সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা মুজিব

ঝর্ণা মনি : একাত্তরের ৭ মার্চ থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। সময়ের হিসাবে ৩০৩ দিন। যে রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছিলেন, ঠিক ৩০৩ দিন পর একই স্থানে দাঁড়িয়ে বিজয়ী জাতির বিজয়ী পিতা ডাক দিলেন সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার। ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন লাখো শহীদের রক্তেস্নাত দুঃখিনী বাংলায় দাঁড়িয়ে প্রিয় স্বজন হারানো স্বজনদের শোনালেন দেশগড়ার বীজ মন্ত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের এবং দেশকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে।

আবেগাপ্লুত জাতির জনক বলেন, আজ থেকে আমার অনুরোধ, আমার আদেশ, আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই- এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণতা হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়। দেশের উন্নয়নের জন্য ডাক দিলেন এভাবে- যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজনও ঘুষ খাবেন না, আমি ক্ষমা করব না।

১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসের পঞ্চম বার্ষিকীতে দেয়া জাতির পিতার শেষ ভাষণটিও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশকে নির্দেশ করে। এই ভাষণটির অনুলিখন ১৯৭৯ সালের ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ থেকে প্রকাশিত স্মরণিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। কী পরিস্থিতিতে তিনি দেশের হাল ধরেছিলেন, দেশের খাদ্য মজুদ কোন অবস্থায় তখন ছিল, ভুট্টোকে কোন পরিস্থিতিতে ঢাকায় লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল, লুটেরা- সুযোগ-সন্ধানীরা কি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, রাজনীতিতে কী ভয়াবহ অবস্থা তখন বিরাজমান ছিল, তার সীমাবদ্ধতাও কতটা প্রকট ছিল, দেশ নিয়ে তার নতুন কি প্ল্যান ছিল সবকিছুরই ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন এই ভাষণে।

যে জাতির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন জীবনের স্বর্ণালী সময়, সেই বাঙালি জাতিকে তিনি দেখতে চেয়েছেন এক মর্যাদার আসনে। জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছেন আমৃত্যু। ঝিমিয়েপড়া জনগণকে জাগিয়ে তুলতে আওয়াজ তুলেছেন বজ্রকণ্ঠে, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত নাই। কোনো জাতি যখন ভিক্ষুক হয়, মানুষের কাছে হাত পাতে, মানুষকে বলে, আমাকে খাবার দাও, আমাকে টাকা দাও, তার তখন ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না।

রাজনৈতিক কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সেরা এই ভাষণটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শোষণহীন সমাজ কায়েমই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। আর এজন্য কৃষক, শ্রমিক, জনতার ঐক্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশকে বানাতে চেয়েছিলেন প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাঙালি জাতির, তার সেই স্বপ্নপূরণের আগেই বাংলার আকাশ ঢেকে গিয়েছিল ঘোর অমানিশায়। বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত জাতির পতাকায় খামচে ধরা শকুনের উল্লাস। তক্ষকের খাণ্ডবদাহে দুর্যোধনের অট্টহাসি। তিন দশকের চন্দ্রগ্রহণের বন্দিশালায় বিবর্জিত মানবতা, বিপন্ন বিবেক।

তবে হার মানেনি বীরের জাতি। যে স্বপ্ন দেখতেন বঙ্গবন্ধু, যে স্বপ্নের জন্য সপরিবারে জীবন দিয়েছেন, রক্ত দিয়ে শোধ করেছেন রক্তঋণ, জনকের সেই পবিত্র রক্তের শপথে বলীয়ান তার উত্তরসূরিরা। চার দশক পরে জেগে উঠেছে বাংলা, জেগে উঠেছে প্রাণ। চিরঞ্জীবী মুজিব চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। মুজিবের অপূর্ণ স্বপ্নপূরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান আজও বাঙালির চেতনার বাতিঘর, সোনার বাংলা বিনির্মাণের আলোকবর্তিকা।

No comments: