আউটসোর্সিংয়ের স্বর্ণদুয়ার

জুড়ী টাইমস সংবাদ: ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি। এই সমস্যায় নিয়ে আমি ও আমার পরিবার যখন টানাপড়েনে পড়ি তখন সরকারের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পে আবেদন করে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর বিনা মূল্যে ৫০ দিনের কোর্সটি করি। প্রশিক্ষণ চলাকালে আমি প্রথম এসইওর মাধ্যমে ২৫ ডলার আয় করি। বর্তমানে আমি বিদেশি কাজের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু ডাটা-এন্ট্রির কাজও করছি। এখন আমি ভালো আয় করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। কথাগুলো বলছিলেন আমিনুল ইসলাম। সরকারের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংসহ নানা উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ পেয়ে আউটসোর্সিংয়ে সফল তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চড়া মূল্যের ধীরগতির ইন্টারনেট, লোডশেডিংসহ নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে গ্রামীণ শিক্ষিত তরুণরা এ কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, আত্মবিশ্বাস অর্জন করছেন। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণকে প্রশিক্ষণ ছাড়াও দেওয়া হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং অ্যাওয়ার্ড। তাঁদের মাধ্যমে অনুপ্রাণিতও হচ্ছেন অনেকে। রাজবাড়ীর কলেজ শিক্ষার্থী মোস্তফা চৌধুরী তামিম। 

ছোটবেলা থেকে প্রযুক্তির প্রতি প্রেম থেকে ফ্রিল্যান্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সরকারের ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে তামিম এখন পুরোদস্তুর ফ্রিল্যান্সার। নিজের বেকারত্ব ঘুচিয়ে সংসারে সচ্ছলতা এনে দিয়েছে তাঁর আউটসোর্সিং দক্ষতা। মোস্তফা চৌধুরী তামিম বলেন, ‘এখন আমি সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, গুগল অ্যানালিটিকস, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও গুগল অ্যান্ডসেন্স নিয়ে কাজ করছি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমি শুরুতে ৩০ ডলার আয় করেছিলাম সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং থেকে। এখন ২০০ ডলার আয় করছি। আমরা স্বপ্ন দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে একটি কমিউনিটি গড়ে তোলা। ’
 
আউটসোর্সিংয়ে এগিয়ে আসছেন নারীরাও। ঢাকায় লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ে গ্রাফিকস ডিজাইনের প্রশিক্ষণ নেওয়া তাসমিন নাহার বলেন, ‘পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরে গত জানুয়ারিতে ৫০ দিনের গ্রাফিকস ডিজাইনের ওপর ফ্রি কোর্স করি। এই কোর্সটি শুধু ক্লাসরুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমরা সারাক্ষণ ব্যাচের সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছি। কোর্স শেষ করার পর অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইবারে অ্যাকাউন্ট খুলি। আমার প্রথম কাজ ছিল ১৫ ডলারের। এখন আমি ভালো আয় করছি। ’

নানা সমস্যার মধ্যেও দেশের ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ১৮০ কোটি টাকার লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প বেশ আশা জাগিয়েছে বলে জানান প্রকল্পের পরিচালক মির্জা আলী আশরাফ। এরই মধ্যে দেশব্যাপী এক হাজার ব্যাচে ২০ হাজার যুব ও যুব মহিলাকে বেসিক আইসিটি লিটারেসি বিষয়ে ১৫ দিন, বেসিক আইসিটি আউটসোর্সিং বিষয়ে ৫৮টি ব্যাচে দুই হাজার ৯০০ জন, স্পেশালাইজড আউটসোর্সিং বিষয়ে ৮৪০ জনকে ১০ দিন, ৬৪ জেলায় ৬৪টি ব্যাচে এক হাজার ৯২০ জন গণমাধ্যমকর্মীকে আইসিটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ৫০ দিনব্যাপী প্রফেশনাল আউটসোসিং প্রশিক্ষণে প্রতি জেলায় ৬৫০টি ব্যাচে ১৩ হাজার জন যুব ও যুব মহিলাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ হিসেবে গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে ফ্রিল্যান্সার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রায় শেষের পথে। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৫৪৪ জন প্রশিক্ষণার্থী ফ্রিল্যান্সার চার লাখ ১৯ হাজার ৪৬১ ডলার আয় করেছেন বলেও তিনি তথ্য দেন। আলী আশরাফ বলেন, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট—এই তিনটি বিষয়ে ৫০ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থীরা যদি মাসে ২৫০ ডলার করে আয় করতে সক্ষম হন তাহলে তাঁরা একটি চাকরির সমমানের আয় করবেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটি শুরু হয়। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দুই মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান ও পাঁচ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। 

প্রকল্পের সাফল্য তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছেছে উল্লেখ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক বলেন, ‘বহির্বিশ্বে অনেক কাজ থাকলেও পর্যাপ্ত লোকবল নেই। চাহিদার এই সুযোগটি কাজে লাগানোর মোক্ষম সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। ’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ও তাঁর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সার্বিক পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য আমরা লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। আমি আশাবাদী, তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নকে আমরা সঠিকভাবেই এগিয়ে নিতে সক্ষম হব। ’ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। অনেকে বিদেশে কায়িক শ্রম দিয়ে দেশে টাকা পাঠায়। এখন আর অতিরিক্ত শারীরিক শ্রম দিয়ে আয় করতে হবে না। মেধা দিয়ে আয়ের পথ সুগম করতেই লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ’

আউটসোর্সিং খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইন কাজে ‘ফ্রিল্যান্সার’ সরবরাহে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্বের মোট বাজারের ১৬ শতাংশ বাংলাদেশ দখল করতে পেরেছে। সবচেয়ে বেশি ‘শ্রমিক বা ফ্রিল্যান্সার’ সরবরাহ করে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ভারত। তাদের দখলে ২৪ শতাংশ বাজার।   সম্প্রতি ই-প্ল্যাটফর্মের ডাটা বিশ্লেষণের রিপোর্টে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। 

জানা যায়, বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসের মধ্যে অন্যতম আপওয়ার্কডটকম, ফাইভার, ফ্রিল্যান্সারডটকম। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত ডাটা এন্ট্রি ও এসইও, এসইএম, এসএমএমের কাজ বেশি করে থাকেন। এ ছাড়া ওয়েবসাইট ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, রাইটিং, গ্রাফিকস ডিজাইনসহ অন্যান্য কাজও করে থাকেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য) সভাপতি ও ডিজিকন টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদ শরীফ বলেন, ‘বাংলাদেশে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যেখানে আয় হচ্ছে ১৮০ মিলিয়ন ডলার। বিপিওতে আমাদের অনেক সম্ভাবনা সত্ত্বেও আউটসোর্সিংয়ে নেতৃত্বদানকারী এই খাতে ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। তবে তাদের কাজের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বেশি থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশ প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করতে পারবে। ’ ওয়াহিদ শরীফ মনে করেন, বিশ্ববাজারের পাশাপাশি দেশি বাজারের দিকে আরো নজর দেওয়া দরকার। দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি নানা সেবা ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। এর ফলে দেশীয় কাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে টাইগার আইটি, দোহাটেকের মতো কম্পানির অনেকেই বিদেশেও বড় বড় কাজ করতে পারবে।  

১৪ বছর আগে মাত্র একজন কর্মী দিয়ে ফারহানা রহমান নিজের বাসার ড্রয়িংরুমে আউটসোর্সিং কম্পানি ‘ইউওয়াই সিস্টেম’ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এখন সেখানে কাজ করছে বেশ কিছু তরুণ-তরুণী। ‘শুরুতে একটি আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের কাজ পাই। এরপর আস্তে আস্তে কাজের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের কলেবরও বাড়ে। বিদেশে আমরা সাড়ে তিন হাজার ই-কমার্স ওয়েবসাইট করে দিয়েছি। এ ছাড়া ইউরোপের সাত হাজার ওয়েবসাইটকে আমরা রেসপনসিভ করেছি। ’ বললেন বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংয়ে সফল এই নারী উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাধা দক্ষ জনবলের অভাব। আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নেই। বিশ্বের বড় কোনো প্রতিষ্ঠান বড় কাজের প্রতিশ্রুতি দিলেও আমরা তা করতে পারছি না। ’

এদিকে আউটসোর্সিং ছাড়াও প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ছে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, প্রগ্রামিং, ই-কমার্স, এফ-কমার্স, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, গেইম ডেভেলপমেন্ট, ডাটা এন্ট্রি, কল সেন্টার, ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ নানা খাতে। শুধু ই-কমার্সে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানালেন ই-কমার্স কম্পানি আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, দেশে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে ই-কমার্স উদ্যোগ। একটি ই-কমার্স কম্পানিকে ঘিরে অনেক ধরনের সহায়ক পেশার সৃষ্টি হচ্ছে। ই-কমার্স, এফ-কমার্স মিলে দেশে ২০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে বলেন জানান তিনি।

No comments: