হাকালুকির ফসল রক্ষায় সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের বোরোসহ অন্যান্য ফসল পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষায় সরকারি কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। এ কারণে আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে হাওরের ফসল রক্ষাসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে কৃষক সমিতি ও ক্ষেতমজুর সমিতি গতকাল সোমবার বিকেলে কুলাউড়ার ইউএনওর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়। 

তিন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়, প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর। এটি দেশের বৃহত্তম হাওর। কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা ছাড়াও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকাজুড়ে এ হাওরটি বিস্তৃত। এ বছর মার্চ মাসের শেষ দিকে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শুধু কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাওর তলিয়ে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার কাঁচা ও আধা পাকা বোরো ধানের ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন ২৬ হাজার কৃষক। এর আগে ২০১০ সালে এপ্রিল মাসের দিকে একইভাবে আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল। হাওরের বিভিন্ন এলাকা প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ ছিল। হাওরটির ফসল রক্ষায় ১৯৮২ সালের দিকে পাউবো একটি সেচ প্রকল্পের প্রস্তুতি নিয়েছিল। তখন মাছ চাষ ব্যাহত হওয়ার কারণ দেখিয়ে পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা আপত্তি জানালে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কৃষক সমিতি ও ক্ষেতমজুর সমিতির দেওয়া স্মারকলিপিতে হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা, ফসল রক্ষায় পলিতে ভরাট হয়ে পড়া নদ-নদী ও খাল পুনঃখনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং হাওরের বিল (জলমহাল) ইজারা প্রথা বাতিলসহ ১০ দফা দাবি উল্লেখ করা হয়।

ক্ষেতমজুর সমিতির কুলাউড়া উপজেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোশারফ আলী বলেন, ‘হাকালুকি হাওরে কোটি কোটি টাকার বোরো ধান উৎপাদিত হয়। আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসল নষ্ট হয়। কৃষকদের সর্বনাশ হয়। অথচ এ হাওরের বোরো ধান ও অন্যান্য ফসল রক্ষায় সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এটা হাওর অঞ্চলের মানুষকে পীড়িত করে। হাওরপারের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন দাবি জানিয়েছি। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সদয় হবেন।’

মৌলভীবাজারের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহজাহান আজ মঙ্গলবার মুঠোফোনে বলেন, ‘ফসল কীভাবে উৎপাদিত হবে, ফসলের পোকা-মাকড় ঠেকাতে কী ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে—কৃষি বিভাগ শুধু সে পরামর্শ দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে হাওরের ফসল রক্ষার ব্যাপারটি কৃষি বিভাগের নয়। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।’
তবে তিনি বলেন, এবারের পাহাড়ি ঢলে হাকালুকির বোরো ধানসহ বিভিন্ন জাতের ফসলের বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। হাওরের পানি দ্রুত সরানোর বিষয়ে পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলেছেন। হাওরের উঁচু স্থানে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করা যায় কি না, সে ব্যাপারে পাউবোর কর্মকর্তাদের তাঁরা পরামর্শও দিয়েছেন।

পাউবোর মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী মুঠোফোনে বলেন, হাকালুকি হাওরে সেচ প্রকল্প হলে ড্রেন নির্মাণ করে পাম্পের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হতো।

ফসল রক্ষায় হাওরে কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে আপত্তি আছে কি না, জানতে চাইলে মৌলভীবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ক ম শফিকুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন, ‘হাকালুকিতে মাছ ও বোরো চাষ দু-ই হয়। এবার হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির পাশাপাশি ধান পচে পানি দূষিত হয়ে ২৫ মেট্রিক টন মাছও মারা গেছে। মাছের আবাসস্থলের যাতে ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ফসল রক্ষায় কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে আমাদের আপত্তি থাকবে না।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, ‘হাকালুকি হাওরটি এখনো হাওর উন্নয়ন বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দীর্ঘদিনেও সেটা কেন হয়নি জানি না। হাওর উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় থাকলে সেখানে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ হতো। তবে হাওর উন্নয়ন বোর্ডে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানাব।’

No comments: