টানা বৃষ্টিতে টইটুম্বর হাওর ও নদী ॥ বাড়ছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা

ইমাদ উদ দীন: উজানের পাহাড়ী ঢল আর টানা ভারী বৃষ্টি। আবারও উত্তাল এজেলার হাওর ও নদী। বন্যায় ডুবছে রাস্তা ঘাট। বাদ যাচ্ছেনা ঘর বাড়ি কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিনই বাড়ছে পানি। বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে স্থানীয় নদী গুলোর পানি। এনিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় স্থানীয় বাসিন্ধারা। ইতিমধ্যে অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছেন আতœীয় স্বজন আর আশ্রয় কেন্দ্রে। এবছর পাহাড়ী ঢল আর অবিরাম ভারী বৃষ্টিতে কয়েক দফা বন্যা। গেল ক’য়দিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার হাওর গুলো পানিতে টইটুম্বর। আর নদীগুলোর পাড় ভেঙ্গে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। নতুন করে ফের বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছেন হাওর ও নদী তীরের কয়েক লাখ মানুষ। এবছর কয়েক দফা বন্যায় সব হারিয়ে নি:স্ব কৃষককূল। আগের দু বারের বন্যাতে ধান আর সবজি ক্ষেত গেলেও এখন বানের পানি গ্রাস করেছে বসত বাড়ি। তাই এখন মাথা গুজার ঠাঁইও নেই। ঘর বাড়ি বানের পানির দখলে যাওয়াতে সব হারিয়ে তারা চরম অসহায়। জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে অন্যত্র। এখন এমন অবর্নণীয় দূর্ভোগে পড়েছেন হাওর ও নদী তীরের মানুষ। এবছর অকাল বন্য আর অতি বৃষ্টিতে নাকাল জেলার নদী ও হাওর তীরের মানুষ। চৈত্রের অকাল বন্যায় বোরো ধানের পর মরেছে মাছ। এরপর হাঁস,জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। একে একে সব হারিয়ে দিশেহারা হাওর পাড়ের মানুষ। এমন বির্পযয় এর আগে কখনো দেখেনি এ অঞ্চলের মানুষ। এই প্রাকৃতিক দূর্যোগের পর বির্পযস্ত হয়ে পড়ে হাওর পাড়ের বাসিন্ধারা। এরপর ক্ষতিগ্রস্থ হয় নদী পাড়ের মানুষ। হঠাৎ আকস্মিক বন্যায় নদীর পাড় ভেঙ্গে প্লাবিত হয় নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো। ধান,মাছ,সবজি আর ঘরবাড়ি হারিয়ে নি:স্ব হয় কৃষি ও মৎস্যজীবী লোকজন। এরপরও টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ী ঢলে কয়েক দফা বন্যার কবলে পড়ে হাওর ও নদী তীরের মানুষ। এবছর হঠাৎ এমন বার বার বন্যা কবলিত হয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হন তারা। প্রথম দফা বন্যায় হাওর ও নদী তীরের প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ (জেলা প্রশাসনের হিসাবে) ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। আর দূর্ভোগ্রস্থ হয়েছেন কমপক্ষে আরো দুই লক্ষাধীক মানুষ। এরপর বয়ে চলা বন্যা গুলোতে বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্থ ও দূর্ভোগে পড়া লোকজনের সংখ্যা।

একের পর এক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে লোকজন দিশেহারা হলেও আশার বাণী ছাড়া সরকারী তরফে এখনো নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা। এমন অভিযোগ দূর্ভোগগ্রস্তদের। তারা জানালেন সরকারী তরফে এ পর্যন্ত  যে ত্রাণ সহযোগীতা এসেছে তা খুব অল্প সংখ্যক লোক পেয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন ত্রাণ পর্যাপ্ত না থাকায় তারা হয়েছেন বঞ্চিত। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষি ও মৎস্যজীবী লোকজন জানিয়েছেন কয়েক মাসের মধ্যে বার বার বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার কারনে আউস ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আর বানের পানতে ভেসে গেছে পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ। গবাদি পশু গুলোর খাদ্য সংকটও চরমে। গেল ক’দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ী ঢলে আবারও মারাতœক বন্যা কবলিত জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর শহরের অধিকাংশ মানুষ। এর মধ্যে অন্যতম বন্যা কবলিত জেলার বড়লেখা,কুলাউড়া,জুড়ী ও কমলগঞ্জ উপজেলা। বন্যাকবলিত লোকজন জানালেন কিছু দিন আগের বয়ে যাওয়া বন্যায় তাদের কৃষিজমি ও মৎস্যখামার ডুবে গেলেও এখন ডুবছে তাদের ঘরবাড়ি। হাকালুকি হাওর পাড়ের ৩টি উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন শতাধিক পরিবারের লোকজন। পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র না থাকায় অধিকাংশ বন্যা কবলিত লোকজন আশ্রয় নিয়েছেন তাদের আতœীয় স্বজনের বাড়িতে। বড়লেখা উপজেলায় বন্যায় ৫টি ইউনিয়নের অন্তত ৭০ টি গ্রাম প¬াবিত হয়েছে।  লক্ষাধীক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ঘরে পানি প্রবেশ করায় স্থানীয় স্কুলগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন অন্তত ৫০টি পরিবার। অনেকেই উঁচু এলাকায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও আশ্রয় নিয়েছেন। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক এখন পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ফলে জনদুর্ভোগ চরমে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় হাকালুকি হাওর তীরবর্তী বর্ণি, তালিমপুর, সুজানগর ইউনিয়নের দশঘরি, রাঙ্গিনগর, বাড্ডা, ঝগড়ি,পাটনা,ভোলারকান্দি,উত্তর বাঘমারা,তালিমপুর ইউনিয়নের হাল¬া,ইসলামপুর,কুটাউরা, বাড্ডা,নুনুয়া,পাবিজুরি, শ্রীরামপুর, মুর্শিবাদকুরা,পশ্চিম গগড়া, পূর্বগগড়া,বড়ময়দান,গাগড়াকান্দি,তেলিমেলি,গোপালপুর,হাউদপুর,বর্ণি ইউনিয়নের পাকশাইল,সৎপুর, কাজিরবন্দ,নোওয়াগাঁও,উজিরপুর, দাসেরবাজার ইউনিয়নের চানপুর, অহিরকুঞ্জি, উত্তরবাগীরপাড়, দক্ষিণবাগীরপাড়, পানিশাইল ,ধর্মদেহী,চুলারকুড়ি,কোদালী,ধলিরপাড়,নেরাকান্দি, মাইজমজুড়ি,মালিশ্রী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় হাকালুকি হাওর পাড়ের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল, জয়চন্ডী, কাদিপুর, কুলাউড়া, ব্রাহ্মণবাজার, ভাটেরা ও বরমচাল ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প¬াবিত হয়েছে। এতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছেন। কুলাউড়ায় ৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ৫৯টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। জুড়ী উপজেলায় ১টি আশ্রয় কেন্দ্র ৮-৯ টি পরিবার নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রিত লোকজন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। তবে ওই সকল উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে তারা অল্প হলেও শুকনা খাবার ও অনান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ত্রাণ হিসেবে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে সরবরাহ করেছেন। আর পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরেও জানিয়েছেন। জুড়ী উপজেলার ৪ ইউনিয়নের প্রায় ৩০ টি গ্রামে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও, সোনাপুর, শাহাপুর, রাজাপুর, নিশ্চিন্তপুর, গোবিন্দপুর, জাঙ্গিরাই, নয়াগ্রাম, শিমূলতলা, ইউসুফনগর, পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর, খাগটেকা, তালতলা, কালনিগড়, হরিরামপুর, কৃষ্ণনগর,ভবানীপুরসহ অনেক গ্রাম। কমলগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর পাড় ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে ২০-২৫ টি গ্রাম। দূর্ভোগে পড়েছেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।দফায় দফায় বন্যা আর নদী ভাঙ্গনে চরম ক্ষতিগ্রস্থ জেলার অন্যতম সবজি চাষের এই উপজেলাটি।একই অবস্থা জেলার রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার। নদী ভাঙ্গন আর হাওরের উপচে পড়া পানিতে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছেন এই ৩ উপজেলার প্রায় দুই লক্ষাধীক মানুষ। জেলার হাকালুকি,কাউয়াদিঘি,হাইল হাওর আর মনু,ধলাই,ফানাই,সুনাই ও জুড়ী নদীর তীরবর্তী লোকজনই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বেশি। এ বছর আগাম বন্যায় বোরো ধানের পর আউস ধান ও সবজী ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থরা জানালেন স্থানীয় হাওর ও নদীগুলোর নাব্যতাহ্রাসে এমন দূর্যোগ। দীর্ঘদিন থেকে সংস্কারহীন নদীগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ বাধ স্থায়ীভাবে মেরামত না করায় বার বার ওইসকল বাধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শঙ্কর চক্রবতী জানান আমাদের উজানে ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে, যে কারনে ত্রিপুরার কয়েকটি স্থানেও বন্যা দেখা দিয়েছে। ওই এলাকার পানি আমাদের দিকে আসে,যে কারনে আমাদের নদী ও হাওরে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন স্থানীয় হাওর ও নদী গুলোর ড্রেনেজ ও স্থায়ী বাধ নির্মানের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন্যা নিয়ন্ত্রনে অনেকটা স্থায়ী সমাধান হবে।

No comments: