ইতিহাসের মহানায়ক মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু

ঝর্ণা মনি : শত শত বছর ধরে বাঙালি জাতি ছিল পরাধীনতার জালে বন্দি, শোষণ নিপীড়নে জর্জরিত। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তানি শাসন- দুইশ চব্বিশ বছরের গোলামী আর শাসন-শোষণে নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দাবিতে কত প্রাণ বলিদান হয়েছে- সঠিক ইতিহাস হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কত বাঙালির রক্ত গঙ্গা-পদ্মায় মিশেছে এর হিসাব কেউ জানে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর অনেকেই ভেবেছিলেন বাঙালির দাসত্ব বুঝি ঘুচল। কিন্তু হায়! বর্বর পাকিস্তানিরা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার, প্রাণ জুড়িয়ে মাকে ‘মা’ ডাকার চিরন্তন সত্যকে কেড়ে নিতে চাইল। ব্রিটিশদের চেয়েও শতগুণ শোষণ, বঞ্চনা জুটল বাঙালির ললাটে। বাংলার ‘সোনালি আঁশের’ পয়সায় পাকিস্তানের করাচি, লাহোর, পিণ্ডি আর ইসলামাবাদ পরিণত হয়েছিল তিলোত্তমা নগরীতে। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে ব্যবসাবাণিজ্য- সব কিছুতেই ছিল পাকিস্তানিদের একচেটিয়া আধিপত্য। অনেক বাঙালি নেতা ছিলেন রাজনীতিতে সক্রিয়, কিন্তু কেউ পাকিস্তানের এই শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের রক্ত চক্ষুর ভয়ে জোরালো আন্দোলন করতে পারেননি। আবার কেউ কেউ মোনায়েম খানের মতো আইয়ুব খানের চাটুকারিতা করতেই ছিলেন ব্যস্ত।

পাকিস্তানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে বাঁচাতে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন বাংলা ও বাঙালির প্রবাদপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। পাঞ্জাবিদের শাসন-শোষণ থেকে বাঙালিদের বাঁচাতে এই তরুণ নেতা ১৯৬৬ সালের ৭ জুন লাহোর গিয়ে পেশ করেন বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা। পাকিস্তানিরা বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ প্রত্যাখ্যান করে শেখ মুজিবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেয় এবং ফাঁসির উদ্দেশ্যে কারান্তরীণ করে। বাংলার জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে কারামুক্ত করে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন সাবেক ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমদ। আর বঙ্গবন্ধু মানুষের ভালোবাসার শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জনসভায় বলেছিলেন, ‘সংগ্রাম করিয়া আমি আবার কারাগরে যাইবো। কিন্তু মানুষের প্রেম ভালোবাসার ঢালি মাথায় নিয়া দেশবাসির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারিব না।’

বর্তমান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তার স্মৃতিচারণে বলেন, ’৬৯-এর ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি বাংলার আপামর জনতা গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে শামিল হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি ১১ দফা বাস্তবায়ন ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে শপথ দিবস পালন করি। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পদত্যাগ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আমরা লাগাতার সংগ্রাম শেষে ২১ ফেব্রুয়ারি ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেই। অতঃপর ২২ ফেব্রুয়ারি সব রাজবন্দির মুক্তির পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। আর ওই বছরেরই ৫ ডিসেম্বর ওই উদ্যানে দাঁড়িয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি ঘোষণা করেন, ‘জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করছি আজ হতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ’ হবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, এক সময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু ও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। এক মাত্র বঙ্গপসাগর ছাড়া আর কোনো কিছুর সঙ্গে বাংলা কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। এই ঘোষণার পর থেকেই বাংলার নাম বাংলাদেশ। বাঙালির নতুন অভিযাত্রা।’
আর বাঙালির আরাধ্য বছর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো উচ্চারণ করলেন বাংলার স্বাধীনতা। দৃঢ়কণ্ঠে জাতির জনক ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ১৪ কোটি হাতকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে দেশ-মাতৃকাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিলেন বঙ্গবন্ধু, কবির ভাষায়, ‘বুক যার বাংলাদেশের হৃদয়’।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে তার সহকর্মীরা পালানোর জন্য শত অনুরোধ করলেও বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বিপদের মুখে রেখে আমি যাব না। মরতে হলে আমি এখানেই মরব। বাংলা আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়।’ আর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের (১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নিউইয়র্ক টেলিভিশনে ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের ‘আপনার সবচেয়ে বড় গুণ কি’ প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেশের মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা। আবার বড় দুর্বলতা কি প্রশ্নের জবাবেও তিনি বলেছিলেন, তাদের প্রতি আমার প্রগাঢ় ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু স্বপ্ন ছিল- সোনার বাংলা গড়া। তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলাদেশকে, ভালোবেসেছিলেন বাংলাদেশের মানুষকে। আর তাই তো নির্ভয়ে বলতে পেরেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ও আমি বলব- আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’

কথা রেখেছেন জাতির পিতা। দেশি-বিদেশি চক্রান্তের সামনেও ছিলেন নির্ভীক। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও গেয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়ী গান। পিতৃহন্তারকদের বুলেটে প্রাণ হারানোর সময়ও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি বাঙালির জাতির পিতা। বরং বিশাল বুক পেতে দিয়েছেন আঠারোটি নির্মম বুলেটের সামনে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জন্মভূমির পুণ্য মাটিতে লিখে গেছেন রক্তাক্ত ইতিহাস। রক্ত দিয়েই শোধ করেছেন রক্তের ঋণ। ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে আজ সেই রক্তাক্ত আগস্ট। বাঙালির শোকের মাসের শুরু। বিনম্র শ্রদ্ধায় অবনত মস্তকে জাতি শ্রদ্ধা জানাবে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

No comments: