একজন আবুল বাশার : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ: পার্থিব জীবনের শেষপ্রান্তে যে তিনি চলে এসছেন তা অনুমেয় ছিল। তবুও, সূড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে  কোন আলোক রেখার দেখা পেলে আটকে পড়া পর্যটক  যেমন আশাবাদী হয়ে উঠে, তেমনি শারিরীক অবস্থার ক্ষাণিক উন্নতিতে স্বপ্ন দেখেছিলাম হয়ত আরও কিছু দিন তিনি আমাদের মাঝে থাকবেন। কিন্তু সব স্বপ্ন, আশাকে ভঙ্গ করে অবশেষে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বলছি জুড়ির রাজনীতি, ক্রীড়াঙ্গন ও সামাজিক- সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয় মুখ, সদা হাস্যোজ্জ্বল আবুল বাশারের কথা। ঘাতক ক্যান্সারের আঘাতে যিনি পরাপারে পাড়ি দিয়েছেন বৃহস্পতিবার ( ১৬ মার্চ, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) রাতে। 

সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রিয় বাশার ভাইয়ের এই চলে যাবার খবর শুনে কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারছি না।  বারবার মনে পড়ছে কথা সাহিত্যিক  তারাশঙ্করের অমর উক্তি, “ হায়, জীবন এত ছোট কেনে?” সেই যদি চলে যেতেই হয়, তবে কেন এই মিছেমিছি মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়া। 

বাশার ভাইয়ের সাথে কাটানো অনেক আনন্দময় স্মৃতিগুলোর কথা এখন মনের কোনে উঁকি দিচ্ছে। তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৯০ সালে সে সময়কার জুড়ির একমাত্র মেধা পরীক্ষা ‘নয়াবাজার বৃত্তি’ পরীক্ষা দিতে গিয়ে। বর্তমানে স্পেন প্রবাসী চাচাতো ভাই শহিদুজ্জামাল আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সে পরীক্ষায়। তিনি এসেছিলেন তাদের কনিষ্ঠ ভাই আবুল হোসেন তাজুলকে (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) নিয়ে। পরবর্তীতে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে একই বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে যার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে এবং দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে যা অটুট রয়েছে। 

মাধ্যমিকে ভর্তি হবার পর থেকে মধ্যাহ্ন বিরতিতে পত্রিকা পড়তে বের হতাম। ভবানীগঞ্জ বাজারের চৌমুহনীস্থ তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উজ্জ্বল স্টেশনার্সে বসেই পড়া হতো দিনের পত্রিকা। এভাবেই সময়ের সাথে বাড়তে থাকে বাশার ভাইয়ের সাথে হৃদ্যতা। খেলাধূলা, রাজনীতি, সংস্কৃতি নানা বিষয়ে চলত আলোচনা, তর্ক- বিতর্ক। সব সময় যে উভয়ে সহমত পোষণ করতাম তা নয়। কিন্তু নিজের মতকে চাপিয়ে দেয়ার কিংবা অন্যের মতামতকে অসম্মান করার মানসিকতা তাঁর মাঝে ছিল না। একইসাথে ক্রিকেট খেলেছি। কখনো তিনি ক্রিকেট মাঠে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেছেন, আমি কাজ করেছি স্কোরার কিংবা ধারাভাষ্যকার হিসেবে। অনেক ব্যাটমিণ্টন প্রতিযোগিতায় রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজেদের উদ্যোগে আয়েিিজত কোন ক্রিকেট ম্যাচ বা ব্যাটমিণ্টন প্রতিযোগিতায় আম্পায়ার বা রেফারির দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করার সাথে সাথেই হাসিমুখে তা মেনে নিয়েছেন।

এক পর্যায়ে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জুড়ি ছাড়লেও আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে কোন ছেদ পড়ে নি। যখনই এলাকায় এসেছি তাঁর সাথে দেখা সাক্ষাত হয়েছে। পড়াশোনার হাল-হহিকত জানতে চেয়েছেন। বিসিএস উত্তীর্ণ হওয়ার খবর শুনে অত্যন্ত খুশি হয়ে বলেছিলেন ‘অনেক দুঃসংবাদের মাঝে একটি সু সংবাদ পেলাম’।  অগ্রজ সহোদর নুরুল ইসলাম ফয়েজ ক্যান্সার আক্রান্তের পর এক পর্যায়ে যখন সুস্থ হবার সম্ভবনা  আর  ছিল না, তখন কাছের অনেককেই দেখেছি মুখ ফিরিয়ে নিতে। তাঁর থেকে সুবিধা আদায়ের সুযোগ নেই দেখে অনেকেই দূরে চলে গেছেন। তদুপরি কিছু মানুষ ছিলেন যারা স্বার্থের টানে নয়, ভালোবাসার টানে এই দুঃসময়ে আমাদের পাশে ছিলেন, সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিয়েছেন, বাশার ভাই ছিলেন তাদের একজন। 

বলা বাহুল্য, শিক্ষাবর্ষের হিসেবে তিনি আমার ছয় বছর জ্যেষ্ঠ ছিলেন, তদুপরি আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও ¯েœহের জায়গা ঠিক রেখে আমরা একে অন্যের কাছাকাছি ছিলাম, যা তাঁর সমবয়সী কারও সাথে ছিল না। কেবল আমি নয়, আমার অনেক সহপাঠীর সাথেও ছিল তাঁর এমন হৃদ্যতার সম্পর্ক। নিজ চারিত্রিক গুণের কারণেই তিনি ছোট-বড় সকলের আপন হতে পেরেছিলেন। 

আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, বাশার ভাই ছিলেন অত্যন্ত ধর্ম পরায়ণ একজন মানুষ। তাঁর সাথে পরিচিত হবার পর থেকেই  নিয়তিম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ   জামায়াতের সাথে পড়তে দেখেছি। ছিলেন বিনয়ী, ভদ্র ও সদালাপী। কখনো কারও সাথে আড়ষ্ট হয়ে কথা বলতে দেখিনি। লেনদেনের ব্যাপারেও খুব স্বচ্ছ ছিলেন। কোন ধরনের কোন নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তাঁর মাঝে ছিল না। তাঁর সমসাময়িকদের মাঝে এমন সর্বগুণে গুণান্বিত ব্যক্তি খোঁজে পাওয়া বিরল। 

আজ বারবার মনে পড়ছে তাঁর সাথে শেষ সাক্ষাতের মুহুর্তটি। গত ৯ ডিসেম্বর রাতে বাশার ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয়। সে দিনই দেখেই বোঝে ছিলাম তাঁর ,পার্থিব জীবনের পথ চলাটা দ্রতই ফুরিয়ে আসছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে ছিলাম, কিন্তু অত্যন্ত ক্লান্ত, শ্রান্ত বাশার ভাই খুব একটা কথা বলেন নি। অথচ, আলাপী এই মানুষটার পাশে বসলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিভাবে কেটে যেত টেরই পেতাম না। এক পর্যায়ে চাচী (বাশার ভাইয়ের মা)  এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে। প্রিয় সন্তানের সময় যে ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে তিনিও তা বোঝতে পেরেছিলেন। তাই বাশার ভাই এক ফাঁকে ওয়াশরুমে গেলে চাচীর মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে সবচেয়ে আকুল আবেদনটি ‘সুস্থ না হোক, এই দোয়াটুকু কর আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন আল্লাহ ওকে বাঁচিয়ে রাখেন’। পুত্রহারা আমার মায়ের শেষ দিনগুলো দেখে আমি বোঝতে পেরেছিলাম এই বেদনা কতটুকু কষ্টের। তাই মনপ্রাণ দিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে আর্তি জানিয়েছিলাম তিনি যেন দুঃখী এক মায়ের এই করুণ আবদারটুকু অন্ততঃ পূর্ণ করেন। সে দিন বাশার ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে এতটুকু কষ্ট পেয়েছিলাম যে, এরপর একদিন জুড়িতে থাকলেও বাসা বের হবার মানসিক শক্তিটুকুও পাই নি। 

এরপর, ফেব্রুয়ারিতে আরেকবার একদিনের জন্যে  বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁর বাসায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ঐ দিনই তিনি কুলাউড়ায় গেছেন। তাই আর দেখা হয়নি। সর্বশেষ গত সপ্তাহে জুড়ি গিয়ে জানতে পারি সিলেটের এক হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। ঐ হাসপাতালের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা  সহপাঠী বন্ধু দুলাল জানায় ফিরে আসার তেমন সম্ভবনা নেই। সময়ের খুব স্বল্পতা ছিল। তাই সিলেট হয়ে ঢাকা ফেরার সিদ্ধান্ত নেই। ফিরতি পথে আবারও দেখে যাবার ইচ্ছে ছিল প্রিয় বাশার ভাইকে। সে অনুয়ায়ী যথেষ্ট সময় হাতে নিয়েই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। পথিমথ্যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেট পৌঁছতে অনেক বিলম্ব হওয়ায় অনেকটা দৌড়ে গিয়ে বিমান ধরতে হয়েছে। তাই  তাঁর সাথে আর শেষ দেখা হয় নি। জানি না কেন আল্লাহ  শেষ দেখা করতে দিলেন না  এমন প্রিয় মানুষটার সাথে। 

আজ সবই স্মৃতি। আবুল বাশার এখন একটা স্মৃতির নাম মাত্র। মসজিদে নামাজিদের কাতারে, স্টেশন মাঠ বা কলেজ মাঠের ক্রীড়ানুষ্ঠানে, নিউ মার্কেটের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডায় আর আসবেন না আবুল বাশার। এখন তিনি জাগতিক সব হিসেব-নিকেশের ঊর্ধ্বে, দূর আকাশের তারা। ঝরে পড়ার জন্যই ফুল ফুটে; কিন্তু মধ্যবর্তী সময়ে প্রস্ফুটিত হয়ে সৌরভে সুরভিত করে তোলে চারপাশ। ফোঁটার আগেই ঝড়ে পড়লে সে ব্যাথা থেকে যায়। তেমনই মৃত্যুই জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি। জন্মিলে মরিতে হয় এটাই স্বাভাবিক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” কিন্তু অপরিণত বয়সে চলে যাওয়াটা বড়ই বেদনাদায়ক (যদিও মৃত্যুর নির্দিষ্ট  কোন বয়স নেই, সবকিছুই রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছাধীন; তবুও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকাকে জীবনের পূর্ণতা হিসেবে গণ্য করা হয়)। মানবতাবাদী কবি জন ডান বলেছিলেন, “প্রত্যেক মৃত্যুই আমাকে আহত করে।” বাশার ভাইদের এরকম অসময়ে চলে যাওয়া কেবল আহত নয়, আমাদের ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। সবকিছুর পরে এটাই জীবনের কঠিন বাস্তবতা। ক্ষমাশীল মহান আল্লাহ যেন তাঁকে  জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এটাই একান্ত কামনা। পরপারে মহান ¯্রষ্টার কৃপায় সুখে থাকুন বাশার ভাই, শ্রদ্ধেয় অগ্রজ আমার।

লেখক: মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ, সহকারী প্রধান, অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়।

No comments: