মৌলভীবাজারে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম

সাইফুল ইসলাম সুমন: মৌলভীবাজার থেকে জানান, মৌলভীবাজার জেলায় তৃতীয়বারের মতো বন্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বন্যায় কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ২৪টির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়ক পথের কয়েকটি স্থান পানিতে ডুবে যাওয়ায় বড়লেখার সঙ্গে জেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ অনেকটা বন্ধ রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে তিন উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষাধিক মানুষ। গবাদিপশুগুলোর বাসস্থান ও চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে খেটে খাওয়া মানুষ সব হারিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। 

জানা যায়, তিন উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০টি, প্রাইমারি ও মাদরাসা পর্যায়ে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকেছে। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ছাড়াও স্কুলের শ্রেণিকক্ষ ও অফিস রুম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ঈদের বন্ধ শেষে প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা হলেও বন্যার কারণে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা এ বছর চৈত্রের অকাল বন্যায় যেমন একমুঠো বোরো ধান ঘরে তুলতে পারেননি, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওরের মাছ, হাঁস, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। সর্বশেষ আউশ ধান ও আমনের বীজতলার ক্ষতিতে এলাকার কৃষি ও মৎস্যজীবীরা চরম বিপাকে। হাওর পাড়ের ৩ উপজেলার মানুষ দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় এখন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর ২ থেকে ৬ ফুট পানিতে নিমজ্জিত। ইতিমধ্যে অনেকেই নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় জুড়ী উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবনের কার্যালয়ের ভেতরসহ কুলাউড়া পৌর এলাকার ৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। 

জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু চৌধুরী বলেন, ‘আমি এই মুহৃর্তে নৌকায় হাকালুকি হাওরের মাঝখানে আছি। দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজনকে খাবার দিয়ে এলাম। ২২ গ্রামের ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। পানি এখনো বাড়ছে। আমরা প্রশাসনের সবাই বন্যার্তদের সেবায় তত্পর রয়েছি। ’
 
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বি জানান, কুলাউড়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০-৮০টি গ্রাম পানিবন্দি। তার উপজেলা পরিষদেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সম্পূর্ণ পানির নিচে। এর ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। তিনি জানান, কয়েক দফা ত্রাণ দেয়া হয়েছে এবং এখনো অব্যাহত রয়েছে। 

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুলাহ আল মামুন বলেন, ‘হাওরে এখনো পানি বাড়ছে। জাতীয় সংসদের হুইপ মো. শাহাব উদ্দিনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত সকল মানুষকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ’বড়লেখা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে অব্যাহত বন্যায় বর্নি, দক্ষিণবাগ, তালিমপুর ও সুজানগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এ উপজেলার প্রায় ৭০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ।

জুড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান গুলশান আরা চৌধুরী মিলি বলেন, আমাদের হুইপ শাহাব উদ্দিনের বিশেষ নজরে পর্যাপ্ত পরিমাণ জিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এত ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। এ ত্রাণগুলো কোনো বিদেশি নয়, সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পাওয়া গেছে। আমি নিজেও পানিবন্ধি, আমার বাসাও পানি, যার কারনে কয়েকদিন ধরে গাড়ি রেখে নৌকায় এসে অফিস করতে হচ্ছে।

বড়লেখা ও জুড়ী আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ এম শাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে মৌলভীবাজার জেলা। ইতোমধ্যে জেলার প্রত্যেক উপজেলাতেই সরকারি ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আগামীতে আরো ত্রাণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যা পেলে দুর্গত এলাকার মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।

No comments: