ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৮)

ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৮)                            লেখক:মো:কামরুল মোজাহীদ                                                            (তাহলে এই ধর্মতত্বের পার্থক্যের কারণটুকুও অাগে জেনে নিতে হবে) তারও অাগে জানতে হবে এই জনগোষ্ঠীর অাদিপুরুষদের কথা। যারা ছিলেন অাপোষহীন, দূর্দান্ত, দূর্দমনীয়, একরোখা ও একগুয়ে প্রকৃতির। এইতো সেদিনের কথা। পরগণাজুরে তখন ভয়ঙ্কর অরাজক অবস্থা। জমিদারদের জুলুম অার বিদ্রোহী প্রজাদের দ্বন্দ্ব -বিবাদে ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর অবস্থা তখন ত্রাহী মধুসুধন । অবশেষে নিরুপায় কোম্পানী দ্রুত অাইনী পদক্ষেপ গ্রহণের সুবিধার্থে ময়মনসিংহকে জেলা ঘোষণা করলেন। ১ মে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দ। প্রথম কালেক্টর বাহাদুর হিশেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন মি: ডবলিউ রটন। তিনি ছিলেন অনেকটা সহজসরল প্রকৃতির মানুষ। তারপরও তার কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হলো জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট -এর অতিরিক্ত দায়িত্ব। অশান্ত পার্বত্য অঞ্চলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় তখন চলছে অরাজক কাণ্ড। এমন উন্মাতাল অবস্থা সামাল দেয়ার মত চারিত্রিক দৃঢ়তা তার ছিল না। তারপরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অাইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তিনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু পার্বত্য এলাকা বলে কথা ? তিনি তার সমস্ত মেধা এবং শ্রম নিয়োগ করেও গারো পাহাড় ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার অাইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অানতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। 

ঠিক এই সময় সুসঙ্গ পরগণায় রাজত্ব করতেন রাজা রাজসিংহ। দক্ষ রাজা হিশেবে যথেষ্ট খ্যাতি ছিল তার। কিন্তু হলে কি হবে, তাকেও সন্তুষ্ট থাকতে হতো সমতলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর রাজস্বাদি নিয়ে। এইটুকু রাজস্ব থেকে কোম্পানীর দেনা শোধ করতে যেয়ে তার নাভিশ্বাস উঠে যায় । অথচ তার রাজ্যের বৃহৎ একটা অংশই হচ্ছে এই পার্বত্য এলাকা। এই পার্বত্য অঞ্চল ছিল ত।র চোখে দু:স্বপ্নের মত। শত সাধ্যসাধনা সত্বেও এই পার্বত্য জাতির কাছ থেকে রাজস্ব অাদায়ের পরিমাণ ছিল শুন্যের কোঠায়। অাচিক মান্দিদের কাছ থেকে রাজস্ব অাদায় করা? সে ছিল সোনার পাথর-বাটির মত। বাধ্য হয়ে তিনি দ্বারস্থ হয়ে ছিলেন কালেক্টর বাহাদুরের কাছে । অাশু প্রতিকার চেয়ে সবিস্তারে বর্ণনা করলেন সব। কিন্তু ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানী রাজার রাজস্ব অাদায়ের ব্যর্থতার দায় বইবে কেন? তারা চাইলেন রাজার ঝামেলা রাজাই সামলাক। কিন্তু পরিস্থিতি এমন অাকার ধারণ করলো যে রাজার রাজত্ব রক্ষা করাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। মরিয়া হয়ে তিনি ছুটলেন উর্ধতন মহলের দরবারে। তারা অাদ্যপ্রান্ত সব শুনলেন। অবস্থা বিবেচনা করে তারা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভাবলেন, এও কি সম্ভব? এরচেয়ে কত কঠিন কঠিন পরীক্ষা তারা উৎড়িয়ে এসেছেন।অথচ সামান্য এই গণ্ডমূর্খ নিরক্ষর অাচিক জনগোষ্ঠী ! তারাই কিনা ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন খোদ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীকে। তাদের এতবড় ধৃষ্টতা কি সহ্য করা যায়? অাচিকদের এই দু:সাহস ইংরেজ বেনিয়াদের অহমিকায় প্রচণ্ড অাঘাত হানে। তারা স্তম্ভিত হয়ে ভাবেন, কারা এই অাচিক মান্দি ? কি তাদের পরিচয় ? কোথা থেকে পায় তারা এতো দু:সাহস? তারা কি জানেনা -ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী কি? তারা কি শুনেন নি - সুদুর লণ্ডন থেকে ভাসতে ভাসতে নেমে অাসা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ইংরেজ শুধুমাত্র বুদ্ধির জোড়ে অাজ এ দেশেরই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। শুরুতে তাদের কি ছিল? না ছিল লোকবল? না ছিল জন সমর্থন? তারা শুরু করেছিল একেবারে শুন্য থেকে। ভাবতে গেলে মনে হয় সে ছিল একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। অথচ তারা কি প্রমাণ করে দেন নি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কূট- নৈপুণ্য দ্বারা সাফল্যকে নিয়ে এসেছেন হাতের মুঠোয়।তারাতো দেখিয়ে দিয়েছেন - তাদের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। অার এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে গিয়ে তারা পারে না এমন কোন কাজ এই জগত সংসারে নাই! তারা কি শুনেন নি এই সাফল্যের পিছনে যত না বল প্রয়োগ করা হয়েছে তারচেয়ে কয়েক হাজারগুণ বেশি খরচ করেছেন -বুদ্ধি। তারা কি চোখে অাঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন নি, শুধুমাত্র বুদ্ধি, সাহস অার সীমাহীন ধৈর্যের জোড়েই তারা কেড়ে নিয়েছিলেন বাংলার মসনদ। তাদের এই বুদ্ধি বুদ্ধি খেলার কূটকৌশলে গো হারা হেরেছিলেন দিল্লীর সম্রাট। বাংলার মসনদ দখলের সংবাদ শুনেই অানন্দে লাফিয়ে উছেছিলেন চৌদ্দ হাত। ভেবেছিলেন এ জয় ইস্টইণ্ডিয়া কোম্পানীর নয় এ জয় খোদ দিল্লীর জয়। তাইতো জয়ের নায়ক লর্ড ক্লাইভকে ঘটা করে উপাধি দিয়েছিলেন - সাবুদে জঙ্গ অর্থাৎ সমরে শক্ত।

দিল্লির এই মূর্খামীতে বগলদাবিয়েছিলেন লর্ড ক্লাইভ। অার অল্প সময়ের ব্যবধানেই তার উত্তরসূরীরা দিয়েছিলেন যোগ্য প্রতিদান।তাইতো কালবিলম্ব না করে তিলতিল করে জমা হতে থাকা সব দেনা বুঝে নিয়েছিলেন কড়ায়গণ্ডায়। স্বল্প ব্যবধানেই ব্যবসার ঠুলি চোখে বেধে সেই বেনিয়ারাই কেড়ে নিয়েছিলেন দিল্লির সিংহাসন। তারা তো এখনো সেই ইংরেজ বেনিয়াই রয়ে গেছেন । তাহলে হলোটা কি,। তারাতো বহু অাগেই প্রমাণ করে দিয়েছেন ব্যবসা এবং রাজনীতি এই দুই ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ হবার ক্ষমতা এবং যোগ্যতা কারোরই নেই। তাহলে অাচিক মান্দিরা এমন বেপরোয়া হয় কিভাবে? বেনিয়া তারা। ব্যবসা কি ভাবে করতে হয়, তাদের চেয়ে ভাল অার কে বোঝে? তাদের হচ্ছে জহুরীর চোখ। মনিমুক্তা খুঁজে বেড় করায় তাদের জুড়ি নেই। তাইতো জাকিয়ে বসতে না বসতেইহ তারা জেনে গেছেন গারো পাহাড় হচ্ছে সম্পদের খনি। অার এই খনিতে উৎপন্ন হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের তুলা। যে করেই হোক এই তুলা তাদের চাই-ই চাই । পাশাপাশি রয়েছে রাজস্ব অাদায়ের বিপুল সম্ভাবনা। অথচ সেই খনি থেকে সম্পদ অাহরণের প্রধান প্রতিবন্ধক এখন অাচিক মান্দি। তাদের অাস্পর্ধা দেখে সিদ্ধান্ত নেন, এমনভাবে অাচিক মান্দিদের মেরুদণ্ড ভাঙবেন যেন ভবিষ্যতে অার কখনো এ হেন দু:সাহস দেখাবার দু:স্বপ্ন দেখতে না পারে। রাজ্যের বিরক্তি অার অসন্তোষ নিয়ে সামান্য এই প্রতিবন্ধক ডিঙানোর কৌশল নির্ধারণী সভায় মন্ত্রণাকক্ষে বসলেন সব ইংরেজ সাহেব । অশিক্ষিত, মূর্খ, জাতিগত দ্বন্দ্ব-সংঘাতে দল উপদলে বিভক্ত মান্দিদের দমনের কৌশল নির্ধারণে ত্বড়িৎ সিদ্ধান্ত নিলেন যেনতেনভাবে। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন - এ অার তেমন কঠিন কি? কিন্তু তাদের সেই ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগে নি। তারা বুঝে ফেললেন তুলা অার রাজস্বের এই মূল্যবান খনি যত লোভনীয়ই হোক তা থেকে সম্পদ অাহরণ করা তারচেয়েও হাজার হাজার গুণ কঠিন! এই প্রথম তারা বুঝতে পারলেন শক্ত প্রতিপক্ষ কাকে বলে! পিছন থেকে ছুড়ি মেরে অভ্যস্থ সাহেবরা এই প্রথম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার তিক্ত স্বাদ অাশ্বাদন করলেন। অচিরেই তারা বুঝতে পেরেছিলেন - অাচিক মান্দিদের নিয়ে তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে তারা কতটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন -অাচিক মান্দিরা হচ্ছে নিরক্ষর মূর্খ জাতিগোষ্ঠী। অভাব দারিদ্রের সাথে তাদের নিত্য সহবাস। সামান্য লোভে যদি মূর্শিদাবাদের ক্ষমতাবান সম্পদশালীরা তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বাবুয়ানা করার দিবাস্বপ্ন দেখে ক্রীতদাস হয়ে থাকেন তাহলে এই অভাবী জাতির সামনে দু মুঠো খুদ ছিটোলেই তারা বর্তে যাবে। তাই তারা প্রলোভনের দাওয়াত নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। গারোদের পছন্দের তালিকা তৈরি করলেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যউপাত্য যাচাই করে তারা দেখতে পেলেন , একমাত্র মদই হচ্ছে গারো জনগোষ্ঠীর সামাজিকতা, সর্বপ্রকার অাচার-অাচরণ, উৎসব পার্বন অনুষ্ঠানের অন্যতম অনুষঙ্গ।। এখন প্রশ্ন হলো এই মদ তারা কোথায় পায় ? খোঁজ নিয়ে জানা গেল - এই মদ তৈরি করা তাদের জন্য কোন বিষয়ই না। এই মদের জন্য তাদের কারো দ্বারস্থ হবারও প্রয়োজন নেই। নিজেরাই নিজেদের চাহিদা মত ঘরে বসে বানায় মদ।তারা সাধারণত তিন প্রকারের মদ বানিয়ে থাকে ১)হাণ্ডি চু বা হাংগি চু ; ২) স-অা-চু ও ৩) অালু-শিকর-ফুল-ফলের চু। চু শব্দের অর্থ মদ। অার এই মদ তারা পান করে দলবদ্ধভাবে। মদ্যপানের এই পর্বকে তারা বলেন "চু রিংঅা" পর্ব। তারা মনের অানন্দে এই " চু রিংঅা" *১পর্বে বসে মদ্য পান করে, "খাজি" *২ খান অার মাদল বাজিয়ে 'দং 'ও 'লাঁগড়ে ' *৩ গান গাইতে গাইতে অানন্দে অাত্মহারা হয়ে নারীপুরুষ দলবদ্ধভাবে নৃত্য পরিবেশন করে। ---চলবে ---
*১"চু রিংঅা"= জমায়েত হয়ে সমবেতভাবে নারী-পুরুষের মদ্য পানের অনুষ্ঠান।
*২''খাজি"=মদের সাথে যে সকল খাদ্যাদি গ্রহণ করে থাকেন যেম -ফড়িং পুড়া, শামুক সিদ্ধ ইত্যাদি।
*৩" 'দং' ও লাঁগড়ে'"= অাচিক মান্দিদের অাঞ্চলিক গান
                                                                   লেখক:মো:কামরুল মোজাহীদ  

No comments: