ধর্ম-কর্মের ব্যর্থতা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ফখরুল ইসলাম: রসুলাল্লাহ (সঃ) বলেছেন ‘এমন সময় আসবে যখন মানুষ রোযা করবে  তা শুধু না খেয়ে ক্ষুধার্ত হয়ে থাকা হবে (অর্থাৎ রোযা হবে না) এবং রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়বে তা শুধু ঘুম নষ্ট করা হবে (অর্থাৎ তাহাজ্জুদ হবে না) এই হাদীসে বিশ্বনবী (সঃ) কাদের বুঝাচ্ছেন ? অতি প্রথম কথাই হল মানুষ বলতে তিনি তাদের বুঝাচ্ছেন। আমরা যারা নিজেদের মুসলিম বলে মনে করি। কারণ তিনি অন্য নবীদের উম্মত খৃষ্টান, ইহুদী ও হিন্দুদের সম্মন্ধে বলছেন না।  দ্বিতীয় কথা হল হাজারো রকমের ইবাদতের মধ্য থেকে মাত্র দুটি তিনি বেছে  নিয়েছেন। একটি রোযা অন্যটি তাহাজ্জুদ। তৃতীয় কথা হলো এর একটা ফরজ (বাধ্যতামূলক) অন্যটি নফল নিজের ইচ্ছাধীন। বিশ্বনবী (সঃ) পাঁচটি বাধ্যতামূলক ইবাদত থেকে একটি এবং শত শত নফল ইবাদত থেকে একটি বেছে নেয়ার ঊদ্দেশ্য হল, এই মনস্তত্তের দিক দিয়ে আল্লাহ রসুল ও দ্বীনের উপর পরিপূর্ণ ঈমান ছাড়া কারও পক্ষে এক মাস রোযা রাখা বা  নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব নয়। এমনকি মোকাম্মাল ঈমান আছে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন যারা তাহাজ্জুদ পড়েন না। অর্থাৎ রসুলাল্লাহ (সঃ) বুঝাচ্ছেন তাদের-যাদের পরিপূর্ণ দৃঢ় ঈমান আছে আল্লাহ, রসুল, কোরআন ও ইসলামের উপর। এই হাদীসে তিনি মোনাফেক, লোক দেখানে ইবাদতকারী অর্থাৎ রেয়াকারীদের বুঝান নি। কারণ যেসব ইবাদত লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ মসজিদের যেয়ে নামাজ হজ্ব যাকাত ইত্যাদি একটিও উল্লেখ করেননি। মুনাফেক রেয়াকারীদের বুঝালে তিনি অবশ্যই এ গুলি উল্লেখ করতেন যে গুলি লোক দেখিয়ে করা যায়। তিনি ঠিক সেই দুটি ইবাদত উল্লেখ করলেন যে দুটি মোনাফেক ও রেয়াকারীদের পক্ষে অসম্ভব। যে দুটি লোকজন দেখিয়ে করাই যায় না, সে দুটি পরিপূর্ণ ঈমান নিয়েও সবাই করতে পারে না। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তিনি ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন যে এমন সময় আসবে যখন আমার উম্মতের মানুষ পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হয়ে নামাজ রোযা, হজ্ব, যাকাত, তাহাজ্জুত ইত্যাদি সর্ববিধ ইবাদত করবে কিন্তু কোন কিছুই হবে না, কোন ইবাদত গৃহীত কবুল হবে না। যদি দীর্ঘ একমাসের রোযা এবং মাসের পর মাস বছরের পর বছর শীত গ্রীষ্মের গভীর রাত্রে আরামের শয্যা ত্যাগ করা তাহাজ্জুদ নিষ্ফল হয় তবে অন্যান্য সব ইবাদত অবশ্যই বৃথা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা শুধু পরিপূর্ণ বিশ্বাসী অর্থাৎ মোকাম্মাল ঈমানদারই নয় শুধু রোযাদার ও তাহাজ্জুদী তাদের ইবাদত নিষ্ফল কেন? তাছাড়া তাদের ইবাদতই যদি বৃথা হয় তবে অন্যান্য সাধারন মুসলিমের ইবাদতের কি দশা? মহানবীর (সঃ) ওই ভবিষ্যৎ বানীর একমাত্র উত্তর হচ্ছে এই যে, তিনি যাদের কথা বলেছেন তারা গত কয়েক শতাব্দী ও আজকের দুনিয়ার মুসলিম নামধারী জাতি। আল্লাহ ও তাঁর রসুল(সঃ) এই জাতির সম্মুখে যে উদ্দেশ্য স্থাপন করে দিয়েছিলেন আকীদার বিকৃতিতে জাতি তা বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করে নিয়েছে। বর্তমান যুগের মুসলিম সমাজ মনে করছে তাদেরকে নামাজ রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি আমল করার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁর শেষ রসুল বিশ্বনবী(সঃ) কে পাঠিয়েছিলেন। অথচ এসব করার জন্য তাঁর রসুলকে পাঠাননি। এ জন্যই যদি পাঠাতেন তাহলে তিনি রসুলকে যুদ্ধ বিগ্রহের নিষেধ করতেন। শুধু বলতেন এসব আমলের প্রশিক্ষণ দিলেই চলবে। আর রসুল (সঃ) তাঁর আসহাবদের নিয়ে শুধু আমল করার তবলীগ করতেন এতো পরিশ্রম করে স্ত্রী পুত্র কন্যাকে ছেড়ে ব্যবসা বানিজ্য ছেড়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে যাবার প্রয়োজন পড়তো না। আল্লাহ ও রসুলের (সঃ) স্থাপিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে ঐক্যবদ্ধ সুশৃংখল দুর্জয় যোদ্ধা চরিত্রের প্রয়োজন, সেই চরিত্র তৈরীর জন্য যে প্রশিক্ষন সেই প্রশিক্ষন (নামাজ) এবং আরও অন্যান্য ব্যাপারকে উর্দ্ধে স্থান দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য যেখানে বিকৃত, ভূলে গেছে সেখানে প্রশিক্ষনের আর কোন দাম(অর্থ) থাকতে পারে না। কাজেই ওই সব প্রশিক্ষন অর্থাৎ নামাজ রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সর্ব প্রকার ইবাদত আজ নিষ্ফল অর্থ হীন। আল্লাহর রসুল(সঃ) যে জাতিকে অস্র হাতে দেশ থেকে বের করে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিয়েছিলেন সে জাতির হাত থেকে অস্র ছিনিয়ে নিয়ে হাতে তসবিহ ধরিয়ে দিয়ে টেনে খানকায়, মসজিদে বসিয়ে দিয়েছেন। জাতির বহির্মূখী দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্তর্মূখী করে তাকে কাপুরুষে পরিণত করেছেন। সিংহকে ইঁদুরে পরিণত করেছেন। তাদের কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, ওই সহি হাদীসে রসুলাল্লাহ (সঃ) কাদের বুঝাচ্ছেন তা মেরেবানী করে ব্যাখ্যা করুন। মনে রাখবেন মহানবী (সঃ) নিষ্ফল বলেছেন যে নির্দিষ্ট দুটি ইবাদত ওই দুটিই পূর্ণ ঈমান ছাড়া করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। দূর্বল ঈমান নিয়েও নয় মোনাফেক বা লোক দেখানোর তো প্রশ্নই উঠে না। কারণ রোযা লোক দেখিয়ে করা যায় না। আর গভীর রাত্রে উঠে একা একা তাহাজ্জুদ পড়ায় লোক দেখানোর রেয়ার প্রশ্নই উঠে না। যে সব ইবাদত দুর্বল ঈমান নিয়ে করা যায় মোনাফেকরা রেয়াকারীরা করতে পারে এর একটাও বিশ্বনবী (সঃ) উল্লেখ করেননি। অকপট সত্যান্বেষী মন নিয়ে কেউ চিন্তা করলে তারা দেখতে পাবেন যে আল্লাহর দেয়া জীবন ব্যবস্থাকে জাতীয় জীবনে অস্বীকার করে মানুষের তৈরী জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিণতিতে পৃথিবীতে যে অন্যায় অবিচার শোষন রক্তপাতের জন্ম হচ্ছে সে সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে সে সব থেকে মুখ ফিরিয়ে যারা মহা ইবাদতে মশগুল হয়ে আছেন। আল্লাহ বিরোধী আদর্শ প্রচারে যারা প্রচন্ড বিরোধ গড়ে তুলছেন না যারা মাসয়ালাবাজী করে জাতীর ঐক্য ধ্বংস করে যাচ্ছেন তারাই হচ্ছেন রসুলাল্লাহ(সঃ) এর ওই ভবিষ্যৎ বানীর লক্ষ্য। এই জাতিকে লক্ষ্য করে আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ১১০নং আয়াতে বলেছেন “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি (উম্মাহ) কারন মানব জাতির মধ্য থেকে তোমাদিগকে উত্থিত করা হয়েছে এই জন্য যে তোমরা (মানুষকে) সৎ কার্য করার আদেশ দান এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত করবে, আল্লাহকে বিশ্বাস করবে”। অর্থাৎ এই উম্মাহকে মানব জাতির মধ্য থেকে সৃষ্ঠিই করা হয়েছে মানুষকে অসৎ কাজ (আল্লাহর বিধানের বিরোধী কাজই হলো অসৎ কাজ) থেকে নিবৃত্ত করা ও সৎ কাজ (আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কাজই হচ্ছে শুধু সৎ কাজ) করার আদেশ করার জন্য এবং এই কাজ করার জন্য সে জাতি শ্রেষ্ঠ জাতি। যে বা যারা ইবাদতের নাম করে আত্মার পরিশুদ্ধ বা আল্লাহর যিকরের নাম করে বা যে কোন ছুঁতোয় বিরোধীতার ভয়ে, পার্থিব ক্ষতির ভয়ে, যে জন্য তাদের মানব জাতির মধ্যে থেকে উত্থিত করা হয়েছে, সেই কাজ থেকে পালায় তবে সে বা তারা আর পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সেই শ্রেষ্ঠ জাতির মধ্যে নেই। সুতরাং তাদের সব রকম ইবাদত অর্থহীন নিষ্ফল। এই খানে আরও একটি কথা বুঝে নেয়া প্রয়োজন কোরআনের এই আয়াতে আল্লাহ সৎ কাজের জন্য যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সেটা হলো আদেশ আরবীতে “আমর” আদেশ তখনই করা যায় যখন সে আদেশকে কার্যে পরিণত করা যায়। অর্থাৎ কাজে পরিনত করার শক্তি থাকে। নইলে বড়জোর অনুরোধ করা যায়।  অসৎ কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার ব্যাপারে একই কথা। মানুষকে অর্থাৎ সমাজকে সৎ কাজ করার আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার শক্তি শুধু রাষ্ট্রের থাকে অন্য কারো নয়। অন্য যে কেউ করতে গেলে তাকে শুধু অনুরোধ বা কাকুতি-মিনতি করতে হবে কিন্তু আল্লাহ অনুরোধ শব্দ ব্যবহার করেননি। করেছেন “আমর” আদেশ অর্থাৎ ওই কাজ রাষ্ট্র শক্তি হাতে নিয়ে করতে হবে। উপদেশ বা অনুরোধে যে ওই কাজ হবে না তার প্রমাণ বর্তমান মানব সমাজ। এই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখা যে আল্লাহ উপদেশ অনুরোধের মাধ্যমে করা বুঝাননি তা পরিষ্কার হয়ে যায় তাঁর কোরআনের আরেকটি আয়াতে সুরা আল হজ্বের ৪১নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন এরা (মোমেন) তারা, যাদের আমি পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত (নামাজ) কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং ন্যায় ও সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অন্যায় অসৎ কাজ থেকে বিরত করে। এখানে লক্ষ্য করুন মানুষকে ন্যায় কাজে আদেশ এবং অন্যায় অসৎ কাজ থেকে বিরত লাখার জন্য আল্লাহ কি পূর্ব শর্ত দিচ্ছেন। তিনি বলছেন আমি তােেদর পৃথিবীতে (বা পৃথিবীর যে কোন অংশে)ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার পর। কারন তিনি ভাল করেই যানেন যে ন্যায় কাজের আদেশ ও মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা এ দু‘টোর কোনটাই সম্ভব নয় রাষ্ট্র শক্তি ছাড়া। সুতরাং সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্র শক্তি লাভের পথ পরিহার করে যারা অনুরোধ উপদেশ কাকুতি-মিনতি করে ওই কাজ করতে চেষ্টা করছেন তারা পন্ডশ্রম করছেন। তাদের সে চেষ্টা ইহকাল ও পরকালে ব্যর্থ হয়ে পড়বে। আর যারা বিশ্বনবী (সঃ) এর তরিকা বাদ দিয়ে অন্য তরিকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করছেন তারাও পন্ডশ্রম করে যাচ্ছেন। হাজার বছর চেষ্টা করলেও তাদের সে চেষ্টা সফল হবে না। আর পরকালেতো আল্লাহর নিকট থেকে পুরষ্কার পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। বরং তাদের কর্মকান্ডে দুনিয়াতে তাদের সম্প্রদায় হবে ঘৃণিত, উপহাসের পাত্র আর পরকালে লাঞ্চিত অপমানিত হয়ে নিক্ষিপ্ত হবে জাহান্নামের আস্তাকুঁড়ে। এখন এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি সবিনয় নিবেদন আসুন দলমত জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রসুলাল্লাহ(সঃ) এর তরিকায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাই। তখন আল্লাহর সাহায্য পেতে পারি এবং আমাদের ধর্ম কর্মের ব্যর্থতা থেকে উদ্ধার পেতে পারি। আর এ কাজটি করে যাচ্ছে ইমামুজ্জামান প্রতিষ্ঠিত অরাজনৈতিক আন্দোলন হেযবুত তওহীদ। 

No comments: