বৃষ্টি থামলেও কান্না থামছে না হাকালুকি হাওর তীরের কৃষকের

আবদুর রব: বুধবার রাত থেকে থেমেছে বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টি থামলেও থামছে না কৃষকের কান্না। হাকালুকি হাওরের ধলিয়া বিলে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন কৃষক মুছা মিয়া (৫৫)। জানালেন এবার আর কাচি নিয়ে ধান কাটতে বোরো ক্ষেতে নামতে হবে না। একটি ধান গাছের পাতাও রাখেনি অকাল বন্যায়। নিজের বছরের খাবারের পর অতিরিক্ত ২০-৩০ মন ধান তিনি বিক্রি করেন। অথচ এবার ধান বিক্রি তো দুরের কথা, সারা বছর কিভাবে স্ত্রী সন্তানের মুখে দুমুটো ভাত তুলে দিবেন সেই চিন্তায় দিশেহারা।

একই চিত্র হাকালুকি হাওর তীরের তালিমপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর, হাল্লা, আহমদপুর, খুটাউরা, পাবিজুরি, শ্রীরামপুর, মুর্শিবাদকুড়া বড়লেখা সদর ইউনিয়নের গাজীটেকা, সোনাতোলা, সুজানগর ইউনিয়নের পাটনা, কটালপুর, ঝগড়ি, দশঘরি, বারহালি ও বর্নি ইউনিয়নের পাকশাইল এলাকার সম্পূর্ণ বোরোধান পানির নীচে। এসব এলাকার মানুষের মধ্যে চলছে মাতম। গাজীটেকা হাওরের কৃষক মনির আলী, টুনু মিয়া, মন্তই মিয়া, কবির আহমদ, তালিমপুর ইউপির হাল্লার হেলাল উদ্দিন বাদল মিয়া, রিয়াজ উদ্দিন জানান, বৃষ্টি না হলেও হাওরের পানি বাড়ছে। এতে পানি কমতে কমতে আর বোরো ধানের কোন অস্থিত্ব থাকবে না। ধানের ভাল ফলন দেখে চোখে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। ধান কেটে স্ত্রীর চিকিৎসা করাবেন, মেয়ের স্কুলের গাইড বই কিনে দেবেন। এক সপ্তার বর্ষণে সব স্বপ্ন ভেসে গেছে।

হাওরপারের কৃষক আব্দুল হাসিম, আব্দুল মন্নান, আব্দুল মালিক, মদন নাথের একটাই কথা, গত বছর বৈশাখ মাসে বন্যা হয়েছিলো। এবার চৈত্র মাসের মাঝামঝি থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে অকাল বন্যায় তলিয়ে গেলো সারা বছরের একমাত্র ক্ষেতের বোরো ধান।

হাকালুকি হাওর তীরের জয়চন্ডী, ভুকশিমইল, বরমচাল ও ভাটেরা ইউনিয়নের মানুষ জানান, চৈত্র মাসে এমন অকাল বন্যা কোনদিন দেখেন নি তারা। যদি পাহাড়ী ঠলে বোরো ধান তলিয়ে গেলেও কোন কথা ছিলো না। এখন বন্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তা ঘাট। পানিবন্দি হয়ে পড়ছে মানুষ।

ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, এই অঞ্চলের মানুষ একমাত্র বোরো ক্ষেতের উপর নির্ভরশীল। একমুঠো ধান তুলতে পারেনি কোন কৃষক। ফলে এবার হাকালুকি হাওর তীরের মানুষের মাঝে তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

বড়লেখা কৃষি অফিসার কুতুব উদ্দিন বুধবার ০৫ এপ্রিল হাকালুকি হাওর এলাকার সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধানের সম্পূর্ণটাই বন্যায় তলিয়ে গেছে বলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত এ হিসেব বেড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আমরা সরেজমিন হাকালুকি হাওরপারের তালিমপুর, বর্নি ও সুজানগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছি। এলাকার সার্বিক চিত্র খুবই ভয়াবহ। ধানতো নাই, এরমাঝে ঘুর্নিঝড়ে মানুষের বাড়িঘর, স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত করেছে। এখন আবার বন্যায়ও রাস্তাঘাটও তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষিবিভাগ এবং পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) অফিস পৃথকভাবে উপজেলায় অকাল বন্যা ও ঘুর্নিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। চুড়ান্ত হলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

No comments: