গেন্দির ইতিকথা

গেন্দির ইতিকথা
লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

সমাজের অতি পরিচিত এ সকল নির্যাতিত শিশু অাদৌ কখনো ন্যায় বিচার পায় কি? এর সহজ উত্তর হচ্ছে - না। অথবা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় এই সকল অসহায় শিশুরা ন্যায় বিচার বঞ্চিত। লোক কবিতাটি তেমনি একজন নির্যাতিত মাতৃহারা শিশুর অাত্মকথন। বন্ধুদের অনেকেই এই কথ্য ভাষার কতিপয় শব্দের সাথে পরিচিত নন তাই প্রথমেই তার কিছু প্রকৃত অর্থ তুলে ধরতে চেষ্টা করলাম। ইতোপূর্বে "বুজি" লোককবিতাটি এই "গেন্দির ইতিকথা " লেখার প্রেরণা বলতে পারেন। বন্ধুদের ভাল লাগলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশু, কিশোর বা মানুষদের লোককবিতায় উপস্থাপনের প্রেরণা পাবো। শব্দ সংগ্রহে সহযোগিতা প্রদানের জন্য বন্ধুবর অাব্দুল কাদেরের কাছে ঋণি হয়ে রইলাম।
প্রকৃত অর্থ
------------
নিত্তি- প্রতিদিন। হাছা - সত্য। কছে - বলতো। মোধ্যে - মাঝে। কোনে - কোথায়। মুড়া - পার্শ্বে। নিগা- জন্য। গুতায় - মারে। নাত্তি - লাথি। হাইপট্যা - জড়াইয়া। ডেনা - হাত। চেঙ্গা দেয়া - ঢিল ছোড়া। চোক- চোখ। বেবাক- সকল। হুন-শোন। চাইরমুড়া -চারিদিক।
নগে - সাথে। তাফাল- উগ্র। বলকাইয়া - উতরানো। কেমরে কেমরে- ক্রমে ক্রমে।
থিকা- হতে। সোত - স্রোত। থিকথিকা-বিশ্রি রকমের। ধরায় - পাঁচ সের। চিক্কুর- চিৎকার। দাফরানো - ছটফট করা। নাগলি - লাগলো। ব্যারহম- বেরহম।নম্বা -লম্বা। ঢেলা ঢেলা -বড় বড়। হগলে - সকলে। একদুল্লা - একটুও। অাইটাযুটা- উচ্ছিষ্ট।

গেন্দির ইতিকথা
---------------
মা রে!
অামি নিত্তি তরে খুঁজি !
হাছা কইরা কছে
অাকাশ বুঝাই তারা।
তার মোদ্যে তুই কোনডা ?
তুই যহন যাবিই, তহন অাকাশের কুন তারার কুন মুড়া থাকপি
অালসি ভাইঙ্গা তা অামারে দেহাইয়া যাবি না ।!
এই অালসিডাই তরে খাইছে।
হের নিগা বাজান তো তরে কম গুতায় নাই!
মনে অাছে মা !
বাজান যেদিন চুলের মুঠি ধইরা তর বুকের মোদ্যে নাত্তি দিল
অামি তহন তরে বাঁচাবার চাইছিলাম।
হাইপট্যা ধরছিলাম গলা।
ডেনা ধইরা টাইনা তুললো বাজান।
অসুরের শক্তিতে দিল এক চেঙ্গা।
উইড়া গেলাম অামি।
ঠাস কইরা মাতাডা পড়লো ডোয়ার উপুর।
অার কিছু মুনে নাই।
যহন চোখ মেইল্যা দেকলাম
তহন উঠান বোঝাই মানুষ!
ছোড চাচী তর মাথাত পানি ঢালতাছে। জ্যেঠির কোলে অামি
গাওমাথা ভিজা চপচপা।
জানোস মা, তর কষ্ট দেইখ্যা কাইন্দা বুক ভাসাইতাম
কিন্তু তর হেই কষ্টডা কেমুন তা বুঝি নাই।
তবে অহন অামি বুঝি!
তার অাগে ক, তারা অইয়া তুই কি অামারে দেহছ !
যেমনি কইরা অামি তরে খুঁজি
তেমনি কইরা তুইও কি অামারে খুঁজস!
তরে খুব দেখবার মন চায়রে মা!
কষ্টে যহন দুই চোক অান্ধার অইয়া অাহে
মুনে অয় অাপন বইল্যা অামার অার কেউ নাই
তহন ছাদে উইঠ্যা অাকাশের নিচে খাঁড়াই
যেমনি কইরা রোজার মাসের চাঁন খুঁজতাম
ঠিক তেমনি কইরা খুঁজি।
কিন্তু তারা তো তারাই -
বেবাকটিরে এক বইলা মুনে অয়।
তাইলে তুই কোনডা,?
খুঁজতি খুঁজতি জান বাইর অইয়া যায়।
মা রে, যারে তুই কইলজার টুকরা কইতি
বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধইরা অাদর করতি
কুন পরাণে তারে একলা থুইয়া নাচতি নাচতি বেস্তে গেলি?
কি ? উত্তুর দিবি না!
না কি চিনবার পারোস নাই।
এই যে, এহানে অামি।
তর অাদরের মেয়্যা গেন্দি।
যার বাপ নইমুদ্দি, গেরাম গালা।
অহন হুন -
হেই যে অাষাঢ় মাস , চোত্তুরমুড়া থৈথৈ পানি।
পথম যেদিন লৌহজং -এ পানি অাইলো
হেদিন গাও ভাইঙ্গা গেছিল দেখতি।
তগো নগে অামিও গেছিলাম।
বা-বা-রে ! পানির সে কি তাফাল!
মাটি গুলাইন্যা রং,
অজগর সাপের লাগান কইলজা কাপাইন্যা পাক দেয়।
বলকাইয়া বলকাইয়া ভীষণ ত্যাজে ছোটে
ঠিক য্যান মোল্লাবাড়ি গো ষাঁড়।
হেইডা দেইখ্যা বেবাকে কত খুশি।
হেই পানি কেমরে কেমরে নদী থিকা খালে
খাল থিকা দাগে,
দাগ তলাইয়া উঠান
হ্যাষে তো ঘরের চাল ছুঁই ছুঁই।
তুই তো পটপটাইয়া এক পোটলার মধ্যে পুড়া সংসার বাইন্দা ফালাইলি।
থাকার মদ্যে পইরা রইল দুইডা মাইট্যা হাড়ি।
অামার মাতায় বেবাক ঘষি অার হোলা দিয়া কইলি-
নু যাই তাড়াতাড়ি নু,
নইলে কইল জায়গা পামু না।
প্যাট নিয়া তহন তুই নিজেই অাটপার পারোস না
হেরমোদ্যে এক অাতে অামি অার অন্য অাতে পোটলা।
হেই কোমর সমান পানি, হায়রে স্রোত!
মেলা যুদ্ধ কইরা পারে অাইলাম ।
জায়গা অইলো ডিস্টিক বোর্ডের রাস্তায়।
খিতখিতা ক্যাদা।
গরুছাগল অার মানুষ অালাদা কইরা চিনবার জো নাই।
হেদিকে মোল্লা বাড়িগো দ্যাখ।
হে কষ্ট অার চোখে দেহা যায় না।
বাজান হেই রাইত থিকা মোল্লা বাড়ি গো কামে।
২৫/৩০ জন জোয়ান কামলা।
হেই রাইত থিকা খালি টানতি অাছে অার টানতি অাছে।
ছালায় ছালায় ধান, সরিষা, কালাই,
ধরায় ধরায় পাট।
কুনুডা যে ঘরে ফালাইয়া থুইয়া অাইবো হে জো নাই।
অগোরে কষ্ট দেইখ্যা তুই হাসলি অার কইলি - দেখলি রে গেন্দি।
গরীব মাইনসের কত সুবিধা!
এক পোটলার মোদ্যে পুরা সংসার।
দেহিস! পরোকালেও এই রুহুম পটপটাইয়া পুলসিরাত পার অইয়া যামু।
যত মাল তত হিশাব তত ফেরকা।
তুই কতাডা খুব হাছা কইছিলিরে মা!
তর চিক্কিরে যহন রাইতে জাগন পাইলাম প্যাটের ব্যাথায় তহন তুই দাফরাবার নাগছস।
রাইতে অাকাশভাঙা বৃষ্টি।
বেবাকে কইলো বাইরে যা!
অামি অার বাজান ঝুপড়ি থিকা বাইরে অাইলাম।
বৃষ্টির ফোটা তো না! একেকটা সুঁইচের ঘাও।
হেই ফোটা য্যান অামার গতরে না নাগে ;
হের নিগা, বাজান অামারে বুকের মোদ্যে হাইপট্যা ধইরা খাঁড়াইয়া রইলো।
এডা হাচা কতা মা!
তোর চিক্কির হুইন্যা অামার নগে নগে বাজানরেও কানতে দেখছি।
ঠিক হেই সুম তুই অাল্লার নাম বাদ দিয়া অামারে ডাকবার নাগলি।
গে-ন্দি ও গে-ন্দি-রে ! কনে গেলিরে মা!
তর নিদানের ডাক হুইন্যা পরাণ ডা অামার ছ্যাৎ কইরা উঠলো।
হুরমুর কইরা ভেজা গতর নিয়া কাছে গেলাম।
তুই তহন বিছনা ভর্তি রক্তের মোদ্যে জালে অাটকা বাইম মাছের লাগান মোচরাইতাছস।
অামারে পাইয়াই বুকের মধ্যে হাইপট্যা ধইরলি।
মুনে হইলো অামারে তুই বুকের মোদ্দে ঢুকাইয়া নিবার চাস।
অামার ভিজা গালে চুমা খাইয়া কইলি- মা রে !
বেরহম এই দুনিয়ায় তরে এলকা থুইয়া যাইতাছিরে মা।
তর অার অাপন বইল্যা কেউ রইলো না। অামারে মাপ কইরা দিস।
তর সাদা ঠোট বিড়বিড় কইরা অারো কি জানি কইছিলো!
বৃষ্টি, বাতাস অার গোঙানীর ঠেলায় কিচ্ছু হুনি নাই।
খালি বুঝলাম তর হাতের শক্ত বান্ধনডা অালগা অইয়া ধপাস কইরা বিছনার উপুর পড়লো।
একনগে বেবাকে কাইন্দা ওঠলো।
খালি তুই তহন নম্বা হইয়া পইড়া রইলি।
তয়! তুই ঢেলা ঢেলা চোখে অামার কপালডার মুহি চাইয়া অাছিলি।
ক্যান চাইয়া অাছিলিরে মা!
জানোস মা ! ক্যান জানি মুনে অয়, তর হেই চোখ, -এহনো অামারে দ্যাহে।
হাছা কইরা ক ছে রে মা!
যে তুই, তর সব ভালো অামারে দিতি
অামি খাইলে হ্যারপর খাইতি
অামি নিলে হ্যারপর নিতি
অামার যা কিছু সবই তর অাগে!
দুপুরে যে বানের পানিত্থুন টাইন্যা অানলি হেডাওতো তর অাগেই।
তাইলে বেস্তে যাওনের সুম অামারে পাছে ফালাইলি ক্যান?
না কি অামি গেলে বেস্তে তার জাগা নাজাই পড়তো,?
না কি তুই চাইছিলি বেস্তে বইয়া বইয়া মনের সুখে অামার তামশা দেখপি?
অাসলে অামার নিগা তর অন্তরে কুনু দরদই অাছিল নারে মা ।
থাকলি কি পারতি?
অামারে একলা থুইয়া পটপটাইয়া দুনিয়ার পুলসেরাত পার হইতে।
জানোস মা! তর হেই এক পোটলার সংসার?
হেইডা সামলাইতেই বাজানের জান বার অইয়া যায়।
তাছাড়া ব্যাবাকে কইলো -অাহারে, মাও মড়া মেয়্যা।
মনমরা অইয়া একলা একলা ঘুইরা বেড়ায়।
ওরও তো একজন মা দরকার!
তাই মাস না যাইতেই বাজান নিহা করলো।
বাজান নয়া বৌ পাইলো ঠিকই কিন্তু অামার অার মা অইলো না।
নয়া মা নিজেরে নিয়াই ব্যস্ত।
অামারে দেখবার সুমায় কই?
তাও যেদুল্লা অাদর, বাপ ঘরে থাকলি, বাপ নাই, অাদর নাই।
অাগে বাজান অামারে তার বুকে নিয়া ঘুমাইতো
অহন জায়গা হইছে ঘরের কোনাত।
হেইসুম এক বিয়ান বেলায় দামী গাড়িত চইড়া খালাম্মা অাইলো।
তার না কি অামার লাগান একটা মাইয়্যা দরকার।
বাজান কইলো -গেন্দিতো অামগো ঘরের কামই জানেনা।
অাপনে গো ডা করবো কেমনে!
খালাম্মা কি মিষ্টি কইরা হাসলো।
অামারে টাইনা নিল কাছে।
অামি বুঝছিলাম রে মা!
হেই টানে কোন টান নাই।
তারপর খালাম্মায় কইলো - ছি ছি, এ কি বলছো নইমুদ্দিন!
এতটুকু মেয়ে! তার অাবার কাজ কি?
এ বয়সটাই তো হেসেখেলে বেড়ানোর।
ওর বয়সী ছোট একটা নাতনী অাছে অামার।
ও হবে তার খেলার সাথী ।
স্কুলে যাবে। ব্যাগটা, বইটা এগিয়ে দেবে।
তুমি যদি চাও স্কুলেও ভর্তি করে দিতে পারি।
কাজের মানুষের দরকার নাই অামার।
পাড়ার বেবাকে কইলো - বড় কপাল কইরা অাইছিলি রে গেন্দি।
অাল্লায় তর নিগা ফেরেস্তা পাঠাইছে।
অামি গ্যালে বাজান বাঁইচ্চা যায় ,
মাও শান্তি পায়।
বাপমারে শান্তি দেওনই তো পোলাপানের কাম। তাই না রে মা ?
তাই যাওনের সুম একদুল্লাও কষ্ট পাই নাই।
ভাবছিলাম তর গোরের পৈতানে দুই ফোঁটা চক্ষের পানি ফালামু
কিন্তু নয়া মার তারসে হেও অার পারি নাই রে মা!
হ্যাসে হেই ফেরেস্তার ঠাণ্ডা গাড়িতে চইরা শহরে অাইলাম।
এ এক অাজব জায়গা।
রাইতেরেও দিন মুনে অয়।
অান্ধার বইল্যা কিচ্ছু নাই।
কিন্তু দ্যাখ, গেরামে সন্ধ্যা নাগলেই ঘুটঘুইট্যা অান্ধার।
অইলে কি অইবোরে মা, মনের ভিতরডা অালোয় ফকফকা!
অথচ এহানে দ্যাখ, যেমুহি চাবি খালি অালো অার অালো
লাল, নিল, সবুজ, সাদা য্যান অালোর মেলা!
মুখ দেইখ্যা মুনের অান্ধার ধরার সুযোগ নাই!
ফেরেস্তা খালাম্মায় অইলো তা গো নেতা।
হের নিগাইতো বেইন্না যার খেলার সাথী হওনের কতা
শহরে অাইতে না অাইতেই হে অইলো কামের ছেড়ি।
জানোস মা! এহানে কাপের তলে পিরিজ না দিলে ইজ্জত যায়।
হেরা তরে ইচ্ছা মত গুতাবো,
খুন্তি গরম কইরা ছ্যাকা দিবো,কোন অসুবিদা নাই
কিন্তু যদি চিক্কির দ্যাস তাইলেই হ্যাগো ইজ্জত শ্যাষ।
অারেকটা অাজব জিনিসরে মা, এহানে গুতা খাইলে চোখে পানি অাহে না।
কিন্তু হগলে যহন ঘুমাইয়া যায়,
হেইসুম তর মুখডা অামার চোখের সামনে ভাইস্যা ওঠে
চোখের পানি অার ধইরা রাখবার পারি নারে মা!
জানোস মা, এহানে গেরামের মত খাওনের অভাব নাই।
কত রহমের যে খাওন! কি অার কমু।
খাইবার না পাইরা ফালাইয়া দেয়
যা অামার নাগাল ৪/৫ জন খাইলেও বাঁইচা যাইবো।
কিন্তু দেওনের বড় অভাবরে মা!
তারা ভাল খাওন ডি বাইরে ফালায় অার হ্যাগো অাইটাকাঁটা খায় গেন্দি।
এডা হেই পয়লা দিনের কতা।
বেবাকে নরম গদিতে বইয়া অামারে দেকবার নাগছে।
অামি চোরের নাহাল মদ্যিহানে খাঁড়া।
খালাম্মার অাতে নক্সা অাঁকা ব্যাত।
হে অামারে অাদব লেহাজ শিখায়।
যা করলে তাগো ইজ্জত থাকবো খালি হেই কতা
হ্যানে অামার ইজ্জতের জাগা নাইরে মা।
হেই সুম প্যাটে খিদা, চোখে ঘুম। ঢুলতাছি অামি।
অাচমকা ব্যাতের বাড়ি খাইয়া জোরে চিক্কির দিয়া উঠলাম।
খালাম্মা মিষ্টি কইরা হাইস্যা দিয়া কয় - "চিল্লাচ্ছিস কেন।
তোকে তো মারি নাই।
বেতটা পরীক্ষা করে দেখলাম।
দেখলাম, মারতে অারাম কেমন ?
হাতে লাগে কি না ?
বেতটাকে সেলাম কর গেন্দি সেলাম কর।
এখন থেকে এইটাই তোর মাস্টার।
উল্টাপাল্টা করলে এটাই তোকে শিখাবে। "
খালাম্মা হইলেন পেশারের রুগী!
বেজায় রাগ।
হেদিন যে কাপডা ভাংচি হেডা নাকি বাংলাদেশেই নাই।
হেইদিন মান বাঁচাইতে খুব কষ্ট হইছিল রে মা।
অাফায় কোরবানীর ছাগলের নাগাল অামার মুখখান চাইপ্যা ধরলো।
অার খালাম্মায় ব্যাত দিয়া গুতাইয়া গুতাইয়া কাম শিখাইলো।
জবাই করা গরুর নাগাল গুঙ্গাইলাম অামি।
হ্যাসে কাটা মুরগীর লাগান দাফরাইতে দাফরাইতে দেখলাম -
ঘিন্নায় কপালডারে ভাজ কইরা অাফায় ফেনা সাবান দিয়া হাত ধুইতাছে
অার কইতাছে -
"শুয়োরের বাচ্চা, মুখের থুথু দিয়া অামার হাতটাই নোংড়া করে দিল । "
বড় ভাবী দামী মলম লাগাইতাছে খালাম্মার হাতে।
দরদমাখা গলায় জিগাইতেছে - এখন কি একটু অারাম পাচ্ছেন, মা !
রাহী বুয়ার অানা কুসুম কুসুম গরম পানিতে অাত ডুবাইয়া মুখডারে নিল বানাইয়া বইয়া রইছে খালাম্মা।
কেমুন অাজব না রে মা!
ব্যাতের বাড়ি খাইলাম অামি
অার অাতে মলম নাগায় খালাম্মা।
হ্যাসে অামিই অাবার ঐ অাত মালিশ কইরা টিপা দিলাম।
ঐসুম খবর হুইন্যা দামী গাড়িত কইরা খালাম্মার বুইনেরা অাইলো।
সাথে বুন জামাই।
তাগোরে কত সেবা, কত যত্ন , কত পরামর্শ।
এক বুইনে তো কইয়াই ফালাইলো - অাপা! তোমার বয়স হয়েছে না!
এখন পিটাপিটি করতে যাও ক্যানো!
ঘরে খুন্তি অাছে না?
খুন্তি গরম কইরা ছ্যাকা দিবে।
হাসি হাসি মুখে খালাম্মায় কয়
- ভালো বলেছিস তো! যদি চিৎকার দেয় ?
- ঘরে কচট্যাপ অাছে না? মুখে লাগিয়ে নিবে।
হেইদিন থিকা ব্যাত মাস্টোরের কাম কমলো যোগদিল খুন্তি মাস্টোর।
গতরে এহন অার খুন্তি ধরণের জায়গা
নাইরে মা।
চরচর কইরা মাংশ পুড়ার শব্দ অয়
হেই শব্দ একলা অামি হুনি।
অার চাইয়া চাইয়া দেহি
মাংশ ফাঁক কইরা খুন্তিডা কেমনে গতরে ঢুকে।
ট্যাপ দিয়া অাটকা মুখ,
নাক দিয়া গো গো শব্দ অয়।
এই শব্দডাও যদি বন্ধ অইয়া যাইতো বাইচা যাইতামরে মা।
জানোস মা, এতো যে ব্যাতা পাই, দাফরাই কিন্তু চোখ থাহে শুকনা খটখটা।
হেইডা দেইখ্যা ফেরেস্তা খালাম্মার রাগ অারো বাইরা যায়।
গরগর করতি করতি কয় -" কি মোটা চামড়ারে বাবা!
এত মারি তাও দেখ চোখে পানি নাই।
অথচ কষ্টের অভিনয়ে মৌসুমী ফেল । "
চোকে পানি দেহনের নিগা হের কি জেদ!
যত জেদ তত ছ্যাকা।
অইলে কি অইবো, পানি অার অাহে না!
চোখে পানি দে পানি দে কইয়া কত যে অাল্লারে ডাহি
কো পানি দেয় না তো।
তুই না কইতি তর অাল্লার না কি দিলডা ভর্তি দয়া।
এইডা তার দয়ার নমুনা?
অামি তো তার কাছে ট্যাহা চাই নাই, সুখ চাই নাই, বাড়ি, গাড়ি, বেস্ত চাই নাই।
চাইছি খালি কানবার সুম চোকের কোনায় একটু পানি!
কো দিলো তর অাল্লায়!
তর মনে অাছে মা? অাগে তর গাইল হুনলেই চোখ দিয়া দরদর কইরা পানি অাইতো!
তহনতো চোখ ভর্তি পানি অাছিল
হেই পানি কই গেল রে মা?
সবচাইতে কষ্ট কি জানোস রে মা!
যে বাজান বৃষ্টির ঘায়ে দু:খু পামু ভাইব্যা অামারে হাইপট্যা ধইরা খাঁড়াইয়া অাছিল
হেই নটির পোলায় একবার খোঁজ নিবারও অাইলো না!
এই কষ্টের কাছে ফেরেস্তা খালাম্মার গরম খুন্তির ছ্যাকা কিছুই না রে মা।
অাজ কয়দিন অয় একটা ছোট্ট ঘরে অাটকা।
এইডারে বাথরুম কয়।
হাগনমুতনের সমস্যা নাই।
পানি অাছে মেলা। যত খুশি খা,
না করোনের কেউ নাই।
খালি ভাতের সমস্যা।
মুনে পড়লে খাওন দিবার অাহে রাহী বুয়া।
তাও একলা না, সাতে ফেরেস্তা খালাম্মাও অাহে।
হেই অাগের নাগাল অাতে ব্যাত নইলে খুন্তি মাস্টোর।
কুনুরহমে ভাতের থালডা রাইখ্যাই কপাট নাগাইয়া দেয়।
এহন এইডাই অামার দুইন্যা।
হারাক্ষণ একলা থাহি
একটু যে কতা কমু হে মানুষটাও নাই।
কতা কবার নিগা পরাণডা ফাইট্টা যায়।
ঘরের মুদ্যে অামার নগে রাইত জাগে পোড়া চামড়ার পচন ধরা গন্ধ।
হেই গন্ধে নিজেরই বমী অাহে মা ।
মুনে অয় জ্বর অাইছে। গতরডা হিরহির কইরা কাঁপে।
নিশা রাইতে সারা বাড়ি যহন ঘুমাইয়া যায় দেয়াল ঘড়িডা টিকটিক কইরা বাজে।
তার নগে তহন অামি কিতকিত খেলি, পাঁচ গুটি খেলি।
গুণগুণ কইরা কই
"অাম পাতা জোরা জোরা
মারবো চাবুক চড়বো ঘোড়া।"
তাও যদি ব্যাতাডা কমে!
তর মুনে অাছে মা! বিড়ির অাগুনে পা পুড়ছিল অামার।
এহন মুনে অয় হেডা কুনু পুড়াই অাছিল না।
হেরপরও তুই কান্দে কইরা ঘরে নিতি, বাইরে অানতি।
যত্ন কইরা গাছান্ত অসুধ নাগাইয়া দিতি।
অারেকটু অাদরের লোভে অামি পেঙ্গা কইরা চিল্লাইতাম।
এহানে চিল্লামু কেমনে, কে হুনবো রে মা!
তাছারা ফেরেস্তা খালাম্মার মান যাইবো না!
রাইত যত বাড়ে পোড়া পঁচা গতর ততই জাইগ্যা উঠেরে মা।
ভকভক কইরা পঁচা গন্ধ বাইর অয়।
রাজ্যের মাছি অাইয়া বিনবিন করে।
পূজে নষ্ট অইবো বইল্যা এক কাপড়েই রাখছে।
গেরামের মাইনষে ঠিকই ধরছিল রে মা!
তর অাল্লায় অামার নিগা ফেরেস্তা পাঠাইছিল!
জাইগ্যা অাছি না ঘুমাইয়া গেছি টের পাইনারে মা!
তয়, মাছির বিনবিন শব্দ অার পাই না।
হঠাৎ মুনে অইলো ঘরের মোদ্যে তুই।
পড়নে পুলিশের পোষাক।
ঢুইক্যাই বমী কইরা ঘর ভাসাইলি।
নটির মেয়্যা!
ভাবছিলি বেস্তে বইয়া একলা একলা সুখ খাবি!
কই, পারলি খাইতে!
হ্যাসম্যাস তর তো অাইতেই অইলো।
মা রে! হেই যদি অাইলিই,
তাইলে অার কয়ডা দিন অাগে অাইলি না ক্যান?
যদি অাইতি, তাইলি তর অাল্লাহ যে মহান, রহমতের ভাণ্ডার, দয়ার সাগর
হেই মিছা কতাডা কি জানবার পারতামরে মা !
কি বেক্কল অামি! হুদাই এতদিন তর অাল্লারে ডাকছি
চাইয়া চাইয়া ধণিগো অাকাম দেহা ছাড়া তর অাল্লার অার কি কাম রে মা!
যাওনের সুম তুইও কথাডা বুঝবার পারছিলি।
তাইতো তর অাল্লারে বাদ দিয়া ডাক দিছিলি গে-ন্দি- রে ও গে-ন্দি। কোনে গেলিরে মা!
অাল্লারে বাদ দিয়া অামিও যদি অাগেত্থুন তরেই ডাকতাম তাইলেও খুব শান্তি পাইতাম রে মা!

No comments: