ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৫)

               ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৫)
                লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

(বুঝতে পারছি কিভাবে শুরু করবেন তা নিয়ে তিনি দ্বিধাবিভক্ত) অার দ্বিধাবিভক্ত হবেন নাই বা কেন? গারো সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষদের সংসারেক ধর্মই যে অাজ তার অধর্মপরায়ণ চরিত্রের পর্দা উন্মোচন করে দিতে চাচ্ছে। তিনি কি ঘূনাক্ষরেও অাঁচ করতে পেরেছিলেন, যে অাদিম সংস্কৃতির মারণাস্ত্র ব্যবহার করে তিনি অাজকের এই ফিলিপ গাইন, অাজ তারই ব্যবহার ও প্রয়োগজনিত ত্রুটির কারণে সেই অাদিম সংস্কৃতি -ই হয়ে উঠবে এতটা প্রতিশোধপরায়ন। তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন , সংসারেক ধর্মাবলম্বীদের অাদিম সংস্কৃতি তার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগের প্রতিশোধ নিতে অাজই এমনভাবে চড়াও হবে! না, বুঝতে পারেন নি। পারলে কখনই বলতেন না গারো সম্প্রদায় 'সংসারেক ধর্মাবলম্বী'। অার বুঝবেনই বা কি করে? কারণ সংসারেক ধর্মের অপব্যবহার তিনি এবারই তো প্রথম করেন নি! এর অাগেও বহুবার বহু অনুষ্ঠানে এই একটি মাত্র 'সংসারেক ' শব্দ দিয়ে বহু প্রশ্নের মুখে সিল গালা মেরেছেন। কারণ সভ্য মানুষের স্বত:সিদ্ধ ধারণায় গারো শব্দ নিজেইতো অাদিমতার প্রতীক। অার সেই গারোদের ধর্মের নাম যদি হয় "সংসারেক " তাহলে তো সে অাদিম হবেই। এখানে দ্বিমত পোষণের কোন সুযোগ নেই তো। এতো দুই -এ দুই -এ চার মেলাবার মত সহজ সমাধান। কিন্তু বাস্তবতা সেই সহজ সমাধানকেই অনেক সময় কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলে। তাছাড়া, অামরা দূর থেকে যা দেখি বা জানি তা কি সব সময় সঠিক হয়! যেমন অাজ যে গারোদের নিয়ে কথা হচ্ছে, সভ্য সমাজ যাদেরকে সেই প্রথম থেকে গারো বলে জেনে এসেছে, সেই সভ্য সমাজ কি জানে, তারা যাদের গারো বলে সম্বোধন করে অাসছে তারা মূলত গারো নয় মান্দি। এবং এই গারো নামটাও তাদের পছন্দের নয়। তারা এখনো চায় না মানুষ তাদের গারো বলে সম্বোধন করুক। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সারা পৃথিবীর তাবৎ মানুষ তাদের গারো বলেই চিনে। অথচ গারোদের মূল ধারা যারা গভীর শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে বসবাস করে সেই অাচিক বা অাচ্ছিকরা প্রচণ্ড তাচ্ছিল্য ভরে তাদের নামকরণ করেছিলেন - লামদামী । কেন করেছিলেন, সে প্রসঙ্গে পরে অাসছি। এই সম্বোধনে অাচিকদের যত তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞাই প্রকাশ পাক না কেন তারপরও তারা গারো নামে নয় লামদামী নামেই পরিচিতি পেতে বেশি পছন্দ করে। লামদামী শব্দের অর্থ মান্দি /মান্দাই যার অারেক অর্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারা তাদের মূলধারা অাচিকদের গালাগাল পছন্দ করলেও গারো নামে বিশ্ব সংসারে পরিচিত হতে চায় নাই। কেন চায় নাই ! 

কারণ, এই নামকরণে তাদের নিজেদের কোন হাত ছিল না । তারা মনেপ্রাণেই চায় নি, সম্বোধনের উছিলায় কেউ তাদের গারো নামে ডেকে বিজাতিদের মত তাচ্ছিল্য করুক। তারপরও তাচ্ছিল্যভরে চাপিয়ে দেয়া বিজাতিদের সেই ব্যঙ্গাত্মক গারো নামটি সিন্দাবাদের ভূতের মত দিব্যি তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কেন বেড়াতে হচ্ছে? কারণ খুব নিকট অতীতে তারা তাদের মূলধারা অাচিক এবং ইংরেজ বেনিয়াদের নৃশংস অাক্রমণ ও নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে গারো পাহাড় -থেকে পালাতে পালাতে অবশেষে অাত্মগোপন করেছে এই মধুপুরের সমতল ভূমিতে। তাই কেউ কেউ মনে করেন গারো পাহাড়ের নাম অনুসারে তাদের নামকরণ হয়েছে গারো; অাবার কেউ কেউ মনে করেন অাচিকদের অনমনীয়, দূর্দমনীয় ও একরোখা অাচরণের কারণে পাওয়া 'ঘাওড়া' নামের সাথে মিল রেখে বিজাতিরা ব্যঙ্গ করে তাদের নামকরণ করেছিল গারো। তাই অাচিকদের অবজ্ঞা সহ্য করলেও বিজাতিদের ব্যঙ্গ তারা মেনে নিতে রাজী ছিল না। কিন্তু কি অার করা! বাস্তবতায় অনেক সময় ২ অার ২ মিলে চার হয় না বলেই অনিচ্ছা সত্বেও সেই গারো নামের দূর্ভোগে তাদের পুড়তে হচ্ছে। অাজকে ঠিক তেমন করেই পুড়তে হচ্ছে ফিলিপ গাইনকে।তিনি বুঝে গেছেন, ২অার ২ মিলে চার হবার অাজ অার কোন সুযোগ নেই। তাই তিনি হাজারটা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে অাড়াঅাড়ি ভাবে পারি দিতে চেয়েছিলেন। অার সে কারণেই তিনি বলেছিলেন 'সংসারেক '। অথচ কি দুর্ভাগ্য, সেই সংসারেক ধর্ম অাজ বুমেরাং হয়ে তাকেই অাঘাত করতে উদ্যত। তিনি যদি এখন শতকরা হিশেবে সংসারেক ও খ্রিস্টানদের হিশেব টা বলেন তাহলে বিপত্তি শুধু বাড়বেই। কারণ তার শিক্ষার্থীরা জেনে যাবেন, তিনি পরম পূজনীয় শিক্ষক হয়েও একটা জলজ্যান্ত সত্যকে অাড়াল করতে গিয়ে জেনে বুঝে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তিনি সততা ও বিশ্বস্ততাকে বিসর্জন দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে 'সংসারেক' ধর্মকে সামনে এনেছেন। বুঝতে পারছি তিনি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাচ্ছেন। কিন্তু কিভাবে পাল্টাবেন তা গুছিয়েউঠতে পারছেন না। তিনি মনেপ্রাণেই চাচ্ছেন না তার শিক্ষার্থীদের সামনে সত্যটা প্রকাশ পাক । তিনি অাজকের এই অনির্ধারিত অনুষ্ঠানে জানাতে চাইছেন না, সংসারেক নয় মধুপুরের ৯৮% -এর বেশি গারো অাজ খ্রিস্টান। তিনি তার শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের মিথ্যাচারের সাক্ষী হতে চাইছেন না। তিনি কোন মুখে বলবেন, অবশিষ্ট প্রায় ২% সংসারেক ধর্মাবলম্বী গারোর নামাবলী পড়িয়ে কি অসততায় ৯৮% খ্রিস্টান গারোকে বৈতরণী পার করতে চেষ্টা করেছিলেন? তিনিতো জানেন এই ২% সংসারেক ধর্মাবলম্বী গারোর মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে কমল 'বা ঠাকুর, যারা ধর্মীয় অাচার অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করে গারো সমাজে মর্যাদাপূর্ণ অাসনে অবস্থান করতেন, বাকি অন্যান্যরা হচ্ছেন বয়োবৃদ্ধ গারো। যুবক যারা তারা মহান ইশ্বরের নামে তাতারা রাবুকাকে ছেড়ে চলে এসেছেন? তিনি ভালভাবেই বুঝতে পারছেন - এখানেই তো শেষ নয়। তারপর অারো প্রশ্ন উঠবে। অার সেই প্রশ্নের উত্তরে তাকে বলতে হবে - নব্য খ্রিস্টানদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরের বয়স কত? তাকে অারো প্রমাণ করতে হবে, ধর্মান্তরের সেই বয়স কি স্মরণাতীত কালের ' অাদিম সংস্কৃতি ' প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ? না তা হবার কোন সুযোগ নেই। কারণ মধুপুরের এই নব্য খ্রিস্টান গারোদের ধর্মান্তরিত হবার বয়স কমবেশি ৬০-৬৫ বছর।

জেনে রাখা প্রয়োজন, গারো পাহাড়ের পাদদেশের সমতল ভূমির গারো বসতিদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারীরা ছিল সমাজের সবচেয়ে অপাঙক্তেয় জন। তাই এদের ধর্মান্তর গারোসমাজে অাদৌ কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারছিল না । কিন্তু শিক্ষিত গারোদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাধানাথ ভৌমিক তার পূর্বপুরুষদের গারো সংস্কৃতি ও ধর্ম বিসর্জন দিয়ে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হলে শিক্ষিত গারো সমাজ ধর্মান্তরের প্রতি অতি ধীর গতিতে অাকৃষ্ট হতে শুরু করে।
এই ধীর গতির পিছনেও একটা কারণ অাছে। অাছে মর্মান্তিক ইতিহাস ।সেই ইতিহাস ইংরেজ বেনিয়াদের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার ইতিহাস। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা গারোদের ধর্মান্তরে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকদিন । সেই ধর্মান্তরের মন্থর ঢেউ অবশেষে মধুপুরে পৌছতে সময় নিয়েছিল প্রচুর। মোট কথা মধুপুরের গারোদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয় তারও অনেক অনেক পরে। অার এই ধর্মান্তর ত্বরান্বিত করণের মূল নায়ক ছিলেন ফাদার হোমরিক। তিনি জলছত্রে এসে ধর্মপ্রচার শুরু করার পর থেকেই ধর্মান্তরের চাকা গতি পায়। তার কৌশলী কর্মকাণ্ড ধর্মান্তর করণে সাফল্য এনে দেয় প্রায় শতভাগ।।
জানতে চাইলে তাকে তো এই তথ্যেরও অাদ্যোপ্রান্ত বলতে হবে। তিনি বলতেও পারবেন। কিন্তু প্রথমেই তিনি মিথ্যে বলে ফেঁসে গেছেন। নিজের বিছানো সেই মিথ্যের জাল ছিড়ে বেড়িয়ে অাসতে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠছেন তিনি ---চলবে----

No comments: