ত্রাণের পথ চেয়ে বানভাসিরা

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য ও সাইফুল ইসলাম সুমন, বড়লেখা থেকে : দুপুর ১২টা। ভারতের করিমগঞ্জ সীমান্তবর্তী বড়লেখার সোনাই নদীর তীরে ইসলামপুর আশ্রয়কেন্দ্র। বন্যার্তদের অবস্থা সরজমিন দেখতে সেখানে হাজির হলেন স্থানীয় সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ শাহাব উদ্দিন আহমেদ। সঙ্গে এনেছেন যৎসামান্য ত্রাণসামগ্রীও। তাকে দেখে মুহূর্তে ঘিরে ধরলেন প্রায় দেড়শ আবালবৃদ্ধবনিতা। ১৫ দিন আগে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা এই বন্যার্তদের আগে কেউ ত্রাণ দেয়নি। হুইপকে কাছে পেয়ে তারা সবাই থালা-বাটি-প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নিয়ে লাইন ধরে সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন দু-মুঠো ত্রাণের আশায়।

হুইপশাহাব উদ্দিন গতকাল বুধবার এ আশ্রয়কেন্দ্রের ১০২ জনকে ১০ কেজি করে চাল দেন। এ চাল পেয়েই তারা খুশি। ইসলামপুরের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বললেন, ‘গত ১৫ দিন ধরি আমরা এই ইস্কুলও (আশ্রয়কেন্দ্রে) থাকরাম। কেউ আমরারে খাওন দিছইন না, চাউল দিছইন না। অউ পয়লা (প্রথম) হুইপসাব আমরারে চাউল দিছইন, এর লাগি আমরা খুশি।’ পাশে দাঁড়িয়ে একই গ্রামের নাজিম উদ্দিন বললেন, ‘তিনদিন পরে আইজ (বুধবার) মাদানে (দুপুর) আমি বউ আর হুরুতারে (সন্তান) লইয়া ভাত খাইছি।’ এতদিন কী খাইছেন জানতে চাইলে তার কথা- ‘৩শ টাকার মুরগি দেড়শ টাকায় বেচিয়া আটা কিনছি, অউ আটা দিয়া গত তিনদিন খাইয়া বাঁচিছি’। তিনি বলেন, ‘আইজ (আজ) ভাতও খাইছি আবার হুহপ সাবর কাছ থাকি চাউলও পাইছি। আইজ আল্লায় আমরার মুখা চাইছইন।’

জানতে চাইলে বড়লেখা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. শাহাব উদ্দিন ভোরের কাগজকে বলেন, বন্যার্তদের খাদ্য সাহায্যের জন্য প্রচুর চাল দরকার। চালের কিছুটা সংকট আছে। তবু চালের জন্য খাদ্যমন্ত্রীকে বলেছি। খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, সাময়িক একটু অসুবিধা হবে। চাল আমদানি করে আনার পর পর্যাপ্তভাবে দেয়া যাবে।

ইসলামপুর থেকে বেরিয়ে নৌকায় যেতে যেতে চোখ পড়ে আরও কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র। চারদিকে থইথই পানি। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ঘরের ভিটায়। ঘরের বেড়া ভেঙে পানি স্রোতে মিশে যাচ্ছে। বাড়িঘরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কারো উঠানে, কারো ঘরে পানি। যোগাযোগে নৌকাই একমাত্র মাধ্যম। পূর্ব দৌলতপুর আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, সেখানেও আগে ত্রাণ যায়নি। গতকালই এসব জায়গায় হুইপ শাহাব উদ্দিন আওয়ামী লীগের দলীয় তহবিল থেকে ত্রাণ দিয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব জায়গায় সরকারিভাবে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। কোথাও আবার দেয়া হচ্ছে চালের বদলে গম। এই গম আবার বন্যার্তদের গলার কাঁটা হয়ে উঠছে।
বড়লেখার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সেলিম মাহমুদ খান বলেছেন, বন্যার্তদের জন্য এই ইউনিয়নে এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী এসে পৌঁছেনি। কিছু গম দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই গম খাওয়ার অনুপযোগী হওয়ায় ফেলে রাখা হয়েছে।

সবাই ত্রাণ পাচ্ছে না : বড়লেখার সুজানগর ও তালিমপুর ইউনিয়ন সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অনেকের ভিটেবাড়ির মাটি পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ঘরের বেড়া ভেঙে পড়েছে। অনেকেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়েই বাড়িতে রয়ে গেছেন। অনেকে কচুরিপানার বেড়া দিয়ে ভিটাবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। বাড়ির নলকূপ ডুবে যাওয়ায় এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এরকম চিত্র শুধু বড়লেখার এ কটি ইউনিয়নের নয়, মৌলভীবাজারের পুরো বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার একাংশের। এখানকার প্রায় পৌনে তিন লাখ মানুষ বানভাসি। বন্যায় কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন কেউ পানির মধ্যে নিজেরই বাড়িতেই পানির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন। এই বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এখানকার জনজীবন। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, হাটবাজারে পানি আর পানি। অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্গত এলাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেকেই। সরকারের মন্ত্রী, এমপিরা দুর্গত এলাকাগুলো পরিদর্শন ও বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ালেও তাদের হাতে ত্রাণসামগ্রী দেননি কেউই। শুধু সড়কের পাশে কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে কিছুকিছু ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। প্রত্যন্ত এরাকার বন্যার্তরা কিছুই পায়নি। ত্রাণের স্বল্পতা, বণ্টনে বিলম্ব ইত্যাদির সঙ্গে এটিও দুর্গতদের হতাশার একটি কারণ।

রয়েছে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম বিশৃঙ্খলার অভিযোগও। তা ছাড়া প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন উপদ্রুত এলাকার লোকজন। মন্ত্রীরা আসছেন, বরাদ্দের ঘোষণাও দিচ্ছেন, ঘুরছেন, দেখছেন, কিন্তু ভুক্তভোগীদের দুর্দশা লাঘব হচ্ছে না বরং বাড়ছে। তারা ত্রাণ পাচ্ছেন না, পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি অল্প। এ অবস্থায় তারা ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে আছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্তদের নাম তালিকাভুক্ত করতে ইউপি সদস্যরা অর্থ আদায় করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় বন্যার্ত অসহায় লোকজনের পরিবর্তে আর্থিক সচ্ছল ব্যক্তিদের ঘরে ত্রাণের চাল, টাকা যাচ্ছে- এমন অভিযোগও আসছে। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বললেন, ত্রাণ বিতরণে কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না। ত্রাণ সচিবও ত্রাণ বিতরণের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে নিষেধ করেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

অসহায় মানুষ : সুজানগর ইউনিয়নের আজিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ভোলারকান্দি গ্রামের মাসুক আলী বলেন, আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। তিনি জানিয়েছেন, দুই দফায় ৫০০ টাকা করে নগদ এক হাজার টাকা ও একটি লুঙ্গি পেয়েছেন। মুর্শিদাবাদকুরা গ্রামের মায়ারুন বেগম বলেন, ‘হাইনজা (সন্ধ্যা) বাদে আফাল উঠে। সবকিছু ভাঙিচুরি লইয়া যায়।’ একইরকম দুর্ভোগের কথা বললেন এ গ্রামের আলফাতুন বেগমও। তালিমপুর ইউনিয়নে শ্রীরামপুর গ্রামের বিজয় বিশ্বাস বলেন, ‘ঘরের নিচ ভাঙি গেছে। পরিবার, নাতি-নাতনি সব কুটুমবাড়ি পাঠাই দিছি। আমি ঝুঁকি নিয়া বাড়িত রইছি। রান্নাঘর হাওরে। খাওয়া-দাওয়া খুব কষ্টে চলের।’ একই গ্রামের মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ঘরসহ ভিটা, কাপড়-চোপড় সব আফালে (ঢেউ) ভাসাই নিছে গি। পরর ঘরও থাকরাম। এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাইনি।’
জানতে চাইলে সুজানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নছীব আলী জানালেন, আমার ইউনিয়নে ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। গত ১৫ দিনে আমি মাত্র ৫ টন গম পেয়েছি। এই গমই মানুষকে দিয়েছি। মানুষ পেটের ক্ষিদায় এই কাঁচা গমই খাচ্ছে। তবু কিছু হচ্ছে না। সরকারিভাবে ত্রাণ না এলে আমি কোথা থেকে দেব?

বড়লেখায় রিলিফের গম বন্যাদুর্গতদের গলার কাঁটা : বড়লেখা উপজেলার শতাধিক গ্রামের পানিবন্দি হাজার হাজার দুর্গত মানুষের গলার কাঁটা সরকারি রিলিফের গম। ঘরে কোমর পানি, নেই রান্না ও ঘুমানোর জায়গা। হাতে নেই টাকা। এরমধ্যে সরকারি রিলিফ হিসেবে চালের বদলে দেয়া হচ্ছে ১০ কেজি করে গম। দুর্গতরা রিলিফ নিতে ইউনিয়নে গিয়ে যখনই দেখেন গম, তখন অনেকে তা ভাঙানোর ঝক্কি-ঝামেলা ও অর্থসংকটের কারণে না নিয়েই ফিরে যান। বড়লেখার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে দেখা গেছে, রিলিফ নিতে কয়েকশ’ বন্যাদুর্গত মানুষের ভিড়। রাঙাউটি গ্রামের হরলাল দাসসহ কয়েকজন জানালেন, প্রায় আধা কিলোমিটার কোমরপানি সমান রাস্তা দিয়ে হেঁটে ইউনিয়নে রিলিফ নিতে গিয়ে দেখি চালের পরিবর্তে গম দেয়া হচ্ছে। এখন এগুলো কোথায় ভাঙাবো, গত ২-৩ মাস থেকে দিনে একবেলা মুখে খাবার দিতে পারছি না সেখানে গম ভাঙানোর টাকা পাব কোথায়? আগে জানলে এগুলো নিতেই আসতাম না। গম ভাঙানোর টাকা না থাকায় কয়েকজন নারী গম না নিয়ে ফিরে গেছেন। রাফিয়া বেগম জানান, সরকারি রিলিফের এ গম আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য গলার কাঁটা। বন্যায় বড়লেখার তালিমপুর ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হচ্ছে তালিমপুর ইউনিয়নের হাল্লা, ইসলামপুর, কুটাউরা, বাড্ডা, নুনুয়া, পাবিজুরি, শ্রীরামপুর, মুর্শিবাদকুরা, পশ্চিম গগড়া, পূর্ব গগড়া, বড়ময়দান, গাগড়াকান্দি, তেলিমেলি, গোপালপুর, হাউদপুর, সুজানগর ইউনিয়নের দশঘরি, রাঙ্গিনগর, ঝগড়ি, বাড্ডা, পাটনা, ভোলারকান্দি, উত্তর বাঘমারা, বাঘেরকোনা, চরকোনা, পশ্চিম সালদিগা, বর্ণি ইউনিয়নের পাকশাইল, সৎপুর, কাজিরবন্দ, নোওয়াগাঁও, উজিরপুর এবং দাসেরবাজার ইউনিয়নের চানপুর, অহিরকুঞ্জি, উত্তরবাগীরপাড়, দক্ষিণবাগীরপাড়, পানিশাইল, ধর্মদেহী, চুলারকুড়ি, কোদালী, ধলিরপাড়, নেরাকান্দি, মাইজমজুড়ি, মালিশ্রী ইত্যাদি গ্রাম। সব গ্রামেই চালের বদলে গম দেয়া হচ্ছে।

তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস বলেন, ‘অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমার ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ এলাকা বন্যাকবলিত। আমার বাড়িতে পানি উঠেছে। গত ১৫ দিনের মধ্যে তার ইউনিয়নে কোনো সরকারি চাল আসেনি। শুধু ৫ টন গম এসেছে। সেই গমও দেয়া যাচ্ছে না। কারণ মানুষের ঘরে ঘরে পানি, এই গম নিয়ে মানুষ কী করবে?
কুলাউড়া-বড়লেখা সড়কে ভরসা নৌকা-ট্রাক্টর-পিকআপ-পাওয়ার টিলার : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-জুড়ী-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কে চলাচলকারী তিন উপজেলার জনসাধারণের এখন একমাত্র ভরসা ট্রাক্টর, পিকআপ আর পাওয়ার টিলার। ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ঈদের ১ সপ্তাহ আগে থেকে এ সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যায়। এ সড়কের জুড়ী উপজেলা কমপ্লেক্সের সম্মুখভাগ, চৌমুহনী, উত্তর জাঙ্গীরাই, বাছিরপুর, পশ্চিম হাতলিয়াসহ সড়কের ১০টি স্পট পানিতে তলিয়ে যায়। রাস্তায় পানি বেড়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোয়াচ্ছেন। বিশেষ করে শ্রমজীবী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা পড়েছেন মহাবিপাকে। জরুরি কাজে যাতায়াতকারীরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া গুণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক্টর, পিকআপ আর পাওয়ার টিলারে চলাচল করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বড়লেখার এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, জুড়ী থেকে বড়লেখায় অটোরিকশায় জনপ্রতি ভাড়া ৪০ টাকা। ট্রাকে ১০০ টাকা করে নিচ্ছে। ট্রাকচালক আবুল কালাম বলেন, ‘ভাই, রিস্ক (ঝুঁকি) নিয়া গাড়ি চালাইয়ার। রাস্তায় গাত (গর্ত) বেশি। গাড়ির যন্ত্রপাতি নষ্ট অই যায়। এর লাগি ভাড়া একটু বেশি নিয়ার।’ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, পানির কারণে রাস্তা মেরামত করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

No comments: