রুবি কেন আসামি

জুড়ী টাইমস সংবাদ: মৃত্যুর ২১ বছর পর মুখ খুললেন চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রাবেয়া সুলতানা রুবি। তিনি বলেছেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ নিয়ে মিডিয়ায় তুলপাড় চলছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে- কে এই রুবি, কি সম্পর্ক ছিল সালমান শাহ এবং তার পরিবারের সঙ্গে? কি কারণে হত্যা মামলার আসামি হলেন তিনি? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রুবির জীবনের নানা অধ্যায়।

‘সালমান শাহ অজানা কথা’ গ্রন্থে রুবি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা দিয়েছেন সাংবাদিক সুপন রায়। তিনি লিখেছেন, রাবেয়া সুলতানা ওরফে রুবি থাকেন সালমানের ফ্ল্যাটের অর্থাৎ ইস্কাটন প্লাজার উত্তর পাশের বিল্ডিংয়ে। তিনি রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী আবদুর রশিদের মেয়ে। প্রয়াত স্বামী ক্যাপ্টেন জামিল ছিলেন তার বর। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয় তার স্বামী ছিলেন তাদের একজন। এরপর তিনি জন নামে একজনকে বিয়ে করেন। বর্তমানে (তৎকালীন) তিনি মে-ফেয়ার নামক বিউটি পার্লারের স্বত্বাধিকারী। সালমান শাহ হত্যা মামলার ১১ জন আসামির মধ্যে তিনি অন্যতম।

সালমান শাহ মারা যাওয়ার পর বিদেশ চলে যান রুবি। এখনো প্রবাসজীবন যাপন করছেন। সেখান থেকে একাধিকবার বিভিন্ন ভিডিওতে বলেছিলেন যে, তিনি নির্দোষ, কিছু জানেন না। সেসব ভিডিওতে সালমান আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেছিলেন তিনি। এবার তিনি জানিয়েছেন, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের নামও বলেছেন তিনি। সালমানের স্ত্রী সামিরার পরিবার ওই খুনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে প্রমাণ দিতেও তিনি প্রস্তুত আছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন রুবি।

রুবিকে নিয়ে বিতর্ক বহু আগে থেকেই। সালমান জীবিত থাকাকালে রুবিকে তার ফ্ল্যাটে কখনো না আসার নির্দেশ দিয়ে বের করে দেন। ঘটনাটি পারিবারিক কোন্দল নিয়ে। সালমানের মায়ের সঙ্গেও সেই থেকে রুবির মন কষাকষি চলতে থাকে। অভিযোগ আছে, এর কথা ওর কানে, ওর কথা এর কানে লাগিয়েছেন রুবি। উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে মানুষজনকে বিভ্রান্ত করাতে তার খ্যাতি আছে। এ কাজে তিনি বরাবরই সিদ্ধহস্ত। তার ইচ্ছে ছিল আমেরিকা পড়–য়া ছোট ভাইয়ের জন্য সামিরাকে স্ত্রী করে ঘরে তুলবেন। সেই স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে গেল সালমান-সামিরার বিয়েতে।

সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে, সালমান-সামিরার দাম্পত্য কলহের পশ্চাতে তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। সালমানকে তিনি দেখে নেবেন, এ রকম কথাও বলেছেন অনেকের কাছে। জাদুশিল্পী আজরা জ্যাবিনের কাছে এই রুবি বলেছিলেন, সালমানের সব টাকা তার মা নিয়ে যাচ্ছে, সামিরার কী হবে এবং এ অভিযোগটি করেছেন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। তার ভাষ্য, ‘আমার ছেলের টাকা আমি নিলাম না, তার বাবা নিল এসব নিয়ে রুবির মাথাব্যথা কেন? রুবি কে, যে আমার সংসার জীবনে হস্তক্ষেপ করবে?’

সুপন রায় আলো লিখেছেন, ‘সালমানের মৃত্যু দিন ছিল প্রশ্ন সাপেক্ষ। তার (রুবির) ভূমিকা নিয়েও পত্রপত্রিকাসহ নীলা চৌধুরী অভিযোগ করেছেন। সালমানের মৃতদেহ একপাশ রেখে রুবি-সামিরা বসে গল্প করার অভিযোগও সুস্পষ্টভাবে কথিত আছে। এই প্রশ্নগুলো যখন লোকমুখে ঠিক তখনই এ প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে আসেন রুবি। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে একে একে উত্তর দেন সব প্রশ্নের, খণ্ডান যুক্তি। অথচ আগে বারদুয়েক তার পার্লারে দেখা করতে গেলে বলা হয়, তিনি পার্লারে নেই, বাইরে আছেন।

রুবি বলেন, ‘ইমনের আত্মহত্যার খবর শুনে সঙ্গে আমার ছেলে ভিকি, পার্লারের মেয়েরা ফ্ল্যাটে ঢোকার মুহূর্তেই দেখলাম, ধরাধরি করে ইমনকে বের করে আনা হচ্ছে। আমি ভাবলাম, ¯িøপিং পিল খেয়েছে, স্টমাক ওয়াশের জন্য হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ভিতরে ঢুকে দেখি ডাইনিং টেবিল-কিচেনের মাঝামাঝি মেঝেতে সামিরা বসা। কাঁদছে। আমাকে দেখেই ও দৌড়ে এল। ওকে সান্ত¦না দেয়ার সময় ১৯৮১ সালের ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম ওর ভেতরে তোলপাড় করা অবস্থা। টের পেলাম সুইটি ভাবি, ইয়াসমিন তখনো দাঁড়িয়ে। একটু পরেই ইমনের মা (নীলা চৌধুরী) এসে বলল, ‘দরজা বন্ধ করো, কাউকে ঢুকতে দেবে না।’ আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তিনি সামিরাকে বললেন, ‘সামিরা কাইন্দো না, তুমিই ইমনকে মেরেছো।’

তখন সামিরা হিস্টিরিয়া রোগীর মতো বলে উঠল, ‘আমি কেমন করে আপনার ছেলেকে মারলাম!’ তখনো হীরা ভাইকে (সামিরার বাবা) জানানো হয়নি ইমনের খবর। সুইটি ভাবির বাসায় গিয়ে ফোনে চট্টগ্রামে হীরা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। কিছুক্ষণ পরে ফ্ল্যাটের ম্যানেজার ডাক্তার নিয়ে আসেন। ডাক্তার কিছু না বলেই চলে গেলেন। আমি ¯øাভো ক্লিনিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন, সালমান মৃত। আমি উল্টো প্রশ্ন করলাম, আপনি নিশ্চিত? ডাক্তার সম্মতি জানাতেই, ভালো হলো না, বলে চলে এলাম। সঙ্গে আমার ছেলে ভিকি। এসেই সামিরা, সালমান মহসীন (সুইটি ভাবির বর) ভাইকে জানালাম ইমন মারা গেছে। কিছুক্ষণ পর ফ্ল্যাট থেকে ফোন করলাম এক ঊর্ধ্ববতন পুলিশ কর্মকর্তাকে। বললাম পুরো ঘটনা। ওই অবস্থায় সামিরাকে নেব প্রশ্ন করাতেই তিনি বললেন, ‘আপনি ভুলেও এ কাজ করবেন না। জড়িত হয়ে পড়বেন।’

সামিরা তখন আমাকে বলল, ‘ইমন একটা চিঠি লিখে গেছে।’ আমি বললাম, কোথায় সেটা? সামিরা বলল, ‘আবুলের হাতে।’ আমি তখন তাকে বললাম, তুমি কি একটা বুদ্ধু মেয়ে? তুমি জান এ চিঠির মূল্য কত? এরপর ১/বি-র রুমির আব্বা এসে সামিরাকে ওনার ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। আমি আমার বাসায় চলে যাই। আমি বুঝতে পারছি না আমাকে কেন ইমনের আত্মহত্যার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। গত অক্টোবর ১৯৯৫ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সামিরার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। ফ্ল্যাটের দারোয়ানই তার প্রমাণ।

রুবির দেয়া ব্যাখ্যাই যে সর্বাংশে সত্যি তারও যথাযথ প্রমাণ নেই। তথাকথিত আত্মহত্যার পর রশি কেটে নামানোর পর সালমানের গায়ে তেল মালিশ করার সময় রুবি যে উপস্থিত ছিলেন সেটা সামিরা নিজেই বলেছেন। পত্রিকার পাতা ওল্টালেই এর প্রমাণ মিলবে। তিনি বলেছেন, ‘সালমানকে ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নেয়ার পরেই তিনি ফ্ল্যাটে ঢোকেন। অথচ নীলা চৌধুরী তাকে ফ্ল্যাটে ঢুকেই দেখতে পান। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করা, ‘কাজটা ভালো হলো না,’ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অতি উৎসাহী আলাপনের রুবির স্ববিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে, বুদ্ধিমতি হলেও তিনি তা বুঝে উঠতে পারেননি। সালমানের লিখে যাওয়া চিঠি আবিষ্কারের সঙ্গে তার নাটকীয় সম্পর্ক তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফ্ল্যাটে তিনি এক বছর ধরে যান না এবং ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রার বই তার প্রমাণ বলে যে বক্তব্য রেখেছেন তাতেও অসত্য লুকিয়ে আছে। ইস্কাটন প্লাজায় ঢুকতে যে তার সই করতে হয় না কিংবা রিসিপশন থেকে ইন্টারকমের মাধ্যমে সম্মতি নিতে হয় না এ কথা ফ্ল্যাটের সবাই জানে। ফ্ল্যাটের কর্মচারীদের কাছে রুবি ‘তথাকথিত আন্টি’ নামে পরিচিত।

No comments: