ইত্যাদিতে সুযোগ চায় সিলেটের জন্মান্ধ শিল্পী নাছিমা ভান্ডারী

জুড়ী টাইমস সংবাদ: আমাদের সমাজে অনেকে বলেন গান মানুষের প্রাণ, গান মানুষের মনের খোরাক, কিন্তু সেই গানই কারো জীবন বাঁচানোর একমাত্র সম্বল। তেমনি দেখলাম একটি অন্ধ পরিবার সুনামগন্জ জেলার দিরাই উপজেলার হালুয়ার গ্রামের অন্ধ শিল্পী নাছিমা ভান্ডারী (২১)। নাছিমা ছাড়াও তার পরিবারের মা সহ আরও ৪ জন জন্মান্ধ রয়েছেন।

কিন্তু এই দৃষ্টিহীনতা দমিয়ে রাখতে পারেনি নাছিমাকে। দৃঢ় মনোবল আর গানকে পুঁজি করে নাছিমা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সুনামগন্জ, সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সঙ্গীত অঙ্গনে অন্ধ শিল্পী নাছিমা ভান্ডারী হিসেবে পরিচিত অর্জন করে নিয়েছেন।

নাছিমার জীবনের সব ভাবনা, চাওয়া পাওয়া গান নিয়েই, গানই অন্ধ নাছিমার জীবন বাচাঁনোর সঙ্গী। নাছিমা গলায় বাজে বাউল গান, ফোক, মারফতি ও মুর্শিদী গান। যে গানে আল্লাহ কে পাওয়ার আশা, যে গান মাটি ও মানুষের হৃদয়ের কথা বলে, সেই গান গুলো বেশি করেন নাছিমা। আধুনিক গানও ভালো গাইতে পারেন। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকেন গানের প্রোগ্রামের আশায়।

এরপরও প্রতি সপ্তায় এক দিন বুধবারে ৩৬০ আউলিয়া সমাজ কল্যাণ সংস্থা সিলেট লাউয়াই জমে উঠে শিল্পীদের মিলন মেলা। সেখানে শত শত গান ভক্ত দর্শকরা আসেন গান শুনতে। রাত ১০টা থেকে শেষ রাত পর্যন্ত মুক্ত মঞ্চে গান পরিবেশন করেন নাছিমা সহ অন্যান্য সঙ্গীত শিল্পীরা। সেখানে নাছিমার মধু মাখা যাদুময়ি গান শুনে খুশি হয়ে দর্শক-শ্রেুাতারা যা টাকা দেন। সব মিলিয়ে কোন ভাবে খেয়ে না খেয়ে চলে নাছিমার দরিদ্র সংসার।

অন্ধ শিল্পী নাছিমা জানান, আমি জন্ম অন্ধ তাই ছোট বেলা থেকে গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি স্কুল, কলেজে নিজ চেষ্টায় গান করে আসছি। এরপর সুনামগন্জ জেলার কৃতি সন্তান খ্যাতিমান শিল্পী বাউল কফিল উদ্দীনের শিষ্য বাউল মোসাইদ ভান্ডারীর কাছে ২০০৪ সাল থেকে সঙ্গীতের তালিম নিচ্ছি।

নাছিমার সংসারে রয়েছেন তার মা, বাবা, তিন বোন ও এক ভাই এক মাত্র বৃদ্ধ বাবা ছাড়া সবাই জন্ম থেকেই অন্ধ। কিন্তু পরিবারের এসব অন্ধ সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয় নাছিমাকে। নাছিমা ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড়।
নাছিমা বলেন ভিক্ষাবৃত্তির বদলে তিনি নিজে অনেক কষ্ট করে গান শিখেছি। চোখে দেখতে পাওয়া একমাত্র বৃদ্ধ বাবাকে বিভিন্ন গানে অনুষ্টানে নিয়েযাই। নাছিমার ইচ্ছে জীবনে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত গান গেয়ে মানুষে হৃদয়ে বেঁচে থাকা, ২০১৪ সালে নাছিমার একটি একক গানের ভিডিও এ্যালবাম “সাথী হারা” নামে সিলেটের একটি কোম্পানি থেকে বাজার জাত হয়েছিল, সেই এ্যালবামের গানগুলো ভক্তদের মনে ঠাই পেয়েছে ১. মাইয়া হইতে জগত পয়দা, ২. আর জ্বালা দিওনা বন্ধুরে। ইতি মধ্যে বাংলাদেশ বেতার সিলেট এ অডিশনে পাশ করে তালিকা ভোক্ত শিল্পী হয়েছেন নাছিমা।

জন্মান্ধ নাছিমার চাওয়া জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের মধ্যমে বিটিভি’র জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে একবার সুযোগ পেয়ে একটি গান পরিবেশন করা। আমাদের চোখের সামনে অনেক প্রতিভাবান শিল্পীরা গানের মাধ্যমে সমাজে তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কিন্তু সরকারি ভাবে কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা পাননি দৃষ্টিহীন এই পরিবারটি। তাই অনেকটা কষ্টেই কাটছে তাদের দৈনন্দিন জীবন।

আক্ষেপ করে নাছিমা বলেন, ‘‘মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের কথা জানাতে চাই সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর ও সিলেট জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে প্রতিবন্ধী এই শিল্পীর দাবী তারা যেন মাসিক একটি আর্থিক অনুদান সরকার থেকে পান, এটাই তার প্রত্যাশা। বর্তমানে নাছিমা সিলেটের একটি কলোনীতে ৯শ’ টাকায় ১টি রুম ভাড়া নিয়ে অন্ধ মা, ভাই, বোন সহ সবাইকে নিয়ে বসবাস করছে। নাছিমা জানান গান গেয়ে কোনো ভাবে সংসার চলছে কিন্তু এখানে ভাড়া থেকে গানের রেওয়াজ করতে পারিনা আসপাশের ভাড়াটিয়াদের সমস্যা হয়। তাছাড়া টাকার অভাবে হারমোনিয়াম বিক্রি করে দিয়েছি। রেওয়াজ ছাড়া এভাবে থাকলে আমার গলা নষ্ট হয়ে যাবে। এরপর আমি কিভাবে আমার অন্ধ ভাই বোনদের মুখে খাবার তুলে দিব?।#

No comments: