জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে- নজরদারিতে মৌলভীবাজারের প্রবাসীদের বিলাসবহুল বাড়ি

ইমাদ উদ দীন: গ্রামে কিংবা শহরে বিসাবহুল বাড়ি। কোটি কোটি ব্যায়ে নির্মিত এই বাড়ি গুলো থাকছেন না মালিক। কারণ সপরিবারে তারা সবাই প্রবাসী। লন্ডন,আমেরীকা,কানাডা,ইতালি,ফান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই তারা করছেন বসবাস। আছেন মধ্যপ্রাচ্যেও। সপরিবারে সবাই ওই দেশ গুলোতে থাকায় নিজ দেশের গ্রাম ও শহরের বাড়ি গুলো যাচ্ছে ভাড়ায়। গেল কয়েকদিন থেকে এখন এমন বাসা ও বাড়ির দিকে পুলিশের বিশেষ নজরদারি। জানা যায় প্রবাসীদের ওই বিলাসবহল বাড়ি গুলো নিজ আত্মীয় স্বজন কিংবা বেতন ভোক্ত কেয়ারটেকার দেখভাল করেন বাসা বাড়ি গুলোর। কিন্তু অধিকাংশ প্রবাসীদের নিকট আত্মীয়রাও প্রবাসে থাকায় বাসা বাড়ি দেখভালের দ্বায়িত্ব থাকে বেতন ভোক্ত কেয়ারটেকারের উপর। আর কেয়ারটেকার হন ওই প্রবাসীদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়,কিংবা নিজ এলাকার অথবা অন্য জেলার বাসিন্ধা। যারা ওই প্রবাসী পরিবার গুলোতে দীর্ঘদিন চাকুরী কিংবা সম্পর্কের সুবাদে আপন হয়ে উঠেন। আর একারণেই বিশ্বস্ত কেয়ারটেকাররা তাদের মত করে ওই বাড়ি গুলোতে ভাড়াটিয়া তোলেন ও ভাড়া নির্ধারণ করেন। মৌলভীবাজারে দুটি জঙ্গি আস্তানার বাড়িতে ৮২ ঘন্টা অভিযানে ১০ জন নিহত হওয়ার পর এখন জঙ্গি ইস্যুতে জেলা জুড়ে চলছে সরগরম আলোচনা। ওই সকল আলোচনায় জঙ্গি প্রতিরোধে সচেতনাবৃদ্ধিতে করণীয় বিষয়ে আলোচনায় প্রথমে আসছে প্রবাসীদের বিলাস বহুলবাড়ি। এর কারন ওই জঙ্গি আস্তানা দুটির বাড়ির মালিক ছিলেন লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমান (সাইফুল)। ওই প্রবাসীর গ্রাম (নাসিরপুর) এবং শহরে (বড়হাট) দুটি বাড়ি ঘিরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর আলোচনায় এখন প্রবাসীদের বিলাস বহুল বাড়ি। প্রবাসীদের অনুপস্থিতিতে কেয়ারটেকার নিয়ন্ত্রিত এসব বাড়িগুলোকে জঙ্গিরা নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেঁছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সুত্রে জানা যায় ওই ঘটনার পর এমন সব বাড়ির তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। তবে অহেতুক কোন প্রবাসী বা বাড়িওলা যাতে বিড়ম্বনার শিকার না হন সে দিকটাও তারা গুরুত্ব সহকারে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখবন বলে জানা গেছে। শহর কিংবা গ্রামে বাড়ি কারা ভাড়া নিচ্ছে, ভাড়া নেওয়া ওই বাড়ি গুলোতে কারা থাকছে এ তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এমনটিই চিহ্নিত করা হবে। আরও জঙ্গি আস্তানা আছে কিনা এমন সন্দেহে পুরো জেলায় রয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার বাড়তি নজরদারিও। প্রবাসীরা মধ্যে কেউ দেশে জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত আছেন কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই অঞ্চলের প্রবাসীদের দান খয়রাতের টাকা কোথায় কি ভাবে ব্যয় হচ্ছে এমন সব নানা বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ গুলো। একটি বে সরকারী সংস্থার তথ্য মতে, মৌলভীবাজার সহ সিলেট বিভাগের চার জেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চাকুরী ও ব্যবসায় রয়েছেন। তবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের বসবাস লন্ডনে। বিশাল অর্থবিত্তের মালিক এসব প্রবাসীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে গ্রামের বাড়িতে বাগান বাড়ি কিংবা শহরে ফ্ল্যাট বাড়ি নিমার্ণ করেন। কিন্তু তারা প্রবাসে থাকায় বাড়ি গুলো থাকে অব্যবহৃত কিংবা থাকেন ভাড়াটিয়ারা। মাঝে মধ্যে অল্পদিনের জন্য তারা দেশে আসলে ওই বাড়ি গুলোর যে কোন একটি অংশে থাকেন। বাড়ির মালিকের থাকার ওই ঘর বা কক্ষগুলো কেয়ারটেকরা কখনো ভাড়া দেন না। আর দিলেও তা শর্তশাপেক্ষে। যে হেতু মালিকদের অবর্তমানে কেয়ারটেকরাই সব। এ সুযোগেই ওদের নানা টোপে ফেলে জঙ্গিরা প্রবাসীদের ওই বাড়ি গুলো তাদের কাজে লাগে পারে বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা। এমন সন্দেহ আর গেল অভিযানের প্রাপ্ত তথ্য উপাথ্য নিরিখেই তারা নজরদারী রাখছেন ওই বাড়ি গুলোর প্রতি। প্রবাসীদের বেশিরভাগ বাড়িগুলো শহর পাশ্ববর্তী গ্রামে। বাড়িগুলো আয়তনে বড় থাকায় একটি বাড়ি থেকে অন্যবাড়ির দুরত্বও অনেক। চৌসীমানা উঁচু পাকা দেওয়াল আর প্রধান ফটক ও ঘরের প্রধান ফটক নিরাপদ হওয়ায় মিলে বাড়তি নিরাপত্তা। তাছাড়া বাড়ি জুড়ে গাছ-গাছালিতে আচ্ছাদিত হওয়ায় এসব বাড়িগুলোও থাকে নিরিবিলি। এসব কারনে ওই বাড়ি গুলো রয়েছে জঙ্গিদের পচন্দের তালিকায়। আর এজন্যই তারা সেগুলোকেই বেছে নিচ্ছে। একটি এনজিও সংস্থার জরিপের তথ্যানুযায়ী,মৌলভীবাজারসহ সিলেট অঞ্চলে এমন আলিশান বাড়ি রয়েছে পাঁচ হাজারের উপরে, যার প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় এক থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। সিলেটের বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় এসব বাড়ির সংখ্যাও অনেক। তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের প্রবাসীদের পাঠানো অর্ধেকের বেশি রেমিটেন্স অর্থাৎ ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া কৃষি জমি ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। অকৃষি কাজ ও ব্যবসায়িক খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। মৌলভীবাজারের খলিলপুর ইউনিয়নের নাসির পুর ও পৌর শহরের বড়হাট এলাকার লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমানের মালিকানাধীন জঙ্গি আস্তানার বাড়ি দুটিতে অভিযানের পর এবিষয়ে কয়েকজন লন্ডন প্রবাসীর বক্তব্য জানতে চাইলে তারা জানান। ঘটনার পর থেকে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া,কেয়ারটেকার ও এ নিয়ে নিরাপত্তার জন্য পুলিশি ঝামেলার কারনে তারা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পড়েছেন। তারা একারনে এখন অনেকটা ভয়ে দেশের বাড়িতে আসতে চাইছেন না। জঙ্গি এবং একারনে পুলিশের নজরদারী দুটিরই ভয়ে তারা আতঙ্কিত। কয়েকজন প্রবাসী জানান এঘটনার পর থেকে হয়ত অনেক প্রবাসীই দেশে বাড়ি নিমার্ণের আগ্রহ হারাবেন। তবে তারা দেশদ্রোহী এসকল জঙ্গিদের ঘৃণিত কাজের দৃষ্ঠান্ত শাস্তি চান তারা। তারা শান্তির এদেশে কোন জঙ্গি গোষ্টির অভয়ারণ্য চান না। তবে প্রবাসীদের উৎকন্ঠার বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভয় দিয়ে বলেন প্রবাসী অধ্যুষিত এজেলার প্রবসীরা কোন ভাবেই যাতে হয়রানির শিকার না সে দিকটি সর্বচ্ছো গুরুত্ব দেওয়া হবে। সকলের নিরাপত্তার জন্য আমাদের নজরদারী কাউকে হেও কিংবা ঝামেলায় ফেলার জন্য নয়। কারন আমাদের সকলের সমন্বিত প্রচেষ্ঠায়ই সম্ভব এজেলা তথা দেশ কে নিরাপদ ও জঙ্গি মুক্তরাখা।

No comments: