মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা বাবুদের জমিদার বানায়; আজ তারা ন্যায্য পাওনার জন্য পথে নামে

রাজশ্রী মুমু: শৈশবের বেশির ভাগ সময় চা বাগানে কেটেছে। তাই চা বাগানের অনেক সংস্কৃতির সাথেই পরিচিত। চা বাগানে প্রতিটি পদবীই গুরুত্বপূর্ণ।বাগানে যারা বিভিন্ন ভাবে চা বাগান পরিচালনা করেন তাদের বাবু বলে। টিলার দিক সামলালে টিলা বাবু, চা কারখানায় মেকানিজম দেখাশুনা করলে মেকানিক বাবু, কম্পাউন্ডারি করলে কম্পাউন্ডার বাবু, কেরানি হলে কেরানি বাবু,শিক্ষক হলে মাস্টারবাবু, গোদাম সামলালে গোদামবাবু ইত্যাদি ....।প্রতিটা পদই গুরুত্বপূর্ণ। 

চা বাগানের চাকরিতে ফ্রি কোয়ার্টার, কাজের লোক, জ্বালানি কাঠ সহ অনেক কিছুই ফ্রি। তাই হয়তো বেতনটা নুন্যতম। কিন্তু এই নুন্যতম বেতনেই তাদের বিলাসবহুল জীবন কাটাতে দেখেছি।চা শ্রমিকের ন্যায্য আয়ই হয়তো এই বিলাসীতার গোপন উৎস। অথবা বাগানের সম্পত্তি লুকিয়ে বেঁচাকেনা। অনেক বাবুই প্রচন্ড অজ গাঁ থেকে ফকির অবস্থায় বউ বাচ্চা নিয়ে বাগানে ঢুকে কিছুদিন পরই রমরমা অjবস্থা,ঘরে তিন চারসেট সোফা। পুরনো আসবাব তুলে নতুন আসবাব সাজানো, অথচ বেতন চিন্তা করলে তার সিকিটাও সম্ভব না।গ্রামের বাড়িতে পাকা দালান অথচ একসময় হয়তো খাওয়ারই ছিলোনা।আমার বড়মামা ২০/২২বছর ধরে শুধু মাস্টারবাবু হয়েই পড়ে থাকলেন।অফিসের সব কাজে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তার আর প্রমোশন হয়না বিশেষ মহলে তেল না দেয়ার দরুন। তিনি ছাপোষা মাস্টারবাবু হয়েই থাকেন।২/১বছর আগে কোনো এক অদৃষ্টে তিনি প্রমোশনে গোদাম বাবু হন। তেতো মুখের মানুষ বলে ভীষণ পরিচিতি তার। উনার ১২/১৩বছর পরে চাকরিতে যোগদান করেও অনেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হলো আর তিনি এখনো সেই ছাপোষাই আছেন।এখনো নিজের একটা বাড়ি পর্যন্ত করা হয়নি তার।চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা অবলম্বন করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া বোধহয় তার ঘটে নেই।অজ গায়ের অর্ধশিক্ষিত ফকিরশ্রেনির লোকগুলো ছোট পদে এসে অঢেল টাকা কামানোর অসত উপায় দেখে পাগলপারা হয়ে সম্পদ জমায় অথচ বুঝেই না পুরো বাগানের জাতীয় ক্ষতি হচ্ছে। একটা চা বাগানের আয়ের উপর কতোটা সংসার কতোগুলো মানুষ টিকে থাকে। এরা চা শ্রমিকদের মানুষের আওতায়ই ধরেনা ।মনে হয় বাপদাদার সম্পত্তি চুরি করছে।এদিকে যে পুরো একটা সম্প্রদায়, পুরো একটা বাগান ধ্বংস হচ্ছে তার দিকে খেয়াল নেই।চা শ্রমিকদের বদৌলতে এরা বাবুয়ানা দেখায় অথচ চা শ্রমিকদের অস্পৃশ্য ভাবে। এটা অবশ্য হিন্দুদের ক্ষেত্রে বেশি।চা বাগানের হিন্দু বাবু তাদের ঠাকুরাইনদের জাতিলাপনা দেখলে নিজেকেই অস্পৃশ্য মনে হয়। আবার দেখা এসব জাতিলা চাড়াল চন্ডাল টাইপ বাবুরা শ্রমিক মহিলাদের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা খায়, ডিমোশন হয়। এদের জাতিলা বউদের অন্য বাবুদের সাথে পরকীয়ার দায়ে বিচার শালিশ বসে। সব মিলিয়ে স্বর্গের মতো প্রকৃতির মাঝে অসভ্য নোংরা সংস্কৃতি নিয়ে এদের চলাফেরা। ভালো যে নেই তা অবশ্যই না। ভালোও আছে তবে খারাপের সাথে কম্পিটিশনে এরা বরাবরই পিছিয়ে। 

ধামাই চা বাগান এই রকম নানাবিধ চলনবলনের স্বীকার হয়ে আজ নিঃস্ব। ক্ষতি হলো শুধু খেটে খাওয়া শ্রমিকদের। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা বাবুদের জমিদার বানায়।আজ তারা ন্যায্য পাওনার জন্য পথে নামে। খাবি তো খাবি একেবারে তলা চেটে খাবি???

No comments: