ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ--৬

                   ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ--৬
                    লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

  
(নিজের বিছানো মিথ্যের ---অস্থির হয়ে উঠেছেন তিনি) উদ্ভূত গুমোট পরিবেশ। তার মুখের অবস্থা হয়েছে দেখবার মত। যে উচ্ছ্বাস নিয়ে শুরু করেছিলেন তার লেশমাত্র এখন অার নেই। বন বিভাগকে বরাবরই কোনঠাসা করে অানন্দ পান তিনি। অাজও এসেছিলেন এক হাত নিবেন অাশায়। সেভাবে মনে মনে ছকও কেটেছিলেন। প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে স্বত:স্ফূর্তভাবে তা প্রকাশ করতেও তিনি কার্পণ্য করেন নি। তিনি ভেবেছিলেন, অসম এই যুদ্ধে জয় সুনিশ্চিত। তাই অাড়ম্বর করে অামার মত মূর্খ রেঞ্জারকে দাঁড় করিয়েছিলেন শিক্ষার্থীদের সামনে। অামাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ অাছে, যখন তাকে সম্মান দেখাবেন তখন সে ধরে নেবে বাধ্য হয়েই তা করছেন। স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বত:স্ফূর্তভাবে প্রদর্শিত সেই সম্মানকে ভাববে অাপনার দূর্বলতা। ফিলিপ গাইনের অাজকের অাচরণ তা অামাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। অামি বুঝতে পেরেছি, কদর কমে যাবার ভয়ে তিনি অামার অফিস কক্ষে ঢুকেননি। এমন কি বারান্দায় শিক্ষার্থীদের বসবার ব্যবস্থা না করা অবধি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সহকারী বন সংরক্ষকের অফিস কক্ষের সামনে। এ ছিল তার কদর রক্ষার যুদ্ধ।
তার এই অাচরণ অামাকে বুঝাতে চেয়েছে-তিনি বসলে সহকারী বন সংরক্ষকের রুমে বসবেন রেঞ্জ অফিসারের রুমে কেন?
অামি এখন তাকে তার কাঙ্খিত কদরের সম্পূর্ণটুকু উৎসর্গ করতে চাই। বক্তব্য স্বাভাবিক গতিতে চললে হয়তো সে সুযোগ কপালে জুটতো না। অামাকে মাঝপথে থামিয়ে তিনি সেই সুযোগটুকু করে দিয়েছেন। সুতরাং তাকে সম্মানিত করার এই সুযোগ অামি হাত ছাড়া করি কিভাবে! 

তিনি ভেবেছিলেন, সেই স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাসকারী অাদিবাসীদের কথা, তাদের অাদিম সংস্কৃতি কথা বলতে বললে অামি কোণঠাসা হয়ে পড়বো। অামার সেই অজ্ঞতা অার মূর্খামী নিয়ে তিনি তার মনের ঝাল মেটাবেন। শিক্ষার্থীদের সামনে অামাকে তুলোধোনা করে প্রমাণ করে দেবেন এতদিন বন ও বন বিভাগের বিষয়ে যা কিছু বলে এসেছেন তা একশত ভাগ ঠিক। এখন উল্টো হাওয়া বইছে। ফিলিপ গাইন উপর্যুপরি তিন চারটি ঢোক গিলে অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে বললেন -কামরুল, অামাদের হাতে তো সময় কম। এ সব নিয়ে অন্যদিন কথা হবে। এবার সাম্প্রতিক কালের কলা যুদ্ধ নিয়ে কিছু বলেন। বুঝতে পারছি তিনি তার বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে চাইছেন। তাই তার প্রিয় প্রসঙ্গ "অাদিবাসী ", "স্মরণাতীত কাল " অার "অাদিম সংস্কৃতি" থেকে বেড়িয়ে অাসতে চাইছেন। কি অাশ্বর্য! তিনি হচ্ছেন সেই ফিলিপ গাইন যিনি কি না "বাংলাদেশের বিপন্ন বনের" স্বনামধন্য লেখক। তিনি অাজ সেই বই -এর মূখ্য বিষয় সম্পর্কে অালোচনা করতে এসে নিজেই বিপন্ন বোধ করছেন। বড্ড করুণা হলো। অামি তাকে মূল প্রসঙ্গে ধরে রাখতে সহানুভূতির সুরে বললাম - বুঝতে পারছি, খ্রিস্টান অার সংসারেক ধর্মাবলম্বীদের শতকরা হিশেবটা এ মূহুর্তে অাপনার স্মরণে নাই কিন্তু অাদিবাসী অার অাদিম সংস্কৃতির কথাতো মনে অাছে? সংস্কৃতি কি তা তো অাগে বলেছেন । এবার "অাদিম সংস্কৃতি " প্রসঙ্গে কিছু বলুন। পাশাপাশি খ্রিস্ট্রিয় সংস্কৃতির কথা না বললেতো অালোচনাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অাসুন, অামরা শুরু করি। প্রাথমিক অালোচনা শেষ করেই অামি অাপনার কাঙ্খিত কলাযুদ্ধে ঢুকে যাবো। তিনি শেষ চেষ্টা হিশেবে অামতা অামতা করে বললেন - হাতে তো সময় কম। এখানেই যদি সময় শেষ করে দেই তাহলে পুরো প্রোগ্রাম তো শেষ করতে পারবো না। অামি অনমনীয় দৃঢ়তায় বললাম - কিন্তু এই অালোচনাও তো অাপনার প্রোগ্রামেরই অংশ। এখানকার অালোচনার যোগসূত্র ধরেই তো অাপনি অাপনার মাঠ পর্যায়ের বাকি প্রোগ্রাম সাজিয়েছেন ! এই অালোচনার গুরুত্ব অাছে বলেইতো অামার অাপত্তি সত্বেও অাপনি অামাকে বাধ্য করেছেন। এখন কি এমন হলো যার জন্য প্রথম পাঠ শেষ না করে অন্য পাঠে যেতে চাইছেন ? অাগে প্রথম ও দ্বিতীয়তলার সিঁড়ি ডিেঙাই তারপর নাহয় তৃতীয় তলায় উঠবো। ভিতরের অস্থিরতা তার চেহারায় গাঢ়তর হচ্ছে। টকটকে ফর্সা মুখে তার ছাপ সুস্পষ্ট। মোট কথা, এখন তার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। বড্ড করুণা হলো। অালোচনায় বসার অাগে যেভাবে তিনি অামাকে অভয় দিয়েছিলেন, অাশ্বস্ত করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে অামি তাকে অাশ্বস্ত করার জন্য বললাম -অাপনি অযথা দু:শ্চিন্তা করছেন ? অামি তো অাপনার সাথে অাছি। অনুমতি দিলে অাজকের পুরো অনুষ্ঠান অামি অাপনার সাথে থেকে উপভোগ করতে চাই, অামি অামার সাধ্যমত অাপনার, অাপনার শিক্ষার্থীদের প্রতিটা প্রশ্নের জবাব দিতে চাই। অামি এমন একটা ভয়ঙ্কর প্রস্তাব দিতে পারি তা তিনি কল্পনাই করেন নি। এই মুহুর্তে তিনি পুরোপুরি বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত। ভাবতে অবাক লাগছে, যে অাদিবাসী নিয়ে তিনি এত উদ্বিগ্ন, স্মরণাতীত কাল থেকে চর্চা করে অাসা যে "অাদিম সংস্কৃতি" রসাতলে গেল বলে দু:শ্চিন্তা অার দূর্ভাবনায় তার নাওয়া খাওয়া বন্ধ, এখন কি না সেই অালোচনাতেই তিনি অার সময় দিতে চাইছেন না। কেন চাইছেন না ? কারণ, তিনি বুঝে গেছেন - প্রস্তাবনার ভুল তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। সাত অার পাঁচে চৌদ্দ বুঝিয়ে এ যাবৎকাল তিনি যে সুবিধা উপভোগ করে এসেছেন এই মুহুর্তে তার অার সেই সুযোগ নেই। অামার বিশ্বাস, তিনি বুঝে গেছেন, তার মতো অামিও জানি, এই মুহুর্তে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি যে পরগণার মাটিতে দাঁড়িয়ে অাছেন ষোড়শ শতাব্দীতে মোগল সম্রাট মহামতি অাকবর তার নাম রেখেছিলেন পুখুরিয়াবাজু। ধনবাড়ির ইস্পিঞ্জর খা ও মনোহর খা মাত্র ১৭,১৫,১৭০ দামে এই পরগণা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এখনো এই পরগণার নাম পুখুরিয়া। তখনও এই বনে ছিল প্রচুর শাল গাছ। অার এই গড়ের নাম ছিল জয়েনশাহী গড়। (মোগল শাসনামলে প্রচলিত মুদ্রার নাম ছিল 'দাম'। প্রতি চল্লিশ দামে ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানী বিনিময় করতো মাত্র এক টাকা )। হযরত পীর জয়েন শাহ (র) ছিলেন একজন সাধক পুরুষ। সম্রাট হুমায়ুনের অামলে ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এই এলাকায় এসেছিলেন। এইখানে এই রসুলপুরের মাটিতেই রয়েছে তার মাজার শরীফ। যে গারোদের নিয়ে হাল অামলে এত কূটকচাল তারাও তাদের সংগঠনের নাম রেখেছেন সেই সাধক পুরুষের নামে। " জয়েনশাহী অাদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ", প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ -এখনো তার সাক্ষ্য বহন করে চলছে। এ কারণেই অামার অনমনীয় দৃঢ়তা দেখে তিনি প্রমাদ গুণলেন। অার গুণবেন নাই বা কেন? তিনি তো বুঝে গেছেন, কম করে হলেও অামি জেনে গেছি - সংসারেক ও খ্রিস্টধর্মে সংস্কৃতিগত কোন মিল নেই। এমন কোন সূত্র নেই যা দিয়ে এই দুই ধর্মের সংস্কৃতিকে একসাথে গাথা যায় ? হ্যা, এ কথা ঠিক -ধর্ম নিয়ে মতভেদ থাকেই। খ্রিস্টান ধর্মেও অাছে। কেউ রোমান ক্যাথেলিক তো কেউ প্রোটেস্টান। প্রোটেস্ট্যান্টরা বলে পবিত্র বাইবেল হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ বিধান কিন্তু রোমান ক্যাথলিকরা বলে না না, বাইবেলের পাশাপাশি ঐতিহ্যগত রোমান অনুশাসনকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রোটেস্ট্যান্টরা বলে, যীশুখ্রিস্টই হচ্ছেন সকল চার্চ্চের প্রধান অপরদিকে রোমান ক্যাথলিকরা বলে না না পোপই হচ্ছে সকল চার্চ্চের প্রধান। প্রোটেস্ট্যান্টরা সাধুসন্তদের বিশ্বাস করে কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে না অাবার রোমান ক্যাথলিকরা ইশ্বর ছাড়াও সাধুসন্তদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে। সাদা চোখে দেখলে মনে হয় পার্থক্য তেমন কিছু নয় কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে যোজন যোজন ফারাক। অথচ তারা উভয়েই বিশ্বাস করেন স্বয়ং সর্বশক্তিমান ঈশ্বর শুন্য থেকে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, এ জন্য তাকে কারো সাহায্য নিতে হয় নি। তিনি মানব কল্যাণেই নিজ পুত্র যীশুখ্রিস্টকে এই জগত সংসারে পাঠিয়েছেন। তিনি মানুষের জন্য বানিয়েছেন এই সুন্দর পৃথিবী । গাছপালা, লতাপাতা, পশুপাখি,সব কিছু দিয়ে তিনি অপরুপ সাজে সাজিয়েছেন এই পৃথিবীকে । তিনি অনেক যত্ন করে তার প্রিয় মানুষকে দিয়েছেন বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি। তিনি অাশা করেন তার ( ইশ্বরের) গৌরব ও মানুষের সেবাকর্মের মাধ্যমে তারা তার সদ্ব্যবহার করবে। মানুষের সেই সেবা কর্মই প্রমাণ করবে ঈশ্বরের প্রতি তার প্রেম। ঈশ্বরের প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম পালনের মাধ্যমেই তারা তাকে সন্তুষ্ট করবেন। তবেই না মৃত্যুর পর তার অাত্মা স্বর্গে যাবে, ভোগ করবে অনন্ত সুখ অার অনন্ত জীবন। উভয়ের বিশ্বাসে কোন তফাৎ নেই কিন্তু সেই সেবা কর্ম ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। অার এই ফারাক তাদের সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন, মানসিক তৎপরতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ যাবতীয় অানুষ্ঠানিকতা পালনে উভয়ের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিয়েছে। তাইতো তারা খ্রিস্টান হওয়া সত্বেও তাদের জীবনাচরণ, ধর্ম পালন, সামাজিকতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা সংস্কৃতিগত তফাৎ অনেক। একই ইশ্বর, একই যীশুখ্রিস্টের অনুসারী হওয়া সত্বেও যদি সাংস্কৃতিগত পার্থক্য উভয় বিশ্বাসীর মাঝে দেয়াল তুলে দেয় তাহলে সংসারেক ধর্মের সাথে খ্রিস্টধর্মেরহ সংস্কৃতিগত পার্থক্য কতটুকু তা কি মিলিয়ে নেয়া উচিৎ নয় ? কারণ সংসারেক ধর্মের প্রধান দেবতা হচ্ছে তাতারা রাবুকা। যাকে দেবাদিদেবও বলা হয়ে থাকে । সেই তাতারা রাবুকা ইচ্ছে করলেন পৃথিবী বানাবেন। যে ইচ্ছে সেই কাজ --চলবে----
                                                               লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

No comments: