হাকালুকিতে ধান পচে মরছে মাছ

বিশেষ প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে থাকা আধা পাকা বোরো ধান পচে দূষণে বিভিন্ন জাতের মাছ মরে যাচ্ছে। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, ধান পচে পানিতে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সৃষ্টি হওয়ায় মাছের মৃত্যু হচ্ছে। 

হাওরে মাছ ধরা বন্ধে তিন উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে আজ সোমবার মাইকিং করেছে। তবে হাওরে কী পরিমাণ মাছ মারা গেছে, এর কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। এদিকে ধান পচে পানি দূষিত হওয়ায় হাওরপারের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।

মৌলভীবাজার জেলার মৎস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত হাকালুকি হাওর। এখানে বোয়াল, পাবদা, রুই, চিতল, কালবাউশ, মৃগেল, আইড় ইত্যাদি প্রজাতির মাছ মেলে। প্রতিবছর গড়ে তিন উপজেলায় প্রায় ছয় হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। 

আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাওরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুঁটি, ট্যাংরা, মলা, পাবদা, চাপিলা এবং বোয়াল, রুই, ঘনিয়াসহ বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা মরে পানিতে ভেসে আছে।

কুলাউড়ার ভূকশিমইল ইউনিয়নের বাদে গৌড়করণ গ্রামের মৎস্যজীবী আব্বাস আলী (৪৫) বলেন, গতকাল সকালের দিকে তিনিসহ আরও চার-পাঁচজন বেড়জাল নিয়ে চকিয়া বিলের কাছে মাছ ধরতে যান। এ সময় বেশ কিছু মরা মাছ ভাসতে দেখেন। পরে জাল নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।

চকিয়া বিলের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ হাকালুকি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলে তাঁদের বিল আগেই তলিয়ে গেছে। রোববার সকাল থেকে বিল ও আশপাশের ভাসান পানিতে বিভিন্ন জাতের মাছ মরে ভেসে উঠছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে।

জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও গ্রামের ছবির মিয়া (৫০) বলেন, ‌‘আওরো (হাওর) মাছ ধরি বাজারো বেচি। মাছে মড়ক আইছে। অখন খাইয়া-বাঁচি থাকতাম কিলা।’

পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের চক গ্রামের অনিল বিশ্বাস (৫৫) বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় হাওরের মাছ এভাবে মরে ভেসে উঠেছিল। ২৯ বছর পর তা আবার ঘটল।

জুড়ীর চাতলা বিলের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান জুড়ী ভ্যালি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্পাদক ও জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জমির আলী বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁরা বিলে ১০ কেজি রুইজাতীয় কার্পিও মাছের রেণু উৎপাদন করে ছেড়েছিলেন। এক কেজি রেণু থেকে কমপক্ষে আড়াই লাখ পোনা হওয়ার কথা। রোববার বিকেলে গিয়ে অনেক পোনা মরে বিলে ভেসে থাকতে দেখেন তাঁরা। 

সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর কুলাউড়ায় হাওরের ১২টি বিলে গড়ে ৯৫০ মেট্রিক টন, বড়লেখায় ১৩৪টি বিলে ৩ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন এবং জুড়ীতে ৩৮টি বিলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়।

বড়লেখা উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু ইউছুফ বলেন, ‘হাওরে মাছের অবস্থা খুবই খারাপ। বাইন মাছ কাদায় থাকে। কিন্তু বিষক্রিয়ায় অন্যান্য মাছের পাশাপাশি এ মাছও মরে ভেসে উঠেছে দেখেছি।’

কুলাউড়ার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ ও জুড়ীর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুস শাকুর বলেন, তাঁরা হাওরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মরা মাছ ভাসতে দেখেছেন। মাছ মরে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, ধান পচে পানিতে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে অ্যাসিড ও ক্ষারের আদর্শ মাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ পিএইচ। কিন্তু হাওরের পানি পরীক্ষা করে তাতে এর মাত্রা ৫ দশমিক ৮ পাওয়া গেছে। অ্যাসিড ও ক্ষারের মাত্রা ৬ দশমিক ৫-এর নিচে এবং ৮ দশমিক ৫-এর বেশি হলে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। এসব কারণে বিভিন্ন জাতের মাছ মরে ভেসে উঠছে।

তিন উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তারা বলেন, হাওরে জাল টেনে মাছ ধরতে গেলে মাছের আরও ক্ষতি হবে। সে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, হাওরে চার-পাঁচ দিন মাছ না ধরতে জেলেদের সতর্ক করে আজ দুপুরে তিন উপজেলার হাওরপারের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করানো হয়েছে। এ ছাড়া মড়ক ঠেকাতে হাওরে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। হাওরে মাছের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে বলে তাঁরা জানান।

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন সত্যকাম চক্রবর্তী মুঠোফোনে বলেন, হাওরের পানি দূষিত হওয়ায় এ পানি ব্যবহারে ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস ও চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার।

No comments: