ছোট অক্ষরে অস্পষ্ট শব্দে লেখা হচ্ছে প্রেসক্রিপশন : হাইকোর্টের নির্দেশ মানছেন না বেশির ভাগ চিকিৎসক, নেই মনিটরিং

জুড়ী টাইমস সংবাদ: প্রেসক্রিপশন বড় হাতে লেখা নিয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ মানছেন না দেশের বেশির ভাগ চিকিৎসক। বেশির ভাগ চিকিৎসক ছোট অক্ষরে, অস্পষ্ট শব্দে ঘিচিমিচি করে প্রেসক্রিপশন লিখছেন তারা। এতে প্রতিনিয়ত রোগীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ওষুধের নাম পড়তে বিপাকে পড়ছেন ফার্মেসিওয়ালারা। এতে সময় সঠিক ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি মনিটরিংয়েরও তেমন ব্যবস্থা নেই। ফলে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে জনস্বাস্থ্য।

গত ৯ জানুয়ারি নির্দেশনায় চিকিৎসকদের স্পষ্টাক্ষরে পাঠ উপযোগী ব্যবস্থাপত্র লিখতে বলেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ জারি করার আদেশ দেয়া হয়। এক মাস পার হলেও বেশির ভাগ চিকিৎসক সেই নির্দেশ মানছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এমন একটি বিষয় যার ওপর রোগীর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করে। প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের হাতের লেখার কারণে রোগীদের ভুল ওষুধ খাওয়ার মাত্রা বাড়ছে। এতে শরীরে নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া রোগী ও এর স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সঠিক ওষুধ না পেয়ে।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা আগের মতোই তাদের প্রেসক্রিপশন লিখছেন। অনেক চিকিৎসক ছোট কাগজে অনেক ছোট করে প্রেসক্রিপশন লিখছেন। এতে ওষুধের নাম লিখতে অনেক সমস্যা হয়। এ ছাড়া কিছু চিকিৎসক বড় হাতে লিখছেন, যা ভালো দিক। কিন্তু তা অতি নগণ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, শাহবাগ এলাকার পপুলার ফার্মেসির বিক্রেতা সন্তোষ বলেন, ছোট হাতে প্রেসক্রিপশনে হিজিবিজি লেখার কারণে আমাদের যেমন নানা বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়, তেমনি রোগীকেও অনেক সময় ভুল ওষুধ দেয়া হয়। বিশেষ করে স্বল্প শিক্ষিত ও বয়স্কদের বেলায় এ ধরনের সমস্যা বেশি হয়। তিনি বলেন, এমনও হয়েছে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লেখা বুঝতে না পেরে তা সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে রোগী বা তার স্বজনকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, যে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখেছেন তিনি নিজেও অনেক সময় তা ধরতে পারেন না, আসলে তিনি কি লিখেছেন।

আরেক ওষুধ বিক্রেতা রবিউল হাসান জানান, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বুঝতে সমস্যা হয়নি, এমন লোক পাওয়া কঠিন। অনেক সময় আমরাও অনেক ওষুধের নাম পড়তে পারি না। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন দরিদ্র, অশিক্ষিত, রোগী ও তাদের স্বজনরা। অস্পষ্ট লেখার কারণে এক ওষুধের পরিবর্তে অন্যটি চলে যেতে পারে রোগীর কাছে। ভুলক্রমে যাওয়া ওই ওষুধ রোগীর জন্য প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই এ জন্য আমরা এ রকম প্রেসক্রিপশন পেলে তার সঠিক নাম মোবাইলের মাধ্যমে ডাক্তারের কাছে শুনতে বলি।

মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, কিছু ডাক্তারের লেখা এমনই খারাপ যে, প্রেসক্রিপশন নিয়ে একটার পর একটা ওষুধের দোকানে ঘুরতে হয়। কেউ-ই তা বোঝেন না। কিছু রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে লাইন ধরে টিকেট কিনে আবারো লাইন ধরে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। পরে ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রেসক্রিপশনে ডাক্তারের লেখা নিয়ে পড়তে হয় নতুন ঝামেলায়। কিছু প্রেসক্রিপশনের লেখা সংশোধন করতে গিয়েও পড়তে হয় নানা সমস্যায়।

এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা হাইকোর্টের আদেশ মতো সার্কুলার জারি করেছি। এই সমস্যা তো একদিনে কেটে যাওয়ার নয়। এ জন্য সময় লাগবে। অনেক চিকিৎসকই আছেন যাদের লেখা স্পষ্ট নয়। যে কারণে স্বল্প শিক্ষিত রোগী কিংবা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাদের বুঝতে সমস্যা হয়।
তিনি বলেন, চিকিৎসকরা বিভিন্ন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তাই তাদের হাতের লেখা খারাপ- এমন কিন্তু নয়। তারা ইচ্ছা করলেই রোগীদের স্বার্থে প্রেসক্রিপশনের লেখা স্পষ্ট করতে পারেন। এ বিষয়ে চিকিৎসকদের নির্দেশনা দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ব্যস্ততাও থাকবে, কিন্তু প্রেসক্রিপশনের লেখা স্পষ্ট হতে হবে। রোগীকে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর নিতান্তই যাদের হাতের লেখা খারাপ তারা কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে প্রেসক্রিপশন লিখবেন।

মোহাম্মদপুরের দৃষ্টি ফার্মেসিতে ওষুধ নিতে এসেছেন জনি। কিন্তু সব ওষুধ পেলেও একটি ওষুধ পাচ্ছিলেন না। সব দোকানে ঘুরে দেখা হয়েছে তার কিন্তু কোনটাতেই ওই ওষুধের নাম পড়তে পারছেন না ফার্মেসিওয়ালারা। জনি এই প্রতিবেদককে জানান, আমার বাবার হাঁটুর ব্যথার জন্য বাংলাদেশ মেডিকেলে আউটডোরে ডাক্তার দেখিয়েছি। বাবাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ওষুধ নিতে বের হয়েছি। কিন্তু ধানমন্ডি এলাকায় কোনো ফার্মেসি একটি ওষুধের নাম পড়তে পারেনি। তাই এ জায়গায় এসেছি। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। এখন আবার হাসপাতালে গিয়ে সেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে তা জানতে হবে। তা না হলে এই ওষুধ কেনা সম্ভব হবে না।

আরেক রোগীর স্বজন আরাফাত রহমান জানান, মুগদা হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। উনার প্রেসক্রিপশনে লেখা একটি ওষুধের পাওয়ার ৫০০ লিখেছিলেন। কিন্তু অত্র এলাকার কোনো ফার্মেসিতে এই পাওয়ারের ওষুধ পাওয়া যায়নি। এর পরে আমি শাহাবাগে এসে সব ফার্মেসিতে ঘুরেও পাইনি। পরে একজন বিক্রেতা বললেন, এটার পাওয়ার ১ হাজারের নিচে হয় না। এর পরে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ওষুধটি পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু সবার পক্ষে তো আর চিকিৎসককে ফোন দিয়ে ওষুধের নাম জানা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, চিকিৎসকের হাতের লেখা ছোট হাতে হওয়া উচিত নয়। কারণ প্রেসক্রিপশনে থাকা ওষুধের নাম বোঝা না গেলে ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধ রোগীকে দিতে পারে। ওষুধের জেনেরিক নাম কাছাকাছি হওয়ায়ও যেটি প্রেসিক্রিপশনে লেখা থাকে তার বদলে অন্যটি দিয়ে দেয়। এমন বহু ঘটনা শুনেছি আমরা। তিনি বলেন, ডাক্তাররা জানেন রোগী বা ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতারা তার লেখা পড়তে পারছেন না। কিন্তু তারপরও তারা প্রেসক্রিপশনের লেখাকে সহজবোধ্য করেন না। তাদের কাছে ভিজিটই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তিনি আরো বলেন, ব্যস্ততা বা রোগীর চাপ নয়, পুরোটাই দায়িত্বহীনতা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়। একজন ডাক্তার ইচ্ছা করলেই প্রেসক্রিপশনের লেখাকে সহজবোধ্য করে তুলতে পারেন। দায়িত্বশীল হতে পারেন।

তিনি বলেন, প্রেসক্রিপশনে অস্পষ্ট ভাষায় ওষুধের নাম লেখা চিকিৎসকদের যেন একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও স্পষ্ট করে লিখতে পারছেন না। জনসাধারণের ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণের জন্য চিকিৎসকদের বের হয়ে আসতে হবে ছোট হাতের প্রেসক্রিপশন লেখার রীতি থেকে। এ বিষয়ে ডাক্তারদের মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

No comments: