হাকালুকির দুঃখ যে বাঁধ

সাইফুল ইসলাম সুমন, জুড়ী থেকে: সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাকালুকি হাওর সাগরে রূপ নিয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে এসব এলাকার মানুষ পানিবন্দি। এলাকাবাসী বলছেন, জুড়ী নদী পলিতে ভরাট হওয়া, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ওই নদীর শাখার মোহনায় ‘বুড়িকিয়ারি’ বিলের কাছে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ এবং সেখানে মূল নদীর মোহনার কাছে স্থাপিত দুটি ইটভাটার কারণে হাওরের পানি দ্রুত কুশিয়ারা নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। এর ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসী, সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হয়। এতে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে তিনটি উপজেলায় হাকালুকি হাওর এলাকার প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এর পর থেকে জুন মাস পর্যন্ত আরো কয়েক দফা টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নেমে হাওরপাড়ের কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল, কাদিপুর, ব্রাহ্মণবাজার, বরমচাল, ভাটেরা ও জয়চন্ডী ইউনিয়ন এবং কুলাউড়া পৌর শহরের আংশিক, জুড়ীর জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন এবং বড়লেখার তালিমপুর, সুজানগর, দাসেরবাজার ও বর্ণি ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক গ্রাম বন্যাক্রান্ত হয়ে পড়ে। কুলাউড়া-জুড়ী-বড়লেখা সড়কের বিভিন্ন স্থানও তলিয়ে যায়। এ অবস্থায় জুন মাসের শেষ দিকে ওই সড়কে বাস ও অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জলাবদ্ধ লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে আশপাশের উঁচু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। জুড়ীর জায়ফরনগর উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ৩০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেয়া দীঘলবাক গ্রামের অনন্ত বিশ্বাস বলেন, ‘অতো দিন পানির মাঝেও বাড়িত আছিলাম। গত ১ সপ্তাহ ধরি পানি বেশি অই যাওয়ায় আর ঘরো টিকতাম পারছি না। ইখানে আইয়া উঠছি।’ কুলাউড়ার ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির বলেন, এপ্রিল মাস থেকে তার এলাকার মানুষ পানিবন্দি। পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় হাওরে পানি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু, নামছে খুব ধীরে। কুলাউড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী বলেন, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দেড়-দুই মাস ধরেও কিছু পরিবার আছে। শাহ-নিমাত্রা রাবার বাগানের চেয়ারম্যান আলহাজ আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, হাকালুকি হাওরের পানি হাওরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত জুড়ী নদী হয়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে নিষ্কাশিত হয়। জুড়ী নদী পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। এ ছাড়া ২০০৪ সালের দিকে ফেঞ্চুগঞ্জে জুড়ী নদীর শাখার মোহনায় বুড়িকিয়ারি বিলের কাছে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। সেখানে মূল জুড়ী নদীর মোহনায় পাশে দুটি ইটভাটা আছে। ইটভাটার খোয়া নদীতে ফেলে রাখা হয়। এসব কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টি হলে এখানে বন্যা হয়ে যায়। এবার অবশ্য বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

No comments: