ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৭)

                    ফিলিপ গাইনের সাথে কিছুক্ষণ (৭)  
                     লেখক: মো: কামরুল মোজাহীদ

(সেই তাতারা রাবুকা ইচ্ছা করলেন --যে ইচ্ছা সেই কাজ -) কিন্তু পৃথিবী সৃষ্টি করা কি এত সহজ। তিনি ডাকলেন উপদেবতা নন্তু -নপান্তুকে। তার হাতে একমুঠো বালি দিয়ে বললেন - যাও, পৃথিবী বানাও। যথাঅাজ্ঞা বলে নন্তু -নপান্তু নারীর বেশ ধরে নেমে পড়লেন পৃথিবী গড়ার কাজে। কিন্তু একা একা এই দূরহ কাজ করা কি সম্ভব! তাই তিনি সহযোগিতার জন্য ডেকে নিলেন তার অারেক সহকর্মী 'মাচি'কে। অাজকে যে নয়নাভিরাম পৃথিবী অামরা দেখতে পাচ্ছি অাদিতে তেমন ছিল না। সেখানে ছিল শুধু তাতা -থৈ থৈ পানি। অার সেই অথই পানির উপর বিছানো ছিল মাকড়সার জাল। অালো নেই, মাটি নেই, গাছ নেই, পশুপাখি নেই সে এক ভয়াবহ অবস্থা । এমন সৃষ্টিছাড়া অবস্থা যখন তখন নন্তু-নপান্তু অাশ্রয় নিলেন মাকড়সার জালে। তারপর দুজনে মনোযোগ দিলেন পৃথিবী গড়ার কাজে। কিন্তু তারা যতভাবেই চেষ্টা করেন বালি অার জোড়া লাগে না। উপায়ান্তর না দেখে তারা স্মরণাপন্ন হলেন পানির নিচে বসবাসরত কাঁকড়ার মত দেখতে বিশাল এক প্রাণির। তাকে অনুনয় বিনয় করে বললেন ভাইরে, অামরা পৃথিবী বানাবার দায়িত্ব পেয়েছি কিন্তু মাটি পাচ্ছিনে, তুমি অামাদের একটু সাহায্য করো । উপদেবতাদ্বয়ের কাকুতিমিনতি দেখে অবশেষে সেই প্রাণির দয়া হলো। সে বলল ঠিক অাছে অামি তোমাদের সাহায্য করছি। থৈ হীন পানির মধ্যে প্রাণিটি দিল ডুব। এই যে ডুব দিলো অার উঠে না। এদিকে সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। ধৈর্যের বাঁধ যখন ভাঙে ভাঙে অবস্থা তখন খালি হাতে ফিড়ে এসে প্রাণিটি বললো - ভাইরে, এ অামার কর্ম নয়! শুনে তো মাথা খারাপ হওয়ার দশা। হায়,হায় এখন কি করা যায়! নন্তু-নপান্তু বাধ্য হয়ে দ্বারস্থ হলেন "চিফং-নকমা বালফং-গিটেল "নামক অারেক প্রাণির কাছে। মিনতি করে বললেন - ভাইরে, সৃষ্টিকর্তা তাতারা রাবুকা অামাদের উপর দায়িত্ব দিয়েছেন পৃথিবী গড়ার কিন্তু মাটির অভাবে গড়তে পারছি নে। তুমি অামাদের একটু সাহায্য করো । সে ছিল অাগের প্রাণিটির চেয়ে অাকারে ছোট। তা হলে হবে কি! সাহসে বুক বেধে দিল এক ডুব। যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। পানির যেন অার তল নেই।শেষে অার সাহস রাখতে না পেরে ফিড়ে এসে বললো -না গো বাপু -এ অামার কর্ম নয়। তোমরা ভিন্ন রাস্তা দেখ।

নন্তু-নপান্তু চোখে সর্ষেফুল দেখলেন।তখন মনেপড়লো ছোট্ট প্রাণি "চিচিং বারচিং "-এর কথা। এ কালের মত সৃষ্টির অাদিতেও ছিল ছোটদের দাপট। যত ছোট তত ক্ষমতা বেশি। উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে তারা সেই ছোট্ট প্রাণি" চিচিং বারচিং" -এর কাছে হত্যা দিয়ে পড়ে বললেন -বাপু, তুমি অামাদের সাহায্য করো। একমাত্র তুমিই পারবে গহীন জলের নিচ থেকে মাটি অানতে। তুমি সেই মাটি এনে দিলেই অামরা সৃষ্টিকর্তা তাতারা রাবুকার নির্দেশ মত পৃথিবী বানাতে পারবো। তুমি বাছা অামাদের মান বাঁচাও। তাদের অসহায়ত্ব দেখে চিচিং -বারচিং-এর দয়া হলো। সে বুক ভড়ে শ্বাস নিয়ে দিল এক ডুব। দীর্ঘসময় পর উঠে এলো সে। সাথে নিয়ে এলো সামান্য কিছু কাদা মাটি। 'নন্তু-নপান্তু' অার 'মাচি'র অানন্দ দেখে কে? তারা বহু যত্নে তৈরি করলো পৃথিবী । কিন্তু সেই পৃথিবীতে বৃহদাকৃতির পাথর " মজার" অার ছোট অাকৃতির পাথর" ডিনজার" ছাড়া দাঁড়াবার মত অার কোন জায়গা রইলো না। থাকবে কি করে তার সবটুকু জুড়ে যে থকথকে কাদা। বাধ্য হয়ে নন্তু-নপান্তু হত্যা দিয়ে পড়লেন সৃষ্টিকর্তা তাতারা রাবুকার দরবারে। সব শুনে সৃষ্টিকর্তা দিনকে দুভাগ করলেন। একভাগে দিলেন সূর্য অন্য ভাগে দিলেন চন্দ্র। তার সাথে দিয়ে দিলেন বাতাস। পর্যায়ক্রমে তৈরি হলো দৃষ্টিনন্দন পৃথিবী। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে মেজর এলান প্লেফেয়ার তার THE GAROS বইতে এভাবেই বর্ণনা করেছেন পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস কিন্তু মি: রামখে মর্মিনের বর্ণিত ইতিহাসের সাথে তার রয়েছে বেশ কিছু গড়মিল। এখানে না বললেই নয়, মেজর এলান প্লেফেয়ার হচ্ছেন জন্মসূত্রে একজন খ্রিস্টান কিন্তু হলে কি হবে! তিনি ছিলেন গারো জাতি সম্পর্কে একজন প্রকৃত গবেষক। অপরদিকে ভারতের গোয়ালাপাড়া জেলার রাজা সিমলা গ্রামে ছিলেন মি: রামখে মর্মিন। তিনি হচ্ছেন জন্মসূত্রে গারো এবং ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। উভয়েরই লেখার বিষয়বস্তু হচ্ছে - সংসারেক ধর্ম ও গারোদের কৃষ্টি কালচার । অথচ সেই ধর্ম ও তার সৃষ্টি তত্ব নিয়ে উভয়ের বর্ণনায় রয়ে গেছে বেশকিছু গড়মিল। যেমন, মি: রামখে মর্মিনের ইংরেজি হরফে গারো ভাষায় লেখা সৃষ্টিতত্বে বলা হয়েছে -নন্তু-নপান্তু কাঁকড়া সদৃশ প্রাণিকে নয় বরং কাঁকড়াকেই পাঠিয়ে ছিলেন মাটি অানতে। কাঁকড়া অাদেশ পেয়ে সেই যে ডুব দিলো অার উঠার নাম নেই। উঠবে কি করে সে যখন মাটি অানতে ব্যস্ত এই সময় সেখানে বসবাসকারী একদল মানুষ মারমুখী হয়ে ধেয়ে এলো। বললো -কে রে! তোর এতো বড় সাহস, তুই অামাদের মা দাদিদের নিয়ে যাচ্ছিস ? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা। যে কথা সেই কাজ। তারা সঙ্গে সঙ্গে মায়াজালে বেধে ফেললো তাকে যার পরিণতিতে পানির নিচেই সে মরে চিৎপটাং। 

প্রতীক্ষায় থেকে থেকে অধৈর্য হয়ে পড়লেন নন্তু-নপান্তু। অার অধৈর্য হবেন নাই বা কেন? তুই ব্যাটা গেলি মাটি অানতে, পারলি কি পারলি না জানাবি তো! তা না করে বেমালুম গায়েব হয়ে রইলি। দায়িত্বজ্ঞান বলে কিছু অাছে কি? তার দায়িত্বহীনতা দেখে নন্তু-নপান্তু তো দিশেহারা। কি করেন! কি করেন! এখন তাদের "রাখ তোর ভিক্ষা কুত্তা সামলা অবস্থা"। কাঁকড়ার কি হলো সেই চিন্তায় দুজনের মাথা খারাপ হবার জোগার। অবশেষে মনে পড়লো নচীর কথা। তিনি জানেন, নচীর হলো দয়ার শরীর। কারো দু:খ কষ্টের কথা শুনলে সে সহ্য করতে পারে না। বিপদে পড়ে কেউ সাহায্য চাইলে তাকে উদ্ধার করার জন্য সে জীবন পর্যন্ত বাজী রাখতে পারে। দোষের মধ্যে দোষ হলো - তার ছিল সৌন্দর্য্য বাতিক। সুন্দর কিছু দেখলেই মোহমুগ্ধ হয়ে যান, মাথা অার ঠিক রাখতে পারেন না। কিন্তু কি অার করা! নন্তু-নপান্তু ছুটে এলেন সেই 'নচী 'এর কাছে। তার কাছে অাদ্যপ্রান্ত সব খুলে বললেন। সব শুনে দয়াপরবশ হয়ে নচী ছুটলেন কাঁকড়ার খোঁজে । নচী পানির নিচে গিয়ে দেখলো কাঁকড়া হাত পা ছড়িয়ে মরে পড়ে অাছে। তবে ভাগ্য ভাল কাঁকড়ার পায়ের সাথে তখনো কিছু কাদামাটি লেগে ছিল। নচী সেইটুকু মাটি অাঁচিয়ে নিজের লেজের সাথে করে ফিড়তে শুরু করলো। ভাইরে নারীর প্রতি লোভ শুধু যে এ যুগে অাছে তা নয় পৃথিবী সৃষ্টির অাদিতেও ছিল। তার উপর যদি হয় পরস্ত্রী তাহলে তো পোয়া বারো। সৌন্দর্যপাগল নচীকেও পেয়ে বসলো সেই দোষে। ফেরার পথে তার সাথে দেখা হয়ে গেল 'ডু-মারু-চাং-মারু'র স্ত্রী 'চি 'রিমিট '-এর সাথে। কি তার রুপ, দেখলে অার চোখ ফেরানো যায় না। সেই ভূবনমোহিনী রুপের জালে অাটকে গেলেন সচী। লাট্টুর মত ঘুড়পাক খেতে থাকলেন তিনি। মাথায় উঠলো তার মাটি অানার কথা, কাঁকড়ার মৃত্যু সংবাদ নন্তু-নপান্তুকে পৌছে দেবার কথা। লেজে মাটি নিয়েই ঘুড়তে লাগলেন চি 'মিরিট'- এর সাথে। কিন্তু বাদ সাধলো ডু-মারু-চাং-মারু'। স্বামী বলে কথা। সব দেখে শুনে এ যুগের স্বামীদের মত 'ডু-মারু-চাং-মারু'র মাথায়ও রক্ত উঠে গেল। অার উঠবেই বা না কেন? তুই ব্যাটা এসেছিস -কাঁকড়ার খোঁজে। কোথায় তার খোঁজ নিয়ে চলে যাবি তা নয় পরকিয়া নিয়ে মেতে অাছিস। কপাল গুণে দায়িত্ব পেয়েছিস পৃথিবী গড়ার মত মহৎ কাজের অংশীদার হবার। কোথায় মাটি নিয়ে গিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাবি তা না করে মজলি কি না পরকিয়ায়। তোর তো কঠিন শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিৎ । না না, ডু-মারু-চাং-মারু' এতটা কঠোর হতে পারলেন না। তিনি শুধু মায়াজালে জড়িয়ে এমন এক রোগ দিলেন সে রোগে নচীর অর্ধেক মাথা অার একটা চোখ বাদে অবশিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অাক্রান্ত হলো কঠিন রোগে।

"মিসি" ছিল অাশেপাশেই। সে প্রথম থেকেই চিচিং বারচিং -এর সব কিছুর উপর নজর রাখছিলো। যখন বুঝলো চিচিং বারচিং-এর বারোটা বাজার অার বাকি নেই তখন সে ছুটলো নন্তু-নপান্তুর কাছে। কারণ তার অাবার উপযাচক হয়ে উপকার করার বাতিক। নন্তু-নপান্তুকে সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন মিসি। নিরুপায় নন্তু-নপান্তু ছুটে গেলেন" নারেংসি "-এর কাছে। হ্যা, এইবার তারা যোগ্যতম কর্মী পেলেন বটে। নারেংসি ছিলো বাপের ব্যাটা। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে দিল এক ডুব। নিয়ে এলো মাটি। তুলে দিল নন্তু-নপান্তুর হাতে । নন্তু-নপান্তু প্রকৃতি প্রেমে মোহিত হয়ে অাগে থেকেই তো নারী হয়ে প্রতীক্ষা করছিলেন। মাটি পেয়ে তার নারী জন্ম স্বার্থক হলো। তিনি সাথে সাথে তা গর্ভে ধারণ করলেন। এখন শুধু প্রসবের দিনক্ষণ পূর্ণ হবার অপেক্ষা। অবশেষে এক মাহেন্দ্রক্ষণে জন্ম হলো পৃথিবীর। অাবার অাব্দুস সাত্তার তার অারণ্য জনপদে গারো, ময়মনসিংহ /টাঙ্গাইলে যে সৃষ্টিতত্ব বর্ণনা করেছেন তা অনেকটা এ রকম- তাতারা রাবুকা নন্তু-নুপান্তুকে নারীরূপে সাজিয়ে হাতে কিছু বালি দিয়ে বললেন -পৃথিবী বানাও।অাদেশ পেয়েই নন্তু-নুপান্তু প্রথমে অাশ্রয় নিলেন মাকড়সার জালে। তারপর সেই জাল বিছিয়ে দিলেন সমগ্র জলরাশির উপরে। তিনি প্রথমে পানির উপর বালি ছিটিয়ে দেখলেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। এরপর মুষ্টিবদ্ধ বালি পানির নিচে ছুড়ে দিয়ে বললেন -যা, নিচ থেকে মাটি নিয়ে অায়। অবশেষে মাটি এসে পৌছলো। নন্তু-নপান্তু সেই মাটি দিয়ে সৃষ্টি করলেন পৃথিবী। এখন প্রশ্ন অাসতেই পরে - মেজর এলেন প্লেফেয়ার ; মি: রামখে মর্মিন ও অাব্দুস সাত্তারের লেখা সংসারেক ধর্মের সৃষ্টিতত্বে এই গড়মিলের কারণ কি ? অামরা যদি জানতে চাই, গারোদের অাদিম সংস্কৃতি কি? ঐতিহ্যগতভাবে অর্জিত জমি বলতেই বা কোন জমিকে বুঝায়? তাহলে এই ধর্মতত্বের পার্থক্যের কারণটুকুও জেনে নিতে হবে অাগে ---চলবে---

No comments: