হাওরের পানি নামতে পারছে না : মৌলভীবাজারের ৫ উপজেলায় জলাবদ্ধতা শত শত পরিবারের মানবেতর জীবন

বিকুল চক্রবর্তী ও সাইফুল ইসলাম সুমন মৌলভীবাজার থেকে : দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি হয়ে মৌলভীবাজারে লক্ষাধিক মানুষ এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির পানি কুশিয়ারা নদী দিয়ে নামতে না পেরে তা বেড়ে জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার হাজার হাজার বাড়িঘর এখন পানির নিচে। রাজনগর উপজেলায় কাশিমপুর পাম্প হাউজের সেচ বন্ধ থাকায় কাউয়াদীঘি হাওরের পানি নামতে না পেরে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার প্রায় ১০ গ্রামের মানুষ রয়েছেন পানিবন্দি।

এদিকে বিয়ানীবাজার সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় বিঘ্নিত হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ। কাছাকাছি এলকায় পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পানির ওপরই বসবাস করছেন। জরুরি ভিত্তিতে এলাকাগুলোকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানালেন কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম।

জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বিগত ১৫-২০ দিন ধরে জুড়ীর নি¤œাঞ্চল প্লাবিত থেকে এখন শহরে পানি উঠেছে। বর্তমানে উপজেলা প্রাঙ্গণে প্রায় ৩ ফুট পানি। তার বাংলোর এক তলায় পানি উঠেছে। তিনি সিফট করে দ্বিতীয় তলায় উঠেছেন। তিনি জানান, জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর, পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নসহ হাওর এলাকার প্রায় ২০-২৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। তবে তিনি জানান, জুড়ীর নি¤œাঞ্চল প্রায় বছরই পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ বছর হাওরের পানি না নামায় মানুষকে একটু বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

তিনি জানান, মাইকিং করে ও চেয়ারম্যান-মেম্বরদের মাধ্যমে খবর দিয়ে যাদের বাড়িতে পানি উঠেছে তাদের বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে বলা হয়েছে। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ৬টি পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে এসেছে। এ সময় তিনি আরো জানান, পরপর ৪বার বন্যা হয় এ উপজেলায় এবং সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ জিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ-এর চাল দেয়া হয়েছে। এখনো ৫০ টন চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে গাড়ি চলাচলের রাস্তায় নৌকা নিয়ে অফিস করছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও সরকারি কর্মকর্তারা। আর শহরের বাড়িঘরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা রীতিমতো হতবাক করে দিয়েছে জুড়ী ও বড়লেখা শহর এবং শহরতলীর মানুষকে।

জুড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান গুলসানারা মিলি জানান, এত পানির অভিজ্ঞতা তার প্রথম। কয়েকদিন ধরে গাড়ি রেখে নৌকায় এসে তাকে অফিস করতে হচ্ছে।

এদিকে আশপাশে আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় হাওর পাড়ের হাজার হাজার পরিবার পানির ওপরই ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। জুড়ী উপজেলার ভেলাগাঁওয়ের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম, শাম্মি আক্তার জানান, বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে তাদের বাড়ির পাশের সবজি ক্ষেতও। এ অবস্থায় এবারের ঈদে তাদের পরিবারে ছিল না কোনো আনন্দ। হয়নি ঈদের সেমাই খাওয়া, ঈদের নামাজ আদায়ও।

এ এলাকাগুলোতে রয়েছে যেমন টয়লেটের সমস্যা তেমনি রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। বন্যা-দুর্গতদের সরজমিন দেখতে যাওয়া লন্ডন প্রবাসী খায়রুল ইসলাম জানান, এ মুহূর্তে জরুরি হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ এলাকায় স্থানান্তরিত করা।

বড়লেখা পৌরসভার মেয়র কামরান আহমদ জানান, বড়লেখা শহর অনেকটা উঁচু এলাকায়। এই বড়লেখা পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিবে তিনি ভাবতেই পারেননি। তিনি জানান, তার পৌর এলাকাসহ আশপাশের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এ মুহূর্তে পানিবন্দি। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণ দেয়া হলেও সবাইকে দেয়া সম্ভব হয়নি।

এ ব্যাপারে বড়লেখা ও জুড়ী আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ এম সাহাব উদ্দিন এমপি বলেন, কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে মৌলভীবাজার জেলা। ইতোমধ্যে জেলার প্রত্যেক উপজেলাতেই সরকারি ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আগামীতে আরো ত্রাণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে, যা পেলে দুর্গত এলাকার মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বড়লেখা উপজেলার সুজানগর, তালিমপুর ও বর্নি ই্উনিয়নসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অন্তত ২৫ গ্রামের মানুষ এখন পানিবন্দি। আর পানিবন্দি মানুষের জন্য সুজানগর সিদ্দিক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ও তালিমপুরে হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছেন। দুটি আশ্রয় কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত ৭০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন।

তিনি জানান, বড়লেখার সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের হুইপ এম সাহাব উদ্দিনের বিশেষ নজরে পর্যাপ্ত পরিমাণ জিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে এত ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। এ সময় তিনি জানান, এ ত্রাণগুলো কোনো বিদেশি নয়, সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পাওয়া গেছে।

এদিকে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বি জানান, কুলাউড়া উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০-৮০টি গ্রাম এখন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। তার উপজেলা পরিষদেও দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এসব ইউনিয়নের প্রায় ২০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা সম্পূর্ণ পানির নিচে। এর ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। তিনি জানান, কয়েক দফা ত্রাণ দেয়া হয়েছে এবং এখনো অব্যাহত আছে।

কুলাউড়ার বাসিন্দা অধ্যক্ষ শিপার উদ্দিন আহমেদ জানান, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হাকালুকির পানি নামছে না। ফলে চলমান বৃষ্টিতে এবং উজান থেকে নেমে আসা পানি হাকালুকিতে পড়ে হাকালুকি ক্রমশ ফুলছে। এতে করে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উঁচু অংশেও এখন দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার পাহাড়ি পানি দুটি নদী ও শতাধিক পাহাড়ি ছড়া দিয়ে হাকালুকিতে নামে। এসব ছড়া দিয়ে ভারতের পানিও নামে। আর হাকালুকি হাওরের পানি কুশিয়ারা নদী দিয়ে বের হয়। বর্তমানে কুশিয়ারা নদীর যে স্থান দিয়ে পানি নামে সেখানে বিপদসীমার ২৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তাই বের হতে না পেরে হাওরের পানি ফুলে চারপাশের গ্রামগুলো নিমজ্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, কুশিয়ারার পানি এখন নামতে শুরু করেছে। একদিন আগে কুশিয়ারার পানি প্রবাহিত হচ্ছিল বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে। গতকাল শুক্রবার তা নেমে এসেছে ২৯ সেন্টিমিটারে। এভাবে আর কয়েক দিনে হয়তো কুশিয়ারার পানি নেমে গেলে তখন অন্তত শহর ও শহরতলীর পানিও নেমে যাবে।

এদিকে কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরের পানি নামতে পারছে না। ফলে এ উপজেলার প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষ রয়েছেন পানিবন্দি। আর সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় রয়েছেন রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের অন্তেহরি গ্রামের মানুষ। একই কারণে সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের কাদিপুর গ্রামও পুরোপুরি পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এ ব্যাপারে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদরে চেয়ারম্যান নকুল দাশ জানান, কাশিমপুর পাম্প হাউজের মাধ্যমে কাউয়াদীঘির পানি নামানো হয়। কিন্তু কুশিয়ারার পানি পাম্পের মুখের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বর্তমানে পানি সেচ বন্ধ রয়েছে। এতে করে তার ইউনিয়নের ৭-৮টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন।

এ অবস্থায় ত্রাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সরকার হাওর পাড়ের লক্ষাধিক মানুষের পাশে দাঁড়াবে বলে আশায় দিন গুণছেন ভুক্তভোগীরা।

No comments: