জলিলের বায়োস্কোপ

জুড়ী টাইমস সংবাদ: ‘এইবারেতে দেখেন ভালো, ডাইনে-বামে নজর করো, সুন্দরবনের বাঘ-ভালুক সামনে আছে, আগ্রা তো না তাজমহল, দেখতে যত বাহার আছে, ডানে বামে নজর করো, আরও কিছু রইয়া গেল...।’ 

সুর করে বলে চলেছেন মাথায় গামছা বাঁধা আবদুল জলিল মণ্ডল। তাঁর এক হাতে বাজছে প্রেমজুড়ি, আরেক হাত দিয়ে ঘুরছে বায়োস্কোপের চাবি। গত রোববার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দেখা গেল এই দৃশ্য। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে বায়োস্কোপ দেখাতে এসেছিলেন আবদুল জলিল।

বাজনার তালে তালে নাচছিল জলিলের পা দুটো। ওই তালে আটকে যাচ্ছিলেন দর্শক। কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ কেউ অপেক্ষা করছিলেন—কী আছে ওই বাক্সে, তা দেখার জন্য।
বায়োস্কোপ দেখাতে ব্যস্ত আবদুল জলিল মণ্ডল। এ কারণে কথা বলা সম্ভব হচ্ছিল না তাঁর সঙ্গে। একসময় ব্যস্ততা কমে। কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় বাড়ি জলিল মণ্ডলের। বয়স কত জানতে চাইলে বললেন, ‘কত আর হবে, ৪০-৪৫’। কীভাবে এলেন বায়োস্কোপ দেখানোর এই পেশায়? জবাবে জানালেন, বাবা-দাদারা এই পেশায় ছিলেন। তাঁদের পথ ধরে তিনিও এই পেশায়। বায়োস্কোপ দেখিয়ে ৩০ বছর পার করে দিয়েছেন। এ দিয়েই সংসার চলে। তবে এখন আর এই পেশায় তত আয় নেই।

‘এইটা গ্রামে আগে চইলত। এখন টিভি-সিডি হওয়াতে আর তেমন চলে না।’ বললেন জলিল মণ্ডল। জানালেন, যে সময় বায়োস্কোপ দেখান না, সে সময় খেতমজুরের কাজ করেন। নিজের জমি নেই, পরের জমিতে কাজ করেন।
স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ‘ডাল-ভাত’ খেয়ে দিন চলে যাচ্ছে জলিল মণ্ডলের। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন কয়েক বছর আগে।

মাথায় বায়োস্কোপ নিয়ে গ্রামের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ান জলিল মণ্ডল। তিনি জানান, তাঁর বাপ-দাদা যে বাক্সে বায়োস্কোপ দেখিয়েছেন, সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর নিজে নতুন করে বানিয়ে নিয়েছেন এই বাক্স। তাঁর বায়োস্কোপে একসঙ্গে ছয়জন দর্শক দেখতে পারে।
বায়োস্কোপ দেখাতে গিয়ে কিছু কিছু সময় সমস্যায় পড়েন। অনেকে টাকা না দিয়েই চলে যান। এবারের বৈশাখী মেলাতেই ঘটেছে এমন ঘটনা। বলেন, এসবে কষ্ট লাগে তার।

বায়োস্কোপে ‘পুরো দুনিয়া’ দেখান জলিল মণ্ডল। কী দেখান না তিনি! পবিত্র মক্কা ও মদিনা শহরের ছবি দেখান তিনি। দেখান আজমির শরিফের ছবি। তাঁর বায়োস্কোপে দেখা যায় পরিস্থানের পরী, দুলদুল ঘোড়াও! দেখান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী নজরুল ইসলাম ও ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। জলিল তাঁর বায়োস্কোপে দেখান মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানান দৃশ্য।

বাংলা একাডেমির ১০ দিনের বৈশাখী মেলা শেষ। ক্লান্ত জলিল মণ্ডলের বাড়ি যাওয়ার তাড়া। বায়োস্কোপের বাক্স গোছাতে শুরু করেছেন। বাক্স থেকে বের করলেন একটি লাল হাফ সিল্কের টাঙ্গাইল শাড়ি। কার জন্য? জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘বাড়ির মানুষের’ জন্য। যাঁদের সঙ্গে মেলায় এসেছেন, তাঁরা ঠাট্টা-মশকরা করেছেন। কিপ্টে বলেছেন। তাই ১ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে এই শাড়ি কিনেছেন। বলতে বলতে জলিলের ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসির রেখা ফুটে ওঠে। তবে কিছুটা আক্ষেপও আছে তাঁর। কারণ, বাচ্চাদের জামাকাপড়ের দাম বেশি হওয়ায় সন্তানদের জন্য কিছু কিনতে পারেননি।

No comments: