। আমাদের তেলির মাথায় তেল দেওয়া, সবলতান্ত্রীক এই সমাজে, সন্মান আর মর্যাদার পরিভাষা সব সময় নিরহ আর দুর্বল লোকদের দিয়ে শুরু হয় আবার শেষ হয় তাদেরকে দিয়েই। আমরা মানি আর না-মানি সবলবাদের এই সাম্প্রদায়ীকতা আলাদা আলাদা মাত্রায় হলেও আমাদের সবার মধ্যে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে। আর এ সবে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় ক্ষমতার ঠিকাদারদের। যারা সবচেয়ে কম সময়ে দুর্বলদের প্রতি সবলদের অত্যাচারের মত এই সামাজিক রোগকে উপড়ে ফেলার বদলে শোষনের এই পরিবেশকে জিয়িয়ে রেখে এই রোগকে আরোও যন্ত্রনাদায়ক করে তুলে। ভোটের সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থের এই গিটকেও মজবুত করতে, বৈষম্য মুলক ভাবনাকে আর এই ধরনের লোকেদের জেনে-শোনে ছেড়ে দিতে সাহায্য করে। কারন সবলদেরকে তাদের হাতের কাছে রাখার প্রয়োজন। আর দুর্বল কৃষক, জেলেরাতো সহজ-সরল! ভোটের সময় মিথ্যে আশার বাণীর কাছে দুর্বল, সহজ-সরল লোকেরা কাবু হয়ে সেই শোষনের কথা ভুলে গিয়ে তাদেরকেই পুনঃ নির্বাচিত করবে।

বিলে সর্বনিম্ন ৩ (তিন) ফুট পানি রেখে ফিশিং করার আইন থাকলেও তা মানেনা বিলের ইজারাদার, বরং বিল সেচে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রয়োগ করে মাটির নিচের মাছ ও ডিম সহ মেরে ফেলে। ফলে হুমকির মুখে পরে মাছের উৎপাদন সহ উপকূলী জীববৈচিত্র। আর যত সব আইন তা মেনে চলতে হবে শুধু নিরহ জেলেদেকেই। রাষ্ট্রীয় কল্যানে মাছের মজুদ বাড়ানোর লক্ষে মাছের পজনন সময়টা জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকে। আর যখন শ্রাবন-ভাদ্র মাসে জেলেরা ভাসান পানিতে মাছ ধরতে যায় তখনই ইজারাদারদের বাধার মুখে পরতে হয় জেলেদেরকে। 

সবলবাদকে শেষ করার জন্য আমার কাছে বা কারোও কাছেই কোন কুইক ফিকস্ট ফর্মোলা নেই। আর আমার মত দু-চার জনের লেখার মাধ্যমে সংরক্ষন নীতির মত গুরুত্ব পূর্ণ আর জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়তো উচিৎ হবেনা। আর্থিক, সামাজিক, রাজনীতিক বা ব্যাক্তিগত ব্যপার হউক। আমাদের দেশের সংবিধান বা আইন তাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সম্পূর্ন সক্ষম।

যদি সবাই আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে নিজেদের মতামতকে সবার সামনে রাখে, তাহলে একদিন কোন বিচারকেই ধারা বানানোর জন্য হয়তো আর মানুষই বাঁচবেনা। তাহলে সেই আইনটা কে বানাবে আর কে রক্ষা করবে সে আইন? যেখানে আর কোন ভেদাভেদ থাকবেনা? 

গত ২০ শে আগষ্ট ১৭ ইং জুড়ী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গনে ' ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবীতে সম্মিলিত মৎস্যজীবি জনসাধারনের ব্যনারে "মানববন্ধন" করা হয়। এ সময় কান্না জরিত কন্ঠে একজন জেলে বলেন, "এ যে আপনাদের আইননা! এতে আমাদের জন্মানোর সাথে সাথেই পিঠে জেলে বা জেলের সন্তান হিসেবে দুর্বলের ছাঁপ লাগিয়ে দেয়। মনে করে যে আমরা মানুষ না অমানুষ। সেই দিনটা কবে আসবে? যেদিন আমাদের শুধু মৎসজীবি পরিচয় দিতে হবেনা? কাউকে ভয় পেতে হবেনা? কাউকে মরতে হবেনা, কাউকে মারতেও হবেনা? জন্মের সাথে সাথে তাকে দুর্বল জেলে আর কৃষক ভেবে অবহেলা করা হবেনা, শুধুই মানুষ বলা হবে মানুষ। আর মানুষ মনে করে বেঁচে থাকার জন্য, হাওর উপকূলবাসীদের দু'বেলা দু'মোঠো অন্নের প্রয়োজন মিটাতে উম্মোক্ত জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের অধিকার দেয়া হবে।"

তাই গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে অসহায় জেলেদের পক্ষ থেকে আকুল আবেদন হাওর উপকূল বাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি আইন পাস করুন। জেলেরা যেন আশ্বিন মাস পর্যন্ত উম্মোক্ত জলাশয়ে হাওর থেকে মাছ ধরতে পারে।

No comments: