জুড়ী নদীর ভাঙনে রাস্তা বিলীন

বিশেষ প্রতিনিধি: পাহাড়ি ঢলে পানি বেড়ে ও বালু তোলার কারণে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের জুড়ী নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের (রাস্তা) ৩০০ ফুট এলাকা ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। এখনই ভাঙন ঠেকানো না গেলে বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম শিলুয়ায় প্রায় এক হাজার পরিবারের বাস। জুড়ী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধটি তাঁরা রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০০৯ সাল থেকে পশ্চিম শিলুয়াসহ জুড়ী নদীর কয়েকটি স্থান বালুমহাল হিসেবে প্রতিবছর মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেওয়া হয়। বালু ওঠানোর কারণে এবং প্রতিবছর অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর পানির চাপে বাঁধে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। গত বছরের জুন মাসে পাহাড়ি ঢলে গ্রামের বাবুল মিয়ার বাড়ির সামনে বাঁধ ভেঙে যায়। গত মার্চ মাসে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) উদ্যোগে ভাঙনকবলিত স্থানের একাংশ বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। এ ছাড়া ভাঙন ঠেকাতে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁশের বেড়া স্থাপন করে দেওয়া হয়। এপ্রিল মাসে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আবারও ওই স্থান ধসে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গোয়ালবাড়ী-সাগরনাল-ফুলতলা সড়কের শিলুয়া সেতুর এক পাশের জুড়ী নদীর বাঁধ দিয়ে পশ্চিম শিলুয়া গ্রামে ঢোকার রাস্তা। এটি প্রায় ১৫ ফুট চওড়া। রাস্তার শুরুতে প্রায় ৯৮৪ ফুট পাকা ও ইট বিছানো। বাকিটা কাঁচা। রাস্তায় বাবুল মিয়ার বাড়ির সামনে প্রায় ৪০০ ফুট জায়গা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এ ছাড়া হীরা মিয়ার বাড়ির সামনে প্রায় ৫০ ফুট, আবদুর রহমানের বাড়ির সামনে প্রায় ২০০ ফুট এবং আবদুল কাইয়ুমের বাড়ির সামনে প্রায় ৫০ ফুট জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব স্থানে রাস্তা প্রস্থ দুই-তিন ফুট হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত স্থানের ১০০-১৫০ গজ দূর থেকে খননযন্ত্র দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।

পশ্চিম শিলুয়ার বাসিন্দা মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান বলেন, বালু ওঠানোর পর থেকে ভাঙন বেড়েছে। নদী গভীর হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢলের পানি নামার পরপরই ভাঙনের সৃষ্টি হয়। মানুষ রাস্তা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অনেক সময় রাতে লোকজন অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। তখন রোগীদের কোলে-কাঁধে করে নিয়ে শিলুয়া সেতুর কাছে গাড়িতে ওঠাতে হয়।

শিলুয়া উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী মোর্শেদা আক্তার ও সেলিনা আক্তার বলে, বাবুলের বাড়ির সামনে নতুন করে ভাঙনের পর ১০-১২ দিন তারা বিদ্যালয়ে যেতে পারেনি।

আবুল হোসেন ও নিজাম উদ্দিন বলেন, এবার বাবুলের বাড়ির ভাঙন দিয়ে ঢলের পানি ঢুকে পশ্চিম শিলুয়া হাওরের ৫০০ বিঘা জমির আউশ ধান তলিয়ে যায়।

গোয়ালবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন আহমদ মুঠোফোনে বলেন, নদীভাঙনে পশ্চিম শিলুয়া গ্রামের রাস্তাটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটি রক্ষা করতে হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ ছাড়া নদীর ওই এলাকা থেকে দুই-তিন বছর বালু ওঠানো বন্ধ রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও বালুমহালের ইজারাদার মিলাদ চৌধুরী ফোন ধরেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিন্টু চৌধুরী বলেন, তিনি ভাঙনকবলিত স্থানগুলো সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন মেরামত ও রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। এ ছাড়া ওই এলাকায় আপাতত বালু ওঠানো বন্ধ রাখা যায় কি না, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে পাউবো মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী মুঠোফোনে বলেন, জরুরি ভিত্তিতে চলতি অর্থবছরে পশ্চিম শিলুয়ায় ভাঙনকবলিত স্থানে কাজ করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, ‘জুড়ী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ এলাকা থেকে বালু ওঠানোর বিষয়টি আগে তাঁর জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী বছর বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সময় নদীর পশ্চিম শিলুয়া অংশ থেকে যাতে বালু না ওঠানো হয়, সে ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হবে।’

No comments: