জুড়ীতে ভজিটিলার পাদদেশে ২০০ পরিবারের ঝুঁকিপূর্ণ বাস; টিলা কাটা মাটি সরকারি কাজে!

জুড়ী টাইমস সংবাদ: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা সদরের জায়ফরনগর ইউনিয়নে একটি টিলায় গর্ত করে দীর্ঘদিন ধরে পাথর তুলে এবং মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কারণে টিলাটির পাদদেশে বাড়ি করা মনতৈল, গুচ্ছগ্রাম, চম্পকলতা ও কালিনগর গ্রামের দুই শ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এলাকার কয়েকজন বলেন, কালিনগর গ্রামের তাহির আলী ও কাছিম আলী নামের দুজন লোক টিলা থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছেন। থানা ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণের জন্য এ মাটি দিয়ে নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে। এ ছাড়া অনেকে টিলাটিতে গর্ত করে পাথর তুলে বিক্রি করছেন।

সম্প্রতি চট্টগ্রামসহ পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা ভজিটিলাসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিন্টু চৌধুরী বলেন, ‘টিলার নিচে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে আসতে বলেছি। মাইকিংও করিয়েছি।’ দুই-তিন ধরে ভারী বর্ষণের কারণে মনতৈল, গুচ্ছগ্রাম, কালিনগর ও চম্পকলতা এলাকায় টিলা ধসে পড়ায় পাদদেশে বসবাসকারী ৭৪টি পরিবারকে স্থানীয় কে বি এহিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে টিলাটি ভজিটিলা নামে পরিচিত। এটি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট উঁচু। এটিতে ২৯ একর ৯২ শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতক সরকারি খাস, আট শতক ব্যক্তিমালিকানাধীন ও ছয় একর ওয়াকফ এস্টেটের।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা-৬-এর খ উপধারায় বলা হয়েছে, পাহাড় বা টিলা ব্যক্তিমালিকানাধীন বা দখলাধীন হলেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তা কাটাতে পারবে না।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, কালিনগর ও মনতৈল গ্রামে টিলার মাঝামাঝি স্থানে একটি বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া মাটি কেটে নেওয়ায় কালিনগর, গুচ্ছগ্রাম ও মনতৈলের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে ধস নেমেছে। বিভিন্ন স্থানে গর্ত করে তোলা ছোট ছোট পাথর স্তূপ করে রাখা।

জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাছুম রেজা বলেন, ‘টিলা কেটে মাটি বিক্রেতা ও পরিবহনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় একাধিকবার আলোচনা করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি।’

কালিনগরে রাস্তার পাশে পাথর স্তূপ করছিলেন তিন নারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, অভাবের তাড়নায় তাঁরা পাথর তুলে বিক্রি করে সংসার চালান। প্রতি ফুট পাথর ৫০ থেকে ৬০ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। টিলা কেটে মাটি নেওয়ার পর বৃষ্টিতে সেখান থেকে পাথর বেরিয়ে আসে। তখন তাঁরা তা সংগ্রহ করেন।
একই দিন গুচ্ছগ্রাম ও মনতৈলে আরও ছয়-সাতজন নারীকে খুন্তি দিয়ে টিলায় গর্ত করে পাথর তুলতে দেখা যায়। মনতৈলে ধস ঠেকাতে ২০ থেকে ২৫টি বাড়ির নিচে বালুর বস্তা ফেলে রাখা রয়েছে। এ রকম একটি বাড়ির মালিক হাফিজুর রহমান (৯০) বলেন, ‘১৮ বছর আগে টিলায় জায়গা কিনছি। পরে টিলা কাটাইয়া বাড়ি বানাইছি। বড় ভুল করছি। অখন বুঝিয়ার। বৃষ্টি অইলেই মাটি ধসে। কোন সময় ঘরটা যে ধসি পড়ে, অউ ভয়ে থাকি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালিনগরের সাত-আটজন বাসিন্দা বলেন, তাহির আলী ও কাছিম আলী টিলায় তাঁদের জমি থেকে দীর্ঘদিন ধরে মাটি কেটে বিক্রি করছেন। এলাকাবাসী বাধা দিলেও তাঁরা মানেন না। ট্রাকে করে এসব মাটি বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। উপজেলা সদরের বাছিরপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং এর পাশে নির্মাণাধীন জুড়ী থানা ভবনের নিচু জমি ভরাটেও এসব মাটি ব্যবহার করা হয়।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বৃহস্পতিবার বাড়িতে গিয়ে তাহির আলী ও কাছিম আলীকে পাওয়া যায়নি। পরে একাধিকবার কল করা হলে কাছিমের নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। গত শনিবার তাহির আলী বলেন, তিনি টিলার নিচের দিকটা সমান করে সেখানে বাড়ি তৈরি করছেন। এ কারণে মাটি কাটছেন। এসব মাটি তিনি বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা তৈরির কাজে বিক্রি করছেন। প্রতি ট্রাক মাটি এক শ থেকে দেড় শ টাকা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস আলী অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপক তাহের মিয়া বলেন, ‘আমাদের মাটির কাজ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। স্থানীয় কিছু লোককে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা কোথা থেকে মাটি এনেছেন, জানি না।’

জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, থানার কাজে কোথা থেকে মাটি আনা হচ্ছে, তা তাঁর জানা নেই। টিলা কর্তনকারী ও মাটি পরিবহনকারীদের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে তাঁদের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা দিতে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক সালাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘টিলা কাটা অপরাধ। পুলিশ যেকোনো অপরাধে বাধা দিতে পারে। এমনকি অপরাধীদের আটক করে মামলা দিতে পারে। আমরা শুধু মামলার তদন্ত করব।’

No comments: