মণিপুরী নৃত্যকে অনেক উপরে নিতে চান শ্রীমঙ্গলের কেয়া

জুড়ী টাইমস সংবাদ: কেয়া সিনহা। বাংলাদেশের নৃত্যজগতে উদীয়মান এক তরুণ শিল্পী। সবে কৈশোর পার হওয়া এ নৃত্যশিল্পী এরই মধ্যে নিজের ঝুলিতে পুরেছেন বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে নিয়েছেন জাতীয় শিশু-কিশোর পুরস্কার। ২০১২ সালে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় মণিপুরী নৃত্যের জন্য পেয়েছেন স্বর্ণপদকও। চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ে-২০১৪ তে হয়েছেন প্রথম রানারআপ।

এতো স্বল্প সময়ে বড়ো বড়ো সাফল্যও তাকে শেকড়চ্যূত করতে পারেনি। মাটির খুব কাছাকাছি থেকে তার বেসিক নাচে মণিপুরী নৃত্যকে আরও উপরে নিয়ে যেতে চান তিনি। আর সে কারণেই জন্মস্থান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের মণিপুরীপাড়াতেই অবস্থান করছেন তিনি। আরও ভালো করে রপ্ত করছেন মণিপুরী নৃত্য। নতুন প্রজন্মকে শেখানোর দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। তবে একজন জাতশিল্পী হিসেবে মণিপুরী নৃত্যের পাশাপাশি সাধারণ নৃত্য, ক্লাসিক্যাল, ফোক, মর্ডান, ফিউশনেও গভীর মনোযোগ কেয়া সিনহার। শ্রীমঙ্গলে থাকলেও বিভিন্ন নৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিতে মাঝে-মধ্যে ঢাকায় যান তিনি। আর শ্রীমঙ্গলের কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই পূর্ণতা পায় না তার নৃত্য ছাড়া। এমনই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে শ্রীমঙ্গলের টি হ্যাভেন রিসোর্টে কথা হয় কেয়ার সাথে। আলাপকালে জানালেন নাচের জগতে প্রবেশের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো।

একটা সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যেই কেয়ার জন্ম। যেখানে গান-বাজনা, নৃত্য-গীতকে ধর্মীয় আচার হিসেবেই গণ্য করা হয়। গান শেখার জন্য খুব ছোটো বেলায় গানের ক্লাসে পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু গানে খুব মনোযোগী ছিলেন না খুব একটা।তার ঝোঁক ছিলো নাচের প্রতি।
সেই থেকেই নাচের শুরু। তখন থেকেই গান ছেড়ে নাচকেই জীবনচর্চার অনুষঙ্গ হিসেবে নিয়ে নেন। ক্লাস ফাইভ থেকেই তার জন্য নাচের শিক্ষক রাখা হয়।শুরু হয় নাচচর্চা।তার নাচের গুরু ছিলেন শান্তি নিকেতনের ওঝা কৃষ্ণ। তাঁর কাছে পাঁচ বছর নাচ শিখেন কেয়া। তিনি এখন আপাতত বাংলাদেশে নেই,চলে গেছেন ইন্ডিয়াতে। তবে থেমে থাকেনি কেয়ার চর্চা। এরপর ঢাকায় গিয়ে নামকরা নৃত্যশিল্পী যেমন-শিবলী মোহম্মদ, শামীম আরা নিপা’র কাছে নাচ শিখেন। তাদের সঙ্গে নাচেন।
কেয়ার বেসিক হলো মণিপুরী নৃত্য। অন্য নৃত্যের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া প্রসঙ্গে কেয়া জানান, শুরুর দিকে অন্য নৃত্য আমার কাছে খুবই প্রবলেমেটিক ছিলো। কারণ, মণিপুরী নৃত্য খুব সফট্, হাতের মুদ্রা, পায়ের মুদ্রা খুব সফটলি। আমি যখন ‘চ্যানেল আই সেরা নাচিয়ে’তে গিয়েছিলাম, সেখানে তো শুধু মণিপুরী ছিলো না। সেরা নাচিয়ে মানে অলরাউন্ড পারফর্মেন্সের প্লাটফর্ম। সেখানে ক্লাসিক্যাল, ফোক, মর্ডান, ফিউশন করতে হয়েছে। বৈচিত্র্যময় ট্র্যাকের সঙ্গে নিজেকে মেলানো প্রসঙ্গে তিনি জানান,প্রথমদিকে কোরিওগ্রাফাররা আমাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন-আমি মণিপুরী নৃত্য থেকে জেনারেল নৃত্যে যেতে পারবো কি না? তো আমি নিজেকে মনে করিয়েছি, যেহেতু আমি নাচ করি, সব নাচ আমাকে পারতে হবে। তাছাড়া ওখানকার সবাই আমাকে হেল্প করেছে। তাদের সেই হেল্প থেকেই আমি এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। বস্তুত মণিপুরী থেকে অন্য নৃত্য করা আমার জন্য খুবই টাফ ছিলো।

শ্রীমঙ্গলে থেকেই নাচের মূল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবেন কি কিংবা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবেন কি-না এমন প্রশ্নে কেয়া জানান, অনেকেই আমাকে ঢাকায় স্যাটেল হতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি চাই, শ্রীমঙ্গলে থেকেই আমার বেসিক জায়গা মণিপুরী নৃত্যটাকে আরও উপরে নিয়ে যেতে। এখানে আমি ছোটো ছোটো বাচ্চাদের নাচ শেখাচ্ছি। নাচের অনুষ্ঠানগুলোতে ওদের নিয়ে যাচ্ছি। আমার সঙ্গে একই মঞ্চে ওরা নাচার সুযোগ পাচ্ছে। এতে করে ওদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। আমি ঢাকায় চলে গেলে এই সুযোগটা ওরা পেতো না। আর মাঝে-মধ্যে তো আমি ঢাকায় প্রোগ্রাম করছি-ই।
কেয়া আরও জানান, আমার বাবা-মা আমাকে অনেক হেল্প করছেন। যেখানেই যেতে চাচ্ছি সেখানেই নিয়ে যাচ্ছেন। আমি যখনই বলছি, এখানে প্রোগ্রাম করবো, ওখানে যাবো, তারা খুব সাপোর্ট করছেন।
নতুনদের উদ্দেশ্যে কেয়া বলেন, আমার মনে হয় শিখে মঞ্চে যাওয়াই ভালো। কারণ, না শিখে মঞ্চে গেলে সেখানে আপনার জায়গা নাও হতে পারে। আর শিখে মঞ্চে গেলে মঞ্চই আপনাকে জায়গা করে দেবে।
নিজের প্রসঙ্গে কেয়া বলেন, আমি মনে করি শেখার কোনো শেষ নেই, বয়স নেই। তবে আমি যেটুকু শিখেছি পারফেক্ট শিখেছি, বিশেষ করে মণিপুরী। অনেক বড়ো বড়ো নৃত্যশিল্পী আছেন, যারা আমার মণিপুরী নৃত্যের প্রশংসা করেছেন। আর আমি কোরিওগ্রাফি পারি।

মণিপুরী নৃত্যের বিশেষত্ব সম্পর্কে কেয়া বলেন, এ নাচের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো-এর হাতের কাজ, পায়ের কাজ অন্য যে কোনো নাচের চেয়ে ভিন্ন। মণিপুরী নাচের সাথে অন্য কোনো নাচের তুলনা করা যায় না। এর গানের ভাষা অনেক ডিফ্রেন্ট। এ নাচের মধ্যে একটা ধর্মীয় ভাব থাকে। ধর্মীও ভাবাবেগের প্রকাশ ঘটে এই নৃত্যে। আর এ নাচের মধ্যে বেসিক্যালি শ্রীকৃঞ্চের গুণ-কীর্তন থাকে। নাচ নিয়ে নিজের স্বপ্ন সম্পর্কে কেয়া জানান, আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে নাচটাকে উপরে নিয়ে যাওয়া, বিশেষ করে মণিপুরী নৃত্য। আজ যেমন শামীম আরা নিপা, শিবলী মোহম্মদকে একনামে সবাই চেনে, তেমনি মণিপুরী নৃত্যের জন্য কেয়া সিনহাকেও মানুষ এক নামে চিনবে এক সময়। সেই সময়ের প্রত্যাশায়।

No comments: