ত্রাণের জন্য হাহাকার : সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি

ডেস্ক সংবাদ : অকালবন্যা হাওর ডুবির হাহাকার না ঘুচতে না ঘুচতেই আবারও বন্যার শিকার সিলেট। সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির ওপর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর দিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদনটি।

সিলেট থেকে ইয়াহ্ইয়া মারুফ জানান, সিলেটে আরো তিন থেকে চারদিন বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি ও অব্যাহত পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল সোমবারও সিলেটে নদ-নদীগুলোর পানি বেড়েছে। নতুন করে তলিয়ে ৎগেছে আরো কয়েকটি এলাকা। বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ। ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন পানিবন্দিরা। সিলেটের ওসমানী নগরে ব্যাপক হারে পানিবাহিত রোগ ও ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলায় সরকারি কোনো হাসপাতাল না থাকায় রোগাক্রান্তরা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে ভিড় জমাচ্ছেন। এলাকার স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সাধ্যমত সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। কুশিয়ারা নদীর পানির স্তর ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার ফলে সোমবার নতুন করে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার চৌদ্দটি গ্রাম। বাড়ির রাস্তা-ঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রামবাসীর। বন্যাকবলিত গ্রামগুলো হচ্ছে- মির্জানগর, মানিকপুর, ইনাত আলীপুর, রাউতকান্দি, সিকন্দরপুর, পানিগাঁও, রাখালগঞ্জ, খালোমুখ, ভাঙ্গি, জলকরকান্দি, পরাইরচক, মোল্লাগ্রাম, মোগলাবাজার, হাজীপুর।

সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ৩ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত সিলেটে প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে টিলা ধসেরও শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বরাক বেসিনে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আরো দুদিন পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে কুশিয়ারার পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, উজানে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে টানা বর্ষণের কারণে সিলেটের কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি বাড়তে থাকে। বর্তমানে দুটি নদীর সবকটি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
এর মধ্যে কুশিয়ারা নদীর পানি ঢুকে জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। উজানে টানা বর্ষণ হওয়ায় সোমবারও বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, কুশিয়ারা নদীর পানি অমলশীদ পয়েন্টে ৮৫ সেমি, শেওলা পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার এবং শেরপুর পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অকাল বন্যায় বোরো ফসলহানির রেশ না কাটতেই এবারের বন্যায় আবার বিপাকে পড়েছেন সিলেট অঞ্চলের কৃষকরা। এবার বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে আউশ ধান। এ পর্যন্ত সিলেট জেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার। গত রোববার সকালে বন্যা মোকাবেলায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ তথ্য জানান তিনি। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন সিলেটের ৬ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ।

বন্যার কারণে রোববার জেলার ১৬১টি প্রাথমিক ও ১৩টি মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ৬ উপজেলায় ৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ৮৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
সরজমিন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার পর সেসব এলাকার মানুষের ত্রাণ না পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা গেছে। বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ এখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন। বন্যাদুর্গত এলাকার অল্প সংখ্যক মানুষ ত্রাণ পেলেও সিংহভাগ মানুষের কাছেই ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ফলে এসব মানুষ রয়েছেন চরম দুর্ভোগের মধ্যে। বন্যাদুর্গত কিছু এলাকায় মানুষের কাছে ত্রাণের চাল পৌঁছালেও আগুন জ্বালিয়ে চাল সিদ্ধ করার সুযোগ না থাকায় অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার প্রদানের দাবি তাদের। ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর গ্রামের ছমিরন বেগম জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তিনি পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি। ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের বাসিন্দা দিনমজুর রফিকুল ইসলাম জানান, বাড়িতে পানি ওঠে যাওয়ায় বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার পরে কোনো ত্রাণ তিনি পাননি। উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাজও মিলছে না। ফলে বেকার অবস্থায় পরিবার নিয়ে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।

বালাগঞ্জের সুনামপুর এলাকার কৃষক আবদুর রহিম জানান, গেল বন্যায় তার বোরো ফসল তলিয়ে যায়। এবার আউশ ফসল তলিয়ে গেছে। তার বাড়িতও পানি ওঠেছে। এখন অসহায় অবস্থায় আছেন। কোনো ত্রাণ তার কাছে পৌঁছায়নি।
ফেঞ্চুগঞ্জ সদরের প্রতিমা রাণী বিশ্বাস জানান, এক মাস ধরে তার ঘরে পানি রয়েছে। ঘরের মধ্যে মাচা বেঁধে তার আসবাবপত্র রেখেছেন। পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করলেও তাদের খোঁজ নিতে কেউ আসেনি।
ত্রাণের বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মুনিম জানান, তার ইউনিয়নে বন্যাদুর্গতদের জন্য আড়াই মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছেন। এই চাল দিয়ে আড়াইশ লোককে হয়তো ত্রাণ দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু তার ইউনিয়নে কয়েক হাজার বন্যার্ত পরিবার ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অপরদিকে, বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাপক হারে পানিবাহিত রোগ ও ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলায় সরকারি কোনো হাসপাতাল না থাকায় রোগাক্রান্তরা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে ভিড় জমাচ্ছেন। এলাকার স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের সাধ্যমত সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন।
গোয়ালাবাজার এলাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়- পেটের পীড়া, ডায়রিরয়া, প্রচণ্ড জ্বর, সর্দি, কাশিসহ চর্মরোগে ভোগছেন তারা। চিকিৎসকরা জানান, ইদানিং পানিবাহিত রোগ আক্রান্ত এবং ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শিশু রোগীর সংখ্যাও বেশি।

সিলেটের রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অসিত চন্দ্র দাস বলেন, শিশুদের জ্বর আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ ঋতু পরিবর্তন। ৫-৭ দিনের মধ্যে এই জ্বর ভালো হয়ে যায়। এ সময় সাধারণত প্যারাসিটামল খাওয়ানো যেতে পারে। তবে শ্বাসকষ্ট থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে। তিনি আরো বলেন, এ সময় বড়রাও ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জ্বরে ভোগতে পারেন। তাই অসুস্থ ব্যক্তিদের শিশুদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং শিশুদের কাছে হাছি ও কাশি দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুদের ডায়রিরার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে বিশুদ্ধ পানি পানসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. রাহাত আনোয়ার জানান, জেলার বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য ১৩৭ টন চাল এবং নগদ ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ত্রাণের কোনো অভাব নেই। প্রয়োজনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আরো ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হবে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। বন্যার্তদের সাহায্যে সরকারের পাশাপাশি সমাজের ধনী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

মৌলভীবাজার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
বিকুল চক্রবর্তী, মৌলভীবাজার প্রতিবেদক : দক্ষিণ পশ্চিমা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার সীমান্ত রেখায় প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় মৌলভীবাজারের ৫টি ও সিলেটের ৫টি উপজেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য সূত্রে জানান যায়, চলমান কয়েকদিনের টানা থেমে থেমে টানাবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী বড়লেখা, জুড়ি ও কুলাউড়ার একাংশের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। আর মৌলভীবাজারের রাজনগরের ৩টি ইউনিয়নে এবং মৌলভীবাজার সদরের ২টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এর ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এ জেলার ৫ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। এদিকে পানিবন্দি এসব মানুষের জন্য অপ্রতুল ত্রাণ ব্যবস্থা এবং গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন সেখানকার মানুষ।

অপর দিকে কুশিয়ারর অপর অংশে সিলেট জেলার উসমানি নগর, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এলাকার একাধিক ইউনিয়নের শত শত গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন এ সব উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ।
গতকাল হাওর এলাকায় সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, চারিদিকে তীব্র পানির স্রোত, কোথাও উত্তাল ঢেউ ভেঙে দিচ্ছে ঘরবাড়ি। বসবাসের শেষ সম্বলটুকু ঢেউয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণান্তর চেষ্টা করছেন আক্রান্ত মানুষ। গ্রামের পর গ্রাম পানিবন্দি হয়ে এই মানুষগুলো কতটা অসহায় তা- চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শুধু মানুষ নয়, তাদের সঙ্গে গবাদিপশু গুলোও ভুগছে তীব্র খাদ্য সংকটে। উঁচু জায়গা না থাকায় গবাদিপশু চড়ে খেতে পাড়ছে না। ফলে মানুষের সঙ্গে তারাও পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

ভেসে থাকা একখণ্ড জায়গাতে পরিবারের সব মানুষ, গরু, ছাগল, হাস-মুরগিসমেত বসবাস করছেন।
এদিকে হাকালুকির উত্তাল ঢেউয়ে মানুষের ঘরবাড়িতে থাকতে পারছে না। তারপরও মানুষ জীবনকে বাজি রেখে মাচার উপর ঠাঁই নিয়েছে।

এদিকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম জানান, মৌলভীবাজারে এটি পঞ্চম দফা বন্যা। বর্তমানে জেলার ৫টি উপজেলার প্রায় ১৮টি ইউনিয়নে দুই শতাধিক গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়ে যাওয়া বলে জানান। তিনি জানান, রোববার পর্যন্ত ১৮টি বন্যা আশ্রায়ণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। যার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে ৪১৩টি পরিবার যার লোক সংখ্যা ২৬১২ জন। সোমবারে আরো বেশ কয়েকটি পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে সংযুক্ত হয়েছে। তাদের প্রত্যেককেই পর্যাপ্ত ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা রয়ে গেছেন তাদের কাছেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, গত এপ্রিল থেকে মৌলভীবাজার জেলায় ৬৫০ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। নগদ বিতরণ করা হয়েছে ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও ৫৯ হাজার দুশত পরিবারকে ঈদ উপলক্ষে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ হাজার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে তিনমাস ধরে দেয়া হচ্ছে ৩০ কেজি করে চাল ও নগদ ৫ শত টাকা। এছাড়াও ৩০ জুন পর্যন্ত চালু ছিল ১৭টি সেন্টারে ১৫ টাকা কেজি দরে ওএমএস এর চাল বিক্রয় সেন্টার। প্রতি সেন্টারে প্রতিদিন ২০০ পরিবারকে চাল দেয়া হয়।

জেলা প্রশাসক জানান, এই কয়দিন ধরে তিনি মৌলভীবাজারের হাওর ও পানিবন্দি এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের ফান্ড থেকে এ পর্যন্ত ৪ শত পরিবারকে চিড়া, মুড়ি, চিনি, বিস্কুটসহ ড্রাই খাবারের প্যাকেট বিতরণ করেছেন।
এদিকে হাওরের নিম্মাঞ্চলের পানিবন্দিদের মাঝে এখনো কোনো স্থানে ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেছেন সেখনকার বাসিন্দারা। আর যে সব সংস্থা, ব্যক্তিরা ত্রাণ নিয়ে আসছেন তারাও শুধু মাত্র উপজেলা শহরের প্রধান সড়কের পাশে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

বন্যার পানি দিন দিন এতই বৃদ্ধি পাচ্ছে, অত্রাঞ্চলের বেশিরভাগ বাড়িঘর, রাস্তঘাট, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থান তলিয়ে গেছে। গৃহপালিত গরুবাছুর নিয়ে থাকার ব্যবস্থা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানিবন্দি মানুষজন মাথা পেতে কোনো রকমে দুর্যোগের মধ্যে বেঁচে আছেন। এমতাবস্থায় তাদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। অত্রাঞ্চলের বন্যার পানি দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু ত্রাণ সহায়তার দরকার তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এ ব্যাপারে ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, গত এপ্রিলের আকস্মিক বন্যায় হাকালুকি হাওরে বন্যায় বিশেষ করে ভুকশিমইল ইউনিয়নের হাজার হাজার একর বোরো ধান পচে বিনষ্ট হয়। সে বিপদ কাটতে না কাটতে গত দুই সপ্তাহ ধরে আবারো বন্যা দেখা দিয়েছে হাকালুকি হাওরে। আর এ বন্যায় হ্ওার পারের ভুকশিমইল ইউনিয়নের শত শত মানুষের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। কিন্তু সরকারি ত্রাণ একবারেই অপ্রতুল।
জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু চৌধুরী জানান, পাহাড়ি ঢলে জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যে জায়ফরনগর ইউনিয়ন বেশি প্রায় ২২টি গ্রাম পানিবন্দি।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘গত কয়েকদিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে হাওরের পানি বাড়ছে। ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে মানুষের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৩০টি পরিবার নিরাপদে বিভিন্ন স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার, স্যালাইন, নগদ ৫০০ টাকা ও বিনামূল্যের ১০ কেজি করে চাল বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, কুশিয়ারা পানি সোমবার বিপদসীমার (শেরপুরে) ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনগর কাউয়াদীঘির পাশে ২৪ থেকে ২৬ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় ২৫ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যার ফলে হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওরের পানি নামতে পারছেন। এতে বন্যা স্থায়ী হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি সবসময়ই একুট ধীরে নামে তাই এ জেলার বন্যা আরো একটু স্থায়ী হবে। তবে আগামী কয়েকদিন যদি খড়া পাওয়া যায় তাহলে এ অবস্থা কেটে যাবে বলে জানান তিনি।

বড়লেখায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : পানিবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকায় হাকালুকি হাওরসহ বড়লেখা উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সবজিসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে পানিবন্দি দরিদ্র পরিবারগুলো।

বন্যা পরিস্থিতির সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে সোমবার রাতে মৌলভীবাজারে আসছেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। রাত ৯টায় তিনি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে।

তালিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস, সুজানগর ইউপি চেয়ারম্যান নসিব আলী জানান, গতকাল সোমবার থেকে হাকালুকি হাওর ও সংলগ্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে। এতে করে বড়লেখা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।

উপজেলার বন্যাকবলিত ২৪৫টি পরিবার উপজেলার ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলার ৯৮টি গ্রামের প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। ঘরবাড়ি পানিতে থলিয়ে যাওয়ায় রান্নাবান্না করার মতো শুকনো কোনো জায়গা নেই। এতে করে সীমাহীন দুর্যোগ-দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে জন-জীবনে। দরিদ্র পরিবারগুলো পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ায় খাদ্যাভাবে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে। অনেকগুলো গ্রামের বাজার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। তা ছাড়া উপজেলা সদরের সাথে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রামীণ বাজারগুলোতে। গ্রামীণ বাজারগুলোতে শাকসবজি-তরকারি সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে। যারা কষ্ট পরিবহন খরচ বেশি দিয়ে উপজেলার শহর থেকে শাকসবজি-তরকারি ও নিত্যপণ্য নিতে সমর্থ হচ্ছে তারা ওগুলো আবার বেশি দামে বিক্রি করছেন। সুজানগরের আবদুল জলিল, বর্নির সাইদুর রহমান, গগড়ার মানিক দাস, আলমাছ উদ্দিন জানান, গ্রামীণ বাজারে ও গ্রামের দোকানে প্রতি কেজি খোলা আটা ৩৫ টাকা, আলু ২৫-২৮ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, ঝিঙ্গা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাওরে বেশি পানি থাকায় জেলেরা মাছ ধরতে পারছে না।

বড়লেখা উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা আজেদুর রহমান জানান, বন্যা পরিস্থিতির সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে সোমবার রাতে মৌলভীবাজারে আসছেন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। রাত ৯টায় তিনি জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এ জন্য প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এ পর্যন্ত উপজেলার ২৮৫টি গ্রামের মধ্যে ৯৮টি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। গ্রামগুলোতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। সহায়তা সম্পর্কে তিনি জানান, এ পর্যন্ত জি আর চাউল ১০৫ মেট্রিক টন ও জি আর ক্যাশ ৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে দুর্গত পরিবারগুলোর মধ্যে। সহায়তার এ পরিমাণ কি যথেষ্ট এ প্রশ্নের জবাবে তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ সহায়তা চেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য আমরা সরকারের কাছে প্রেরণ করছি। তবে মৌলভীবাজারে মন্ত্রীর আগমণের খবর নিশ্চিত হতে একাধিকবার মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলামের মোবাইল ফোনে ফোন দিলে তিনি ফোন ধরেননি। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুনের ফোনে বারবার ফোন দিয়ে ব্য স্ত পাওয়া যায়, পরবর্তীতে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন।

মৌলভীবাজারে বন্যায় ১৮৩ বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ
সাইফুল ইসলাম সুমন, জুড়ী থেকে : অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলায় বন্যা ইতোমধ্যে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ওই তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি, বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জেলার ১৮৩টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় তলিয়ে গিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ২৯টি স্কুলে খোলা হয়েছে বন্যাকবলিত গ্রামের মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া ছেড়ে এখন জীবন রক্ষার সংগ্রামে নেমেছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, এখন পর্যন্ত বন্যায় মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলার ১৪২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় তলিয়ে গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে বড়লেখায় ৬০টি, কুলাউড়ায় ৪৪টি, জুড়ীতে ২০টি, রাজনগরে ২৪টি ও সদর উপজেলায় ৪টি স্কুল তলিয়ে গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বড়লেখা, জুড়ী, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ২১টি স্কুলে খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। এর মধ্যে বড়লেখায় ৭টি, কুলাউড়ায় ৫টি, রাজনগরে ২টি ও জুড়ীতে ৭টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। ওই উপজেলাগুলোর প্রায় অর্ধলক্ষাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানায়, বন্যায় জেলার বড়খেলা উপজেলায় ২০টি, কুলাউড়ায় ৮টি ও জুড়ীতে ১৩টি বিদ্যালয় তলিয়ে গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্যাকবলিতদের জন্য জুড়ী উপজেলায় ৪টি, বড়লেখায় ২টি ও কুলাউড়ায় ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রেখে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ওই ৩ উপজেলার ৪৯টি স্কুলের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর লেখাপড়া এখন বন্ধ রয়েছে।

সরজমিন আলাপকালে জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও গ্রামের মক্তদীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হানী লিজা বলেন, বন্যায় আমাদের ঘর তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক গতিতে লেখাপড়া করতে পারছি না। অন্যান্য এলাকার সহপাঠীদের চেয়ে লেখাপড়ায় অনেক পিছিয়ে আছি। ওই ইউনিয়নের এক অভিভাবক রেজান আলী বলেন, বাড়ি তলিয়ে যাওয়ার কারণে ছাত্ররা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারছে না।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল আলিম বলেন, বন্যায় তলিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়ের বিল্ডিংয়ের অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানি বাড়লে এগুলোও তলিয়ে যাবে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল ওয়াদুদ বলেন, হাওর পাড়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং তলিয়ে যাওয়া স্কুলের ছাত্রদের লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে।

No comments: